
গ্রামের ছাপোষা মানুষের হাতে গড়া এই মননজাত শিল্প আজ এক ইন্ডাস্ট্রি
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর (Bankura, Bishnupur) পোড়ামাটির হস্তশিল্প উৎপাদনে অন্যতম পথপ্রদর্শক এবং কারুকাজের সূক্ষ্মতার জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। পোড়ামাটির ঘোড়া – বাঁকুড়া জেলার পাঁচমুড়া গ্রামে (Panchmura) এই বিশেষ শিল্পদ্রব্যটি তৈরি হয়। মূলত গ্রাম্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত হলেও, আজকাল সমগ্র বিশ্বেই ভারতীয় লোকশিল্পের প্রতীক হিসেবে গৃহস্থালীতে শোভা পেয়ে থাকে এই ঘোড়া। ‘অল ইন্ডিয়া হ্যান্ডিক্র্যাফটস সংস্থা’র (All India Handicrafts) লোগোতেও বাঁকুড়ার ঘোড়ার ছবি ব্যবহৃত হয়।

আগডুম, বাগডুম, ঘোড়াডুম সাজে। সেই থেকে কত না কত ছড়ায় মোড়া ঘোড়ার কাহিনি। কত তাদের নাম। সাবাশ ঘোড়া, টাট্টু ঘোড়া, জলপাই ঘোড়া, দুলদুল ঘোড়া, পক্ষীরাজ ঘোড়া আরও কত কী। এ বাংলা ধর্ম-কর্ম নির্বিশেষে ঘোড়া অন্তপ্রাণ। গ্রামবাংলাও মগ্ন থাকল ঘোড়ায় বহুদিন। বলতে গেলে আজও আছে। আশা-নিরাশা বা চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে গেল ঘোড়া। নানা বার্তা নিয়ে সে ঘোড়া উঠে এল মাঠের মাঝে মনোস্কামনার থানে। কত গল্প-গাঁথা জড়িয়ে গেল তার সঙ্গে। কেউ বলল, মনের কামনা-বাসনা ঈশ্বরের দরবারে যে পৌঁছবে তার জন্য তো একটা বাহন লাগে। তাই মাটিকে দলা পাকিয়ে হাতে টিপে এমন সাদাসিধে ঘোড়া বানিয়ে নেওয়া। কেউ বলল, গ্রামদেবতা যখন কালাজ্বর, মারণ রোগ, বসন্ত রোগ থেকে গ্রামকে রক্ষা করবার জন্য রাতে গ্রামে টহল দেবে তখন তাঁর তো একটা বাহন লাগবে। তাই থানে ঘোড়া দিতে হবে।
এখন প্রশ্ন হল থানটা কী? থান হল মাঠের মাঝের কোনও বেদি কিংবা গাছতলার থান বাঁধানো অংশ। মনোস্কামনার ঘোড়াকে সেখানেই রাখা রেওয়াজ। এখন এই থানের ঘোড়া সর্ব অর্থে একটা শিল্পদ্রব্য। কারণ এখানে শিল্পী যা নির্মাণ করেন তা হল একটি জটিল রূপের সরল উপাখ্যান। তৈরি হয় সাজেস্টিভ আর্ট। আর রূপকার হলেন গ্রামের সাধারণ মানুষ।
আশ্চর্যের বিষয় হল, রাশিয়াতেও এরকম ঘোড়া দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার প্রথিতযশা শিল্পীদের দীর্ঘদিন ধরে এই হাতে টেপা মাটির ঘোড়া আকর্ষণ করেছে। যেমন যামিনী রায় (Jamini Roy)। বিগত তিরিশ বছরে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে এই থানের ঘোড়ারই এক বিরল রূপান্তর ঘটেছে। ফলে বিষ্ণুপুরে এই থানের ঘোড়াই তার ভোল পালটে হয়ে গিয়েছে ঘর সাজানোর ঘোড়া, যা ‘কথাকলি’ ঘোড়া (Kothakoli Ghora) নামেও সুবিদিত। ‘কথা’ শব্দের অৰ্থ কাহিনি ও ‘কলি’ শব্দের অৰ্থ অভিনয়। বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের এই টেরাকোটার ঘোড়াগুলির রূপের সারল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জটিল অলঙ্কারের সুষমা। এই সুষমা যোগ করা হয়েছে যাতে লোকশিল্পের নমুনা হিসাবে এই ঘোড়া বিক্রি হয়। ফলে বলতে হয় দৈনন্দিন গ্রাম জীবনে যা ছিল মনোস্কামনা পূরণের বাহন, তা এখন রূপান্তরিত হল কারুশিল্পে। তাই গ্রামের ছাপোষা মানুষের হাতে গড়া এই মননজাত শিল্প আজ এক ইন্ডাস্ট্রি। এমন চমৎকার রূপ বদল বাংলার আর কোনও পুতুলের ক্ষেত্রে বিশেষ হয়েছে বলে জানা যায় না। আর একথা হলফ করে বলা যায়, একটি ঘোড়াই বদলে দিতে পারে অন্দরমহলের খোলনলচে। ঘরের শোভা বৃদ্ধিতে কথাকলি ঘোড়া অদ্বিতীয়।

এখন আর এই ঘোড়া সংগ্রহ করতে বিষ্ণুপুর-বাঁকুড়া ছুটতে হয় না। অনলাইনে অর্ডার করলেই কথাকলি ঘোড়া পৌঁছে যাবে আপনার বাড়ির দোর গোড়ায়। নায্য মূল্যে এই ঘোড়া কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।
