অভিনয় ছেড়ে রেডিওতে গাওয়া শুরু করলেন ছায়া দেবী, তারপর আবার ফিরলেন সিনেমায়

ছোটোবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা ছিলেন

ন্তানের ভালো চাওয়াই মায়েদের চিরকালের ধর্ম। কিন্তু বেশি ভালো চাইতে গিয়ে নিজের অজান্তেই এই মা যে সন্তানের জীবনে ঝঞ্ঝাটের কারণ হয়ে দাঁড়ান, সে কথা বোধহয় ‘মাদার’ আর্কেটাইপের পরিপন্থী। অত্যন্ত বাস্তব এই বিষয়টি তাঁর অসামান্য অভিনয় দক্ষতায় ‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন ছায়া দেবী। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের এই অভিনেত্রী পর্দায় কখনও কোনো মেয়ের দজ্জাল মা, আবার কখনও ‘সপ্তপদী’র রিনা ব্রাউনের হতভাগ্য গর্ভধারিনী, যাকে নিজের মেয়ের সামনে আজীবন ধাইমা’র পরিচয় দিতে বাধ্য করেছিল পরিস্থিতি। তাঁর অভিনয়ের মাধুর্যে ছায়াছবির এমন মায়েরাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে বারবার। আসলে, নকলে যেন মিলে গেছে প্রতিবার। বাংলা সিনেমার ঊষর জমিতে প্রকৃতপক্ষেই এক বটবৃক্ষের ছায়া নিয়ে দীর্ঘ ষাট বছর বিরাজ করেছেন এই মানুষটি।”

‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রে ছায়া দেবী    

ছায়া দেবী যখন অভিনয়ে আসেন তখন বাংলা সিনেমা সবে কথা বলতে শিখেছে। সবাক চলচ্চিত্রের সেই প্রথম যুগে যখন ভদ্রঘরের মেয়েদের সিনেমায় অভিনয় নিয়ে নানান বাঁকা মন্তব্য, তখন সেই সময়ের এক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছায়া দেবী অভিনয়ে এলেন খানিকটা বাড়ির লোকেদের উৎসাহেই। ১৯১৪ সালের জুন মাসে ভাগলপুরে জন্ম হয় হারাধন গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা ছায়ার, যার পিতৃদত্ত নাম ছিল কনক। ছোটোবেলা থেকেই স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তায় বেড়ে ওঠা এই মেয়ের চোখে ছিল ডানা মেলার স্বপ্ন। কিন্তু মাঝেমধ্যে বিধি হয়ে যান বাম, ফলে মাত্র এগারো বছর বয়সে স্বামীর ঘর করতে এসে কনককে শুনতে হল যে সেই মানুষটির এ সংসারে মন নেই। বিয়ে জিনিসটি ঠিক কী, তা বুঝে ওঠার আগেই নতুন বর তার বউকে ফেলে চলে গেল ওড়িশায় অধ্যাপনা করতে। কনক বুঝলেন তার একা থাকার সেই হল শুরু। সারাদিন মনমরা হয়ে বসে থাকা কনককে তার বাবা হারাধন তখন নিয়ে এলেন কলকাতায়। 

পাশেই থাকতেন সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে। সম্পর্কে যিনি মান্না দে’র কাকা। সব মনখারাপ যেন চলে যেত কৃষ্ণচন্দ্রের সুরে। তাই  ভাগলপুরে থাকতেই দামোদর মিশ্রের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের হাতেখড়ি হওয়া কনক ফের গান শিখতে শুরু করলেন তার ‘বাবুকাকা’ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে। সঙ্গে পেলেন কিশোর মান্না দে’র সাঙ্গীতিক সাহচর্য। পাশাপাশি চলল শ্রদ্ধেয় শম্ভু মহারাজের কাছে উচ্চাঙ্গ নৃত্যের তালিম। নাচ, গানের চর্চায় ডুবে ধীরে ধীরে মনের বিষাদ কাটিয়ে উঠলেন কনক। কিশোরী কনককে আরও একটু চনমনে রাখার কথা ভাবলেন তার পরিবার। ভাগলপুরের রাজবাড়ির নাতি কুমুদলাল, পরবর্তীতে যিনি অশোককুমার, তখন মুম্বাইয়ের তরুণ তুর্কি। আবার রাজপরিবারের বন্ধু উপেন গোস্বামী ফিল্ম কোম্পানির ম্যানেজার। এই যোগাযোগেই কিশোরী কনক এল লাইট, ক্যামেরার এক নতুন জগতে। জ্যোতিষ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘পথের শেষে’ দিয়েই অভিনয় জগতে পথচলা শুরু হল কনকের, প্রথম সিনেমাতেই তাঁর নাম বদলে রাখা হল ছায়া দেবী। ১৯৩৬-এ মুক্তিপ্রাপ্ত এ সিনেমায় ছায়ার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে বিখ্যাত পরিচালক দেবকীকুমার বসু তাঁর ‘সোনার সংসার’ এর নায়িকা হিসেবে চাইলেন ছায়া দেবীকে। শুরু হল দক্ষ হাতে সোনা গলানোর কাজ।  দেবকীকুমারের কঠিন অনুশাসন ও অভিভাবকত্বে ছায়া দেবীর অভিনয়ে এল ধার ও চমক। ছবি মুক্তি পেতেই অজস্র পুরস্কার এল তাঁর ঝুলিতে। এরপর দেবকীবাবু বাংলা ও হিন্দিতে আনলেন ‘বিদ্যাপতি’কে। রানি লক্ষ্মীর চরিত্রে সিনেমাপ্রেমীদের যেন বশ করলেন ছায়া দেবী, তখন তিনি বয়সেও খানিক পরিণত।  অভিনয়ে তাঁর পারিশ্রমিক যখন বেশ সম্মানজনক, হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন ‘নিউ থিয়েটার্স’ ছেড়ে দেবেন, দিলেনও। অথচ তখন ট্রাজিক ছবির নায়িকা ছায়া দেবীর অভিনয় ও গায়কিতে হতবাক গোটা ভারত। লোকে বলল, বড়োবাড়ির মেয়ের দেমাক, হঠাৎ খেয়াল।

আদতে এমন খেয়ালিই ছিলেন ছায়া। যখন যা করতে মনে হয়েছে সেই সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। ছোটোবেলার জীবনের অতর্কিত আঘাতটাই তাঁকে হয়ত ভবিষ্যতে এমন দৃঢ় করে তোলে। তাই সিনেমার ছায়াদেবীকে এরপর নিয়মিত শোনা গেল রেডিওয়। জনপ্রিয় হল ছায়াদেবীর গাওয়া ঠুমরি, দাদরা। অনেকে অনুরোধ করলেন সিনেমায় প্লেব্যাক করতে, কিন্তু তিনি শুনলেন না। বললেন, ‘গান আমার গোপন সুখ’। এরপর হঠাৎই আবার সেই বিরতি শেষে কিছুটা অভিনয়ের টানে আর অনেকটাই সুশীল মজুমদারের জোরাজুরিতে সিনে জগতে ফিরলেন ছায়া দেবী।  ‘অভয়ের বিয়ে’তে তিনি তখন পরিণত নায়িকা। স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাংলা সিনেমায় এরপর সূচনা হল সাদা কালো এক স্বর্ণযুগের। ছায়া দেবী তখন চরিত্রাভিনেত্রী। তাঁর বলিষ্ঠ ও দৃপ্ত অভিনয়ের ছটায় ঢাকা পড়েন নায়ক, নায়িকারা তবু শ্রদ্ধার আসনটি রইল অটুট। কারণ, ওই বাজখাঁই মেজাজ আর তুখোড় অভিনয় দক্ষতা। ক্যামেরার সামনে ছায়া দেবীর অভিনয়ে কখনও ম্লান হয়ে যায় নায়ক নায়িকা। সে যুগ ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধার, তাই তাঁর সঙ্গে অভিনয়ে আপত্তি তো দূরে থাক, ছায়া দেবীর স্ক্রিন প্লেজেন্সের ছায়ায় বারবার নত হয়েছেন তাবড় তাবড় কলাকুশলীরা।  ভালোকে ভালো বলার অসামান্য গুণ ছিল ছায়াদেবীরও। তাই তাঁর চেয়ে জুনিয়রদের ভালো কাজে সবসময় দেদার প্রশংসাও করেছেন তিনি। চরিত্রের গভীরে ডুবে যাওয়া উত্তমকুমারকে শুধু তাঁর অসামান্য অভিনয় গুণের জন্যই স্নেহ করতেন না ছায়া দেবী, ‘এন্টনী ফিরিঙ্গী’র মা-ছেলের সম্পর্ক বাস্তবেও তেমন সত্যিই ছিল। মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের পর্দার মা ছায়া দেবীর সঙ্গে রিয়েল লাইফেও মিসেস সেনের সম্পর্ক ছিল বড়োই আপন। আত্মপ্রচার, ভিড়ভাট্টায় তীব্র অনীহায় অন্তরালবাসিনী ছায়া দেবীর সঙ্গে সাধারণ লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়া মহানায়িকার শেষদিন পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল ফোনে। 

ছায়া দেবী আর ছবি বিশ্বাস নিয়ে যেন তখন বাংলা ছায়াছবি। অভিজাত চরিত্রে ছবি বিশ্বাস থাকা মানেই দর্শক নিশ্চিত যে সে ছবিতে ছবি বিশ্বাসের ঘরনি ছায়া দেবী। রসবোধ ছিল চূড়ান্ত, তাই ছবি বিশ্বাসকে দেখলেই কপট রাগ দেখাতেন ছায়া দেবী, বলতেন, ‘যে দিকে যাব, শুধু ছবি বিশ্বাস’। কম যান না ছবি বিশ্বাস, হাসতে হাসতে শুনিয়ে দিতেন, ‘সবই কপাল ম্যাডাম’। চোখে জল আনার জন্য কখনও গ্লিসারিন লাগত না ছায়া দেবী, কানন দেবীর মতো সে যুগের অভিনেত্রীদের। বয়সে ও অভিনয়ে ছোটোদের ছায়া দেবী বারবার শিখিয়েছেন চরিত্রে ডুব দিতে, তাহলেই তো ছায়ায়, কায়ায় এক হওয়া যায়। আর এভাবেই অবলীলায় জীবন্ত হয়ে উঠেছেন ‘পদিপিসি’, ‘সাত পাকে বাঁধা’র মিসেস বসু, ‘আপনজন’-এর আনন্দময়ী। সবসময় বলতেন,  ‘অভিনয় করতে গেলে অনুভব জানতে হয়’। সংসার জীবনের শুরুতেই কাঁচা মন ভাঙার যন্ত্রণা বুকে ধারণ করতে হয়েছিল যে মানুষটিকে, শুধু অভিনয়ে নয়, তাঁর সমগ্র জীবনেই যে অনুভবের তীব্র ছোঁয়াচ থাকবে, এতে আর আশ্চর্য কী! ‘দেয়া নেয়া’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘হারমোনিয়াম’-এর ছায়া দেবী তাই কখনও দর্শককে বুঝতে দেন না যে তিনি অভিনয় করছেন। সবসময় এতটাই সাবলীল আর প্রাণবন্ত তাঁর সংলাপোচ্চারণ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ।   

‘আপনজন’ চলচ্চিত্রে ছায়া দেবী 

মানুষের মনে দাগ কাটে সেই অভিনয়ই, যখন তা আদতে অভিনয় না থেকে অনুভব হয়ে ওঠে। বাঙালির দ্বিতীয় ‘গ্রেটা গার্বো’ ছায়া দেবীর জীবনের সব অভিনয়েই সেই অনুভবের সযত্ন প্রকাশ। স্বর্ণযুগের বাংলা সিনেমাকে সোনায় মুড়েছিলেন ছায়া দেবীর মতো অভিনেত্রীরাই, বাবার দেওয়া কনক নামটা যেন তাই সার্থক। ২০০১ এর আজকের দিনে শরীর যায় ছায়াদেবীর, কিন্তু আজও পুরোনো দিনের  বাংলা সিনে জগতে কান পাতলেই যেন বেজে ওঠে কনকবালার কনক কাঁকনের সে ঝনক ঝনক। বাংলা ছায়াছবি আজীবন ঋণী হয়ে আছে, থাকবে সেই কাঁকনের শব্দে।

Developed by DXDasia