‘সাড়ে চুয়াত্তর’ থেকে ‘সপ্তপদী’ – সুচিত্রা সেনের ‘ম্যাডাম’ হয়ে ওঠার আপসহীন জেদ

‘চতুরঙ্গ’-র দামিনী ছিল সুচিত্রা সেনের প্রিয় চরিত্র

রমা দাশগুপ্ত থেকে সুচিত্রা সেন। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ‘ম্যাডাম’ এবং অতঃপর মহানায়িকা খেতাব – এ এক বিরাট জার্নির আখ্যানবলয়। আর একের পর এক খ্যাতির সিঁড়ি চড়তে চড়তে আত্মপরিচয়কে সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন ব্যক্তিত্বময়ী শব্দের অর্থক্ষেত্রে। আপসহীন জীবনে নিজের শর্তেই চলেছেন আজীবন। বেপরোয়া, সাহসী, অত্যন্ত বাকপটু সুচিত্রার নানা গল্প বাতাসে ভেসে বেড়ায় আজও। স্টারডাম, আভিজাত্যের সঙ্গে সততা, আত্মবিশ্বাস এমন বৈচিত্র্যময় স্বভাবে রহস্যময়ী রমণীয়ত্বের ঘেরাটোপ বরাবরই বজায় ছিল তাঁর। বাংলা সিনেমার সুবর্ণযুগকে চিহ্নিত করতে করতে এগিয়েছে যে প্রজন্ম, সেই প্রজন্মের মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। একটা নাম, একটা ব্র্যান্ড। আর এ সবকিছুই নিজের স্বাতন্ত্র্যে।

এর বাইরে ঘটনাপ্রধান ব্যক্তিগত জীবনের গসিপ ছাড়িয়েও নিজেকে রুপোলি পর্দায় প্রক্ষেপণের একনিষ্ঠতা তাঁকে আজও অবিস্মরণীয় করে রেখেছে বাঙালি মানসে। কেবল ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ নন, বরং বর্তমানের যুব প্রজন্মও সুচিত্রার হাসি দেখতে, উন্নত গ্রীবা দেখতে, মরালগামিনী চলন দেখতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাদা-কালো সিনেমায় চোখ রাখে। আজও মাতিয়ে রেখেছেন বাংলা সিনেমার চিরকালীন প্রেমিকা নারী— এর কোনো তুলনা হয় না।

যক্ষ পত্নীর বর্ণনা দিতে গিয়ে কালিদাস ‘তন্বীশ্যামাশিখরিদশনা’র যে নায়িকামূর্তি কল্পনা করেছেন তা দিয়ে রূপের বর্ণনা চলে সুচিত্রার। বড়ো টানা চোখ, পুরু ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, পানপত্রী মুখের অবয়বে থুতনির পাশে তিল আর ভরাট হাসিতে মোহময়ী তিনি। সর্বকালের সেরা জুটি সুচিত্রা-উত্তম। সেখানে প্রেমিকার অভিমানে, ক্ষোভে, দুঃখে, বেদনায়, অভিসারে, আদরে তাঁর ভঙ্গি সবসময়ই প্রেমিকাদের অনুকরণীয় আর প্রেমিক হৃদয়ের বুক ধুকধুকের কারণ।

‘তুমি যে আমার’ – হারানো সুর (১৯৫৭) চলচ্চিত্রের বিখ্যাত একটি গান

বক্স অফিসে হিট ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ প্রাথমিক ‘ভাঙবে তবু মোচকাবে না’ সুলভ কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পাঠরত শিক্ষিতা, রুচিশীলা তরুণীর ছবি এঁকে দেন। বাংলা সিনেমায় সুচিত্রা সেনের প্রেমিকামূর্তির একটা স্তম্ভ। ছাতা মাথায় দিয়ে সিনেমা দেখতে যাবার কালে রামপ্রীতির সঙ্গে কথোপকথন, আর সেখান থেকে ফিরে এসে ‘দিও গো বাসিতে ভালো’ এই গানের দৃশ্য বড়োপর্দায় তাঁর এ রূপের সূচক। এ গেল ১৯৫৩। এরপর অজয় করের পরিচালনায় দুটো বিখ্যাত ছবি ছিল ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭) এবং ‘সপ্তপদী’ (১৯৬১)। এখানেও সুচিত্রা-উত্তম জুটির রসায়ন আপামর বাঙালিকে মুগ্ধ করেছিল অভূতপূর্বভাবে, যা আজও স্মরণীয়। ‘হারানো সুরে’ এক নারীর তিতিক্ষা, সহনশীলতা বাঙালি নারীর আর্কেটাইপকে অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। পলাশপুরে বিয়ের রাতে টিলার উপর লাল ফুলের গাছ থেকে ঝরে পড়া অজস্র ফুলের মাঝে বসে গালে হাত দিয়ে রমা তার কোলে স্বামীকে শুইয়ে ‘তুমি যে আমার’ গাইছে, এ দৃশ্য বাঙালি ভুলতে পারেনি এখনও। ‘হারানো সুর’ বৈধ প্রেমের প্রতিষ্ঠার কথা বলে, এ প্রেম শকুন্তলার কথা মনে করায়। আবার ‘সপ্তপদী’র রিনা ব্রাউনের কলেজ জীবনের খুনশুটি, বাইকের নিচে প্রেমিকের সঙ্গে নদীর ধারে ঘাসের উপর শুয়ে প্রেমালাপ আর অবিস্মরণীয় ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ দৃশ্যে প্রেমিককে পিছন থেকে জড়িয়ে ‘লা লা লা লা’র উচ্ছ্বাসপূর্ণ হাসি আর ঘাড় বাঁকিয়ে আকাশ দেখার দৃশ্য – এ সব বড়ো পর্দায় সুচিত্রাকে অমর করে রেখেছে। আর সাধারণ দর্শকের মনে প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়ে মা সমস্ত ভূমিকাকে খোদাই করে দিয়েছে। এবং সব ভূমিকাতেই এক ব্যক্তিত্বময়ী নারী। স্বাবলম্বী, প্রখর বুদ্ধি-সম্পন্না, চতুর, বাকপটু নারী।

রাগের এক্সপ্রেশনে ঊর্ধ্ব গ্রীবা। যেমন ‘শাপমোচন’ সিনেমার একটি দৃশ্যে মহেন্দ্রর দাদা দেবেন্দ্র টাকা ফেরত পাঠালে মাধুরী ‘দাম… এতে কি আত্মীয়তার কোনো কিছুই নেই?’ বলার সময় হয়। এখানেই আবার নিজেকে প্রেমে বঞ্চিত ভেবে, রানুকে মহেন্দ্রর বুকে দেখে রজনীগন্ধার মালা বুকে চেপে হাউহাউ কান্না – এ এক নারীর যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। আর এ সব ভূমিকায় চমৎকার সংলাপে তিনি নিজেকে দর্শক মনে রোমান্টিক নায়িকা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। আর এ সব কিছুর সঙ্গে মিশেছে তাঁর ভরাট কন্ঠস্বরের রমনীয়ত্ব।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের বহু চরিত্রে অভিনয় করলেও তিনি আসলে রাবীন্দ্রিক নায়িকার আর্কেটাইপ ফোটান সেলুলয়েডে। ভুলে গেলে চলবে না ‘চতুরঙ্গ’-র দামিনী ছিল তাঁর প্রিয় চরিত্র।

Developed by DXDasia