সংসার নয়, যেন সমাজের মুশকিল আসান হয়ে ওঠে ‘গল্প হলেও সত্যি’-র ধনঞ্জয়

তপন সিংহের কালজয়ী ছবি ‘গল্প হলেও সত্যি’-র একটি ভিন্ন পাঠ

হরের গলিতে তখন সকাল হচ্ছে। উনুনে ফুটছে আপিসের ভাত। তড়িঘড়ি খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে ব্যস্ত বাবুটি। ছোটো রাজপুত্রকে ইস্কুলে পাঠাতে তৈরি করে দিচ্ছে তার মা। কলঘরের সামনের লাইনে, প্রকৃতির ডাক এবং চাকরির তাড়া এই যুগপৎ তাড়নায় একে অপরকে দুষছে দুই ভাই। বাড়ির বুড়োকর্তা এত ঝামেলার মধ্যে হঠাৎ চবণপ্রাশ চেয়ে বসলেন। আগুনে ঘি পড়ল, কড়াইতে পড়ল ফোঁড়ন, শ্যাওলা ধরা উঠোনে একই জায়গায় পরপর পা পিছলে পড়ল বাড়ির দুই ছেলে। আধুনিকতার ধ্বজা ধরতে গিয়ে অন্তঃসারশূন্যতার গহ্বরে যেভাবে বারবার পিছলে পড়েছে নিজের বোধ বুদ্ধি বন্দক রেখে চলা তথাকথিত ‘সভ্য’ মানুষ। তবে বিবেকেও কখনও ‘ঘা’ লাগে, সম্বিৎ ফেরে ‘সভ্যতা’-র। আর, সময়ের কাঁধে চেপে এই ‘চমক’ধরা কাজগুলো যে বা যারা করিয়ে নেন, তারা আসেন একটা ‘ট্রান্স’ থেকে, কাজের শেষে আবার ফিরেও যান সেই ‘কুয়াশা’-য়। মাঝে শুধু ঘটে যায়, অবাক করা কিছু ঘটনা, প্রতিদিনের চিন্তনে যার প্রভাব পড়ে বড়ো বেশি, ‘গল্পের’ মতো মনে হলেও আসলে যার সবটাই ‘সত্যি’।

বড়ো বেশি ইনিয়েবিনিয়ে বলা কথার দরকার হয় না তপন সিংহ-এর সিনেমায়। ক্লাসিক, কমেডি, কমার্শিয়াল, প্যারালাল, আর্ট ফ্লিম ইত্যাদি বহু রকমভেদের অনেক ঊর্ধ্বে যাঁর কাছে সিনেমা সহজ করে দুটো ভাগে পড়ে, ‘ভালো’ আর ‘ততটা ভালো নয়’। সাধারণ দর্শকও তল পায় এই কথাটায়। তাদের বোঝানোর জন্য আলাদা করে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ তকমা দিতে হয় না তপনবাবুর সিনেমাকে। গভীর কথা সহজে বলার কৌশল বুঝে নিতে দর্শককেও তেমন আলাদা করে নিতে হয় না কোনো সমালোচনার পাঠ। উভয় পক্ষের যৌথ বোঝাপড়ায় আসে বানিজ্যিক সাফল্যও।

১৯৬৬-তে মুক্তিপ্রাপ্ত, ‘নিউ থিয়েটার্স’ প্রযোজিত, মীরা সরকার নিবেদিত এবং তপন সিংহ পরিচালিত ‘গল্প হলেও সত্যি’ একাধারে বানিজ্যিকভাবে সফল এবং সিনেমা হিসাবে একটি অমর সৃষ্টি। বহু ব্যবহারেও ‘কালজয়ী’ শব্দটির উল্লেখ এই ছায়াছবির ক্ষেত্রে ওজন হারায় না মোটেই। গল্পের মূল সুর বেঁধে দেয় দুটি লাইন; ‘সুখ বলে ওঠো সারি… ঘুমায়ো না আর/ এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার’। সত্যিই তো যুগে যুগে মানুষ এই জীবন পাঠই তো পাচ্ছে প্রকৃতি থেকে, সময় থেকে। ‘একটাই জীবন’, ‘সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের ন্যায়’ আর যা একবার চলে গেল, তা কখনওই ফেরে না। এ তো শুধু দার্শনিক উপলব্ধি নয়, এ তো আধুনিক বিজ্ঞানেরও মূল কথা। তাই বর্তমানকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ‘কর্মযোগে’ ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানুষ, যুগ থেকে যুগে, দেশ থেকে দেশান্তরে। সভ্যতার ইমারত গড়ে উঠেছে এই কর্মযোগেই। এই সহজ অথচ গভীর কথাটাই মূল উপজীব্য ‘গল্প হলেও সত্যি’-র।

ছকভাঙার গান নিয়ে চিরকাল গড্ডালিকা ভেসে চলা মানুষের মাঝে আসে ‘ধনঞ্জয়’-রা। যেমন এসেছিল রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’-য় বৈরাগী বেশে ধনঞ্জয়, তেমনই এ ছবিতে সব সমস্যার সমাধানে ধনঞ্জয়বেশী রবি ঘোষ। উত্তম-সৌমিত্র গ্যালাক্সিতেও সমস্ত ‘স্টেরিওটাইপ’ ভেঙে যে সব অভিনেতারা স্বতন্ত্রতায় সমুজ্জ্বল সেই রবি ঘোষ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগেশ চট্টোপাধ্যায়, তপন ভট্টাচার্যের মতো মানুষ এই সিনেমার সম্পদ। স্বমহিমায় সঙ্গে রয়েছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ছায়াদেবী, রয়েছেন ভারতীদেবী। ষাটের দশকের কলকাতার অলিতে-গলিতে ঘটে চলা প্রতিটি সংসারের নিজস্ব রেভোলিউশনের গল্প বলে এই ছায়াছবি, যার প্রত্যেক মোচড়ে থাকে সত্যি কে অনুভব করানোর অনবদ্য প্রয়াস। 

মনে শান্তি না থাকলে, স্থিতি না থাকলে ধীরে ধীরে সব কাজই পন্ড হয়। মানুষ তার লক্ষ্য থেকে সরে আসে, এক কথায় যাকে বলে ঘেঁটে যায়। এই চরম বাস্তব কথাটিই নানাভাবে এ সিনেমায় তুলে ধরেছেন তপন সিংহ। এখানে একটি একান্নবর্তী পরিবারে সম্পর্কগুলি ক্রমশ তিক্ত হচ্ছিল একটি মূল অশান্তিকে কেন্দ্র করে, তা হল ‘পরিচারক’ চলে যাওয়া। ধীরে ধীরে তাই ঘর জামাকাপড়, উঠোন অপরিষ্কার হতে হতে মনগুলোও বড়ো বেআব্রু হয়ে পড়ছিল। নিজেকে ফাঁকি দিয়ে নিজেতে মেতে থাকার অদ্ভুত দোলাচলে সকলের সামনে হাজির হয় সব সমস্যার ‘মুশকিল আসান’ ধনঞ্জয়। একা হাতে দশ জনের কাজ ‘ম্যানেজ’ করার দারুণ প্রতিভা তার। ধনঞ্জয় সাধারণ কলার কোপ্তায় পাঁঠার মাংসের স্বাদ এনে দেয়, বাড়ির সবাইকে একসঙ্গে খেতে বসায়, শ্যাওলা ধরা উঠোন চোখের নিমেষে পরিষ্কার করে দেয়, মা-বাপ মরা কিশোরী মেয়ে কৃষ্ণার মনের ক্ষততে প্রলেপ দেয়, বুড়োকর্তার সহায় হয়ে ওঠে, মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হতেই সামনে হাজির হয় ধনঞ্জয়। ধনঞ্জয় সময়ের গুরুত্ব শেখায়, নিজের এবং অপরের কাজকে সম্মান করতে শেখায়, এককথায় ধনঞ্জয় হাসিমুখে বীরদর্পে সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায় জীবনকে। আর সিনেমা শুধু বিনোদন না হয়ে কেমন করে পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে তার অনবদ্য পাঠ আমাদের দেয় ‘গল্প হলেও সত্যি’।

জীবনকে সাবলম্বী করে তুলতে আমাদের মধ্যে মাঝে মাঝে আসেন ধনঞ্জয়রা। কাজ শেষে তারা ফিরেও যান। শুধু দরকার তাদের ঠিক ঠিক চিনে নেওয়ার পালা। আর একবার ধনঞ্জয়দের স্পর্শ পেলেই বদলে যায় জীবনদর্শন। এই সিনেমাতেই একটি দৃশ্যের সংলাপে উল্লেখ করা হয় ‘শকুমেন্টরি’ শব্দটি, বলা হয় আধুনিক মানুষ পাগলাগারদে আছে সবাই। যে কোনো শিল্পের কাজ সেইসব মানুষকে ধরে ধরে ‘শক’ দেওয়া। গতানুগতিক চিন্তায় ইতিবাচকভাবে সেই ‘শক’ বা প্রচণ্ড আঘাত দেয় তপন সিংহের এই ছবি। আর সেই ‘শকের’ লোভেই এক জীবনে অন্তত কয়েকশোবার দেখে ফেলা যায় ‘গল্প হলেও সত্যি’।

Developed by DXDasia