
তাঁর ‘পাখীর কথা’ বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
ইংরেজ শাসন তখনও ভারতে বহাল রয়েছে। জাতীয় কংগ্রেসের (National Congress) হাত ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমে ক্রমে সংগঠিত রূপ পাচ্ছে। এই জাতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন অগ্রগণ্য নায়ক তথা পথিক ছিলেন অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম। তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতির বাইরেও একটা বিশেষ পরিচিতি ছিল পক্ষীবিদ হিসেবে। ভারতে তখনও পর্যন্ত তাঁর মত দুঁদে পক্ষীবিশারদ (Birder) একজনও ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তী কিছু বছরের মধ্যেই যার নাম তাঁর পাশে শোনা যেতে লাগলো তিনি ইংরেজ তো দূরস্ত, খোদ ছাপোষা এক বাঙালি। দেশ-বিদেশের নানাবিধ পাখি দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। সত্যচরণ লাহা (Satyacharan Laha)। তাঁর উদ্যোগে ও আগ্রহেই ১৯২৮ সালে কলকাতার (Kolkata) আগরপাড়ার কাছে গড়ে উঠেছিল একটি পাখি নিকেতন। পক্ষীতত্ত্বের আনাচে কানাচে যাঁর বিচরণ সেই সত্যচরণ লাহার কলমেই লেখা হয়েছিল এক যুগান্তকারী বই ‘কালিদাসের পাখী’ (Kalidaser pakhi)। না, কালিদাস নিজে পাখি পুষতেন কিনা বা তাঁর পোষ্য পাখিদের নাম-গোত্র-বৈশিষ্ট্য নিয়ে এ বইতে আলোচনা নেই, বরং যা আছে তা সেকাল তথা একালের সাপেক্ষে এক বৈপ্লবিক কাজ।
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে কালিদাসের রচনাসম্ভারকে যে পক্ষীবিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে তা সত্যচরণ লাহা প্রমাণ করেছেন তাঁর কালিদাসের বিহঙ্গ-তত্ত্বে যা পরে ‘কালিদাসের পাখী’ নামে বই হিসেবে প্রকাশ পায়।

১৮৮৮ সালে উত্তর কলকাতার (North Kolkata) কৈলাস বসু স্ট্রিটের বিখ্যাত লাহা পরিবারে জন্ম সত্যচরণের। প্রথমে মেট্রোপলিটান কলেজ (Metropolitan College) এবং পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে (Presidency College) প্রথাগত পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। চাকরি করতেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে (Indian Statistical Institute) কোষাধ্যক্ষ হিসেবে। কিন্তু এই চাকরির বাইরে পাখি দেখাই ছিল তাঁর আসল নেশা। সাধারণত খাঁচার বাইরেই যে কোনো পাখিকে পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসতেন সত্যচরণ লাহা। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কোনো পাখিকে পোষ মানানোর পদ্ধতিও বের করেছিলেন তিনি। খাঁচার বাইরে উন্মুক্ত প্রকৃতির মধ্যেও তিনি পাখিদের পর্যবেক্ষণ করতেন। হাতে নিয়ে বা খাঁচার মধ্যে পাখিকে বন্দি করে তার আচরণ সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ করতে তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। অরণ্যে-জঙ্গলে তিনি যে সব পাখিদের দেখতে পেতেন তাদের আচার-আচরণ, দৈহিক বৈশিষ্ট্য, বাসা বানানোর পদ্ধতি, সন্তান পালনের ধরন এই সবই তিনি খাতায় নোট করে রাখতেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা থাকতো তাঁর সেই নোটগুলিতে। পক্ষীতত্ত্ব নিয়ে তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান।

১৩৪০ বঙ্গাব্দের ৬ ফাল্গুন, ইংরেজির ১৯৩৪ সাল। ‘গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স’ থেকে প্রকাশিত হল পক্ষীবিদ সত্যচরণ লাহার গুরুত্বপূর্ণ একটি বই ‘কালিদাসের পাখী’। বইটির সূচিপত্র ঘাঁটলে অবাক হয়ে যেতে হয়। বিখ্যাত ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্যের কবি কালিদাসের লেখা মেঘদূত, ঋতুসংহার, রঘুবংশ ও কুমারসম্ভব কাব্য এবং অন্যান্য নাটকগুলিতে প্রাপ্ত সকল প্রকার পাখির সংস্কৃত নাম থেকে তাঁদের আসল পরিচয় এবং বৈজ্ঞানিক নাম ও চারিত্র-বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন সত্যচরণ লাহা তাঁর সেই বইতে। কালিদাসের কাব্যে বর্ণিত পাখিগুলি আদৌ ভারতে দেখা যায় কিনা, দেখা গেলে তাঁদের রকম-সকম ঠিক কেমন তা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার ফসল এই বইটি। যদিও এর আগে ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল পাখি সংক্রান্ত তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘পাখীর কথা’ যার ভূমিকা লিখেছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রথম ভারতীয় সভাপতি ছিলেন সত্যচরণ লাহা।
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে কালিদাসের রচনাসম্ভারকে যে পক্ষীবিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে তা সত্যচরণ লাহা প্রমাণ করেছেন তাঁর কালিদাসের বিহঙ্গ-তত্ত্বে যা পরে ‘কালিদাসের পাখী’ নামে বই হিসেবে প্রকাশ পায়। ‘মেঘদূত’, ‘ঋতুসংহার’, ‘রঘুবংশ’ ও ‘কুমারসম্ভব’ ইত্যাদি কাব্যে চক্রবাক, হিরণ্যহংস, হারীত, শিখী, পারাবত, চাতক ইত্যাদি নামে যে পাখিদের উল্লেখ পাওয়া যায় তার সুনিপুণ বৈশিষ্ট্যসহ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। তাছাড়া ‘গৃহবলিভুক’ বলতে যে আসলে সাধারণ কাক কিংবা চড়ুইকে বোঝায় তা বুঝতে হলে কালিদাসের কাব্যের পাশে সত্যচরণ লাহার এই বইটিই মেড ইজি হিসেবে নিয়ে বসা ছাড়া উপায় নেই। একইরকমভাবে নীলকণ্ঠ, শিখী, ময়ূর, কলাপী ইত্যাদি বলতে যে আসলে ‘peacock’কে বোঝায় তা উল্লেখের পাশাপাশি তাঁর বিজ্ঞানসম্মত নামটিও (Pavo cristasus) সত্যচরণ উল্লেখ করেছেন এই বইতে। সত্যচরণই আমাদের বুঝিয়ে দেন যে কালিদাসের বর্ণিত পারাবত আসলে ‘Rock Pigeon’ আর শুক বলতে সাধারণ টিয়া অর্থাৎ ‘Parrot’-কেই বোঝায়। বাংলায় প্রকাশিত অন্যতম সচিত্র বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা ‘প্রকৃতি’-তে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘মহাভারতের পাখী’, ‘অতিকায় সরীসৃপ’ ইত্যাদি প্রবন্ধ এবং ‘হংস’, ‘পাখীর বাসা’ নামের ধারাবাহিক রচনা।
তাঁর প্রথাগত পড়াশোনার বিষয় ছিল ইতিহাস আর পরবর্তীকালে আইন নিয়েও বি.এল ডিগ্রি লাভ করেছিলেন তিনি। কিন্তু পক্ষীবিদ হিসেবে প্রথাগত পড়াশোনার গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে গভীর ও নিবিষ্ট সংস্কৃত ভাষা চর্চা না থাকলে এভাবে কালিদাসের মহৎ কাব্য-নাটকের রসাস্বাদন সম্ভব হত না। শুধু তাই নয়, পুরুলিয়া জেলার পাখিদের নিয়ে সত্যচরণ লাহা সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় ১৩৩১-৩২ বঙ্গাব্দে ‘পুরুলিয়ার পাখী’ নামে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বাংলার পাখিদের নিয়ে ইংরেজিতে অনেকগুলি প্রবন্ধ লিখেছিলেন সত্যচরণ লাহা। কলকাতা ও সিমলার থ্যাকার, স্পিঙ্ক অ্যাণ্ড কোম্পানি নামক প্রকাশনা থেকে ‘Pets Of Bengal’ নামে একটি অত্যন্ত স্মরণযোগ্য বই লিখেছেন তিনি যার প্রস্তাবনা লিখেছিলেন বিখ্যাত ‘এভিকালচার’ পত্রিকার সম্পাদক ড. গ্রাহাম রেনশ। বাংলার পাখিদের নিয়ে এই বইটির মত পক্ষিতত্ত্বের মৌলিক ও স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ বই দ্বিতীয় আর নেই। কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রথম ভারতীয় সভাপতি ছিলেন সত্যচরণ লাহা।
তবে বেশিরভাগ লেখাপত্রই তিনি যেহেতু ইংরেজিতে লিখেছিলেন তাই তথাকথিত জনপ্রিয়তা বলতে যা বোঝায় তা অর্জন করতে পারেননি সত্যচরণ লাহা। নীরবেই কাজ করে গিয়েছেন। পুরস্কার, উপাধি, খেতাব পাওয়া সত্ত্বেও আজও বাঙালি মানসে তিনি বিস্মৃত। ‘জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা’ গল্পে সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) উল্লেখ করলেন সালিম আলির (Salim Ali) কথা, উল্লেখ করলেন তাঁরই পাশে আরেক বাঙালি পক্ষীবিদ অজয় হোমের(Ajay Home) কথাও। অথচ অজয় হোমের জন্মের ২৫ বছর আগে জন্মানো সত্যচরণের কথাই কি তাঁর সর্বাগ্রে উল্লেখ করা উচিত ছিল না! এ প্রশ্নটা থেকেই যায়!
তথ্যসূত্র:
সত্যচরণ লাহা, ‘কালিদাসের পাখী’, গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স, ১৯৩৪
অতনু চক্রবর্তী, ‘উপমহাদেশে পক্ষীতত্ত্ব গবেষণায় পথিকৃৎ সত্যচরণ লাহা’, বিজ্ঞান পত্রিকা ওয়েব পোর্টাল, এপ্রিল ২০১৯
