সুচিত্রা সেন যখনই উত্তম গণ্ডির বাইরে গেছেন, তখনই সাফল্য পাননি
বিশ শতকের পাঁচের দশকে বাঙালি পেল সম্পূর্ণ নতুন একটি জুটিকে। যাঁরা চলচ্চিত্রের রোম্যান্টিকতাকে করে তুলেছিলেন বিশ্বজনীন। দর্শক মনে মনে ভেবেছিল ‘যেমনটি চাই তেমনটি পাচ্ছি কই!’ – আর পাঁচের দশকের শুরুতে দর্শক সেই বাক্যই পরিবর্তন করে বলে ফেলল ‘যেমনটি চাই তেমনটিই’। উত্তম-সুচিত্রা। এই অমলিন হাসি আর ছোঁয়া ঘুম ভাঙিয়েছিল বাঙালির।
সপ্তপদী চলচ্চিত্রের কালজয়ী সেই গান
কিন্তু সুচিত্রা সেন যখনই উত্তম গণ্ডির বাইরে গেছেন, তখনই সাফল্য পাননি। সুচিত্রার ‘বলয়গ্রাস’ প্রেক্ষাগৃহে মুখ থুবড়ে পড়েছে। বসন্ত চৌধুরী কিংবা বিকাশ রায়ের সঙ্গে (‘শুভরাত্রি’ এবং ‘সাজঘর’) জুটি বেঁধে ব্যর্থ হয়েছেন। দর্শক উত্তম-সুচিত্রাকে একসঙ্গেই দেখতে চেয়েছেন বারবার। পর্দার চরিত্রেরা যেন রক্তমাংস করে তুলেছিল তাঁদের। দর্শক নিজের ঘরের একজন করে তুলেছিল। এ যেন এক অবিচ্ছেদ্য জুটি। যাঁরা দর্শককে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, ভালোবাসিয়েছেন, প্রেমে পড়িয়েছেন।

পর্দায় একসঙ্গে
সেই অর্থে বলতে গেলে এই জুটির প্রথম হিট ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩)। কিন্তু এই ছবিতে উত্তম কুমার বা সুচিত্রা সেন কেউই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেননি। এমনকি পোস্টারেও ছিল না তাঁদের ছবি। তুলসী চক্রবর্তী ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। কিন্তু স্বল্প দৃশ্যে সেদিনই নজর কেড়েছিল এই জুটি। ঠিক এমনই একটি জুটিকে খুঁজছিল সেদিনকার দর্শক।
‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩) থেকে ‘প্রিয় বান্ধবী’ (১৯৭৫)। সুদীর্ঘ বাইশ বছরে একসঙ্গে ছবি মাত্র ত্রিশটির কাছাকাছি। কিন্তু এই ত্রিশটিই হিট। বাংলা চলচ্চিত্রকে যে ছবিগুলি উচ্চতার পাথর ছুঁতে শিখিয়েছিল। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আর্থিকভাবে মন্দা হলেই খোঁজ খোঁজ রব উঠত একমাত্র উত্তম-সুচিত্রার জন্যই। বাংলাদেশে একটি ছড়া এখনও মুখে মুখে ফেরে মানুষের – “নাইলন শাড়ি, ফাউন্টেন পেন/ উত্তমকুমারের পকেটে সুচিত্রা সেন।”

সেই প্রেম, সেই গান, সেই হাসি, সেই ছোঁয়া
জীবদ্দশায় উত্তমকুমার একটি সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, “সুচিত্রা পাশে না থাকলে আমি কখনোই উত্তমকুমার হতে পারতাম না। এ আমার বিশ্বাস। আজ আমি উত্তমকুমার হয়েছি, কেবল ওর জন্যই।” তাঁরা চলে গেছেন। কিন্তু সেই প্রেম, সেই গান, সেই হাসি, সেই ছোঁয়া কি ভুলে যাওয়া সম্ভব! চোখের আড়ালেও সম্ভব নয়।