গালার পুতুল শিল্পকে একা বাঁচিয়ে রেখেছেন বৃন্দাবন চন্দ

লোকশিল্পীদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণা

পুতুল শিল্প বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্য। মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল, পাটের পুতুল, কাপড়ের পুতুল – কত রকম বৈচিত্র্য তাতে। কিন্তু বাংলার এই কৃষ্টি নানা কারণে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম নিদর্শন গালার পুতুল। বর্তমানে একজন মাত্র শিল্পী এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সংগ্রাম করে চলেছেন। পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী বৃন্দাবন চন্দ জ্বালিয়ে রেখেছেন আশার আলো। এভাবেই লোকশিল্পীদের কাছে তিনি প্রেরণা হয়ে উঠেছেন।

‘গালার পুতুল’ নামে এই শিল্পের পরিচয় ঠিক পুরোটা ধরা পরে না। কারণ, শুধুমাত্র গালা দিয়ে নির্মিত হয় না এই পুতুল। অত্যন্ত পরিশ্রম করে জটিল পদ্ধতিতে বানানো হয়, তার জন্য প্রয়োজন একাগ্র মনোযোগ এবং অসীম ধৈর্য।

 গালার পুতুল নির্মাণ 

গালা পাওয়া যায় ‘লাক্ষা’ নামের এক ধরনের ছোট্ট পোকার থেকে। বৃন্দাবন চন্দের কথায়, “উইয়ের ঢিবি থেকে মাটি সংগ্রহ করতে হয়। দিন তিনেক জলে ভিজিয়ে রাখতে হয় সেই মাটি। তাতে মাটি গেঁজে ওঠে। কাঁকর থাকলে সেগুলো বেরিয়ে যায়। তারপর মাটি দিয়ে পুতুল তৈরি হয়। বানানো হয়ে গেলে প্রথমে ছায়ায়, তারপর রোদে শুকোনো হয়। পরের ধাপে পোড়ানো হয় আগুনে – তার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘুঁটে লাগে। এইভাবে পুতুলগুলো রং করার উপযোগী হয়ে ওঠে।”

নানা ধরনের রং মাখানো গালা ব্যবহার করা হয় তারপর। “পুতুলের ওপর নকশা করতে আমি গালার সুতো ব্যবহার করি। এভাবেই চোখ-মুখ তৈরি হয়। ৫-১০ মিনিট ঠান্ডা করা পর সেগুলো বাজারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়”, জানান বৃন্দাবন। 

উজ্জ্বল রং, তাক লাগানো সাজের পুতুলগুলিকে পরিবেশ বান্ধব বলা যেতেই পারে। মানুষ, দেবদেবী, জন্তুজানোয়ার প্রভৃতি নানা ধরনের গালার পুতুল পাওয়া যায়। সব পুতুলই হাতে বানানো। 

গালার পুতুল বানাতে প্রয়োজন একাগ্র মনোযোগ এবং অসীম ধৈর্য

চন্দ পরিবারের বংশানুক্রমিক পেশা শাঁখা তৈরি, যা গালার পুতুল বানানোর থেকে সহজসাধ্য। তাঁদের বেশিরভাগ প্রতিবেশীও এই পেশায় যুক্ত। বৃন্দাবন বলেন, “এই অঞ্চলের (পটাশপুর-২ ব্লক) প্রচুর মানুষ গালার পুতুল তৈরি করতে জানেন। তবে আমিই একমাত্র বানিয়ে চলেছি এই পুতুল। এমনকি আমার সন্তানরাও এই কাজে যুক্ত হয়নি।”

এখন বৃন্দাবন চন্দের বয়স যথেষ্ঠ হয়েছে। তবুও দিন পনেরোর মধ্যে ১০০টির মতো পুতুল বানানোর সামর্থ্য রয়েছে তাঁর। এখন উইয়ের ঢিবি সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই অন্য মাটি ব্যবহার করতে হয়। নানা শহরে কর্মশালার জন্য তাঁর ডাক আসে। কর্মশালা ছাড়াও বৃন্দাবন কলকাতার এক নামজাদা স্কুলে হস্তশিল্প এবং শিল্পকলার পাঠ দিয়ে থাকেন। সেই কাজও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। “আমি শহরের তরুণ প্রজন্মকে আমার শিল্পকলা শেখাই। কিন্তু জানি না, ক’জন সেটা নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করে। কেউ কেউ খুব তাড়াতাড়ি শেখে, কিন্তু অন্যদের শেখাতে পারবে কিনা, তাতে সন্দেহ থেকেই যায়। বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই এটা অল্প সময়ের শখ মাত্র,” জানান বৃন্দাবন চন্দ।

বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে রক্ষা করতে আমাদের সকলের এগিয়ে আসা দরকার। কেবল নান্দনিক গুণের কারণে নয়। বরং এই জন্য যে, এগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের বেঁচে থাকার রসদ, আমাদের সংস্কৃতির আত্মা। 

গালার পুতুল অনলাইনে কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন

 

Developed by DXDasia