পুরোনো লোহার পাইপ বা টায়ার দিয়ে শরীরচর্চা চলছে বাঁকুড়ার এই ইকো-জিমে

বেকার ছেলেমেয়েদের শারীরিক ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সহায়তা করছে ইকো জিম

ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথম সূর্যরশ্মি শাল এবং মহুয়া গাছের চিরসবুজ পাতাগুলিতে পড়লে যেন মনে হয় মৃদুভাবে শিহরণ খেলে গেল সকালের আবহাওয়ায়। গাছে গাছে পাখিদের রাত ঘুম ভাঙে, বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় কিচিরমিচির শব্দ। শুরু হয় আরেকটা নতুন দিন। একটু পরেই, লাল মাটির পথের দিকে তাকালেই নজরে পড়ে কিছু দ্রুত পায়ে চলাফেরার ছাপ। এরপরই দেখা যায় সিলুয়েট জঙ্গলের দিকে, বিভিন্ন বয়সের মানুষদের পদচালনা। শিশু, কিশোর, যুবক-যুবতী, গৃহিণী, এমনকি বৃদ্ধরাও জঙ্গলের ভেতরে ও বাইরে যাতায়াত করতে থাকে। এ যেন রোজকার কোনো এক অবকাশহীন অবিরাম যাত্রা। না, এ কোনো দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়া যাত্রার গল্প নয়। বাঁকুড়া (Bankura) জেলার সোনামুখী ব্লকের বলরামপুরের গ্রামবাসীরা গত ১০ বছর ধরে এই রুটিনটিই অনুসরণ করে আসছেন। এই রুটিনে অভিনবত্ব আনতে এবার বলরামপুরের বাসিন্দারা সোনামুখী রোডে পাথরমোড়ার কাছে জঙ্গলের প্রবেশপথে তৈরি করেছেন একটি ইকো-জিম।

আধুনিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হল ‘ব্যায়াম’। বাঁকুড়ার বলরামপুরে (Balarampur) ব্যায়ামের উপযুক্ত জায়গা না থাকায় জঙ্গলের মধ্যেই একদল যুবক তৈরি করেছে অভিনব ইকো-জিম। ফেলে দেওয়া গৃহস্থালির জিনিসপত্র পুনর্ব্যবহার করে স্থাপন করা হয়েছে এই ‘জঙ্গল জিম’ (Jungle Gym)। আয়োজকরা মূলত সকলে স্থানীয় যুবকদের একটি দল, তারাই উদ্যোগ নেয় একটি অভিনব জিম স্থাপনের। পুরোনো ট্রাক্টরের টায়ার, মোটরবাইক এবং সাইকেলের টায়ার, টিউব, বিচ্ছিন্ন বৈদ্যুতিক সিমেন্টের খুঁটি, পুরোনো লোহার পাইপ জোগাড় করতে থাকে বিভিন্ন জায়গায়। স্থানীয়দের অনেকেই এগিয়ে এসেছেন এই উদ্যোগে, প্রকল্প সম্পর্কে মতামত রেখেছেন, এমনকি আনন্দ সহকারে অনুদান দিতেও সম্মত হয়েছেন।

এ সত্যিই এক অন্যরকম ‘জিম’। প্রায় পুরো জিমটিই তৈরি হয়েছে ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে। বাড়তি, তথাকথিত অপ্রয়জনীয় জিনিস দিয়েই স্থানীয় যুবকরা জিমের পরিকাঠামো তৈরি করেছে। ইকো জিমটিতে রয়েছে রেসকিউ রোপ ট্রেনিং ইউনিট এবং যোগাসনের জায়গা। বারবেল (Barbells), ডাম্বেল (Dumbbells), চিনিং বার (Chinning bars), ডন বার (Don bars), ভারোত্তোলনের (Weightlifting) প্রয়োজনীয় জিনিস ইত্যাদি সমস্ত অত্যাধুনিক ব্যাবস্থাপনায় সাজানো হয়েছে জিমটিকে। এছাড়াও জঙ্গলে রয়েছে একটি ৪০০ মিটার রানিং ট্র্যাক। এবং এই উদ্যোগের সবচেয়ে ভালো দিক হল, জিম স্থাপনের জন্য সেই অর্থে কোনো আর্থিক বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়েনি। অভিনব এই ইকো জিমে গ্রামবাসীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শরীরচর্চার সবরকম সুবিধা পেতে পারে।

একটি ছোট গ্রাম, বলরামপুর। আজও যেন এক ছোটো গণ্ডির মধ্যেই আটকে আছে। নিকটতম শহর বলতে সোনামুখী (Sonamukhi), সেও অনেক দূরে। বলরামপুর গ্রাম থেকে বিষ্ণুপুর (Bishnupur) মহকুমা শহর প্রায় ১৭ কিলোমিটার এবং সোনামুখী শহর থেকে দূরত্বও প্রায় ১১ কিলোমিটার। ফলে প্রান্তিক এই কৃষক-শ্রমিকদের গ্রাম বলরামপুরের বাসিন্দাদের জন্য, নিয়মিত সোনামুখী পর্যন্ত যাতায়াত করা এবং সেখানে কোনো একটি জিমের সদস্যপদ নেওয়া, এ প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু, নিয়মিত শারীরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার কথা ভাবা, এ বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ গ্রামবাসীরা বিকল্প পথ খুঁজতে বদ্ধপরিকর। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। স্বল্প পরিসরে, শুধু ভাবনাচিন্তার ওপর ভর করেই তারা খুঁজে পেল এই ‘আউট-অফ-দ্য-বক্স’ সমাধান। পরিচিত ছকের বাইরে গিয়ে বিকল্প সমাধান হিসাবে তৈরি করা হয় এই জঙ্গল ইকো-জিম।

ইকো জিমের ট্যাগলাইন ছিল, ‘Go’। একটি শব্দেই চমকে দিয়েছে এই জিম। জিম স্থাপনের দ্বারা, আয়োজকরা নতুন প্রজন্মকে শারীরিক ব্যায়ামের গুরুত্ব সম্পর্কে সংবেদনশীল করে তুলছেন। এবং তাদের প্রচেষ্টা যে ফলপ্রসূ হচ্ছে তা জিমটির দ্রুত জনপ্রিয়তা দেখেই ধারণা করা যায়। গ্রামের তরুণরা উত্সাহিত হয়ে যোগ দিচ্ছে নিয়মিত প্রশিক্ষণে, এবং দলবদ্ধ প্রশিক্ষণকে উপভোগ করছে। সশস্ত্র বাহিনীতে চাকরির ক্ষেত্রে একটি বাধ্যতামূলক অংশ হল, শারীরিক দক্ষতা। এই জিম সেই পথেও খানিকটা এগিয়ে দিচ্ছে বেকারদের। প্রচুর সংখ্যক বেকার ছেলেমেয়ে যারা এখানে নিয়মিত ব্যায়াম করছে, তারা সফলভাবে শারীরিক ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে, এটিই এই জিমের সর্বোত্তম ফলাফল।

জানা গেছে, গ্রামের বেশ কিছু যুবক সেনাবাহিনী বা পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেছে। সুস্থ মন এবং শক্তিশালী শরীরের সঙ্গে যে ব্যায়ামের সম্পর্ক নিবিড়, তা বুঝতে পেরেছেন বলরামপুর গ্রামের বাসিন্দারা। ফলে সহজেই প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে ব্যায়ামের। এমনকি বাচ্চারাও তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগ দিচ্ছে ইকো জিমে। সত্যিই এই ইকো জিম এক বিপ্লব ঘটিয়েছে গ্রামীণ পরিবেশে। সামগ্রিক রূপান্তর এনে দিয়েছে গ্রামের মানুষদের জীবনে। শুধু বলরামপুর গ্রাম নয়, আশেপাশের গ্রামগুলিকেও অনুপ্রাণিত করছে একটি ভালো এবং উপযুক্ত স্বাস্থ্যের জন্য প্রচারে যোগ দিতে৷  শিশুরাও এই প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ব্যায়াম করতে পছন্দ করছে। জিমের প্রতিদিনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রামবাসীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন পেশাদার – প্রাক্তন সেনা, স্কুল শিক্ষক, সর্বোপরি স্থানীয় যুবকরা, সকলে মিলেই একযোগে সামলাচ্ছেন প্রকল্পের দায়িত্ব।

বলরামপুর গ্রামটি বন্যহাতির আস্তানা। প্রায়শই একদল হাতি জঙ্গলের জিমের মধ্য এসে পড়ে, পদদলিত করে নষ্ট করে দেয় জিমের সরঞ্জামগুলি। তাই, ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় জিম তত্ত্বাবধায়কদের। তবে নিঃসন্দেহে, এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সরকারের আর্থিক সহায়তায় বা বন বিভাগের উদ্যোগে এই জিমের আধুনিকায়ন হলে  ইকো-জিমটিকে সহজেই অন্য স্তরে উন্নীত করা যেতে পারে, একথা অবশ্য স্বীকার্য। বলরামপুর গ্রামের যুব ব্রিগেডও এ বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। ইকো জিম নিয়ে প্রতিদিনই এক উন্নত আগামীর স্বপ্ন বুনছেন বাঁকুড়াবাসী।

 

ছবি সৌজন্যে – Bankura 24×7 Facebook

প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে

Developed by DXDasia