
সাম্যময় ওরফে ‘ভানু’ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ
১৯৫৫ সাল। টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে একদিন শুটিং চলছে। ব্যস্ততা বেজায়। হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল সব ব্যস্ততা। কী, না সভা ডেকেছেন জহর রায় (Jahar Roy)! এই জোট তাঁর বন্ধুর জন্য। কিছু লোক জুটিয়ে চলছে বক্তৃতা!
“আপনারা সবাই শুনুন, ভানু বন্দোপাধ্যায় আজ একটি রেকর্ড করেছে, বাংলাদেশের সর্বপ্রথম লোক যে, কমেডি করে একটি গাড়ি কিনেছে অর্থাৎ কমেডিয়ানের গাড়ি, এ আমাদের বাংলাদেশের সমস্ত কমেডিয়ানের গর্ব…”।
এ গাড়ি ‘ভেনোর’ একার নয়, এ গাড়ি আমাদের সবার। বন্ধুর সাফল্যকে এমন ভাবেই নিজের করে নিয়েছিলেন। সেই জমায়েতে উপস্থিত ছিলেন জহরের বন্ধু নিজেও। তাঁর দিকে তাকিয়ে সোজাসুজি বলেছিলেন, “প্রত্যেক শনিবার সকালে আমায় গাড়ি পাঠাবি”।
বন্ধুর নাম সাম্যময় বন্দোপাধ্যায় (Samyamoy Bandyopadhyay)। জহর রায় ভালোবেসে ডাকতেন ‘ভেনো’ বলে। বাংলা ছবির ‘ভানু’।
প্রত্যেক শনিবার ট্যাঙ্কে তেল ভর্তি করে ভানুর অস্টিন পৌঁছে যেত বন্ধু জহরের কাছে। সেই গাড়িতেই তিনি ইন্ড্রাস্ট্রিতে আসতেন। আর ভানু ঘুরতেন ট্যাক্সি নিয়ে। প্রথমবারের গাড়ি সেকেন্ড হ্যান্ড। কিন্তু আনন্দে কমতি হবে কেন তার জন্য! কয়েক বছর পর বাড়িতে এল ফিয়াট। ইতালির মিলান থেকে সরাসরি দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে। ঝকঝকে নতুন গাড়ি। সেই গাড়ি নিয়েও একই রকম আবেগ দুই বন্ধুর।
একবার জন্মদিনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে উত্তর দিয়েছিলেন, “লাগছে ভালই, কিন্তু যমালয়ের দিকে আরও একটু এগিয়ে গেলাম…”।
“একই কাজের জগত। দুজনেই পর্দায় সেরা কমেডি জুটি। কিন্তু বন্ধুত্বে এতটুকু তার প্রভাব নেই। ৩০ বছর ধরে একই স্রোতে সেই বন্ধুত্বের বয়ে যাওয়া। টালিগঞ্জ পাড়া এমন খুব একটা দেখেনি।” ভানু আর জহরের বন্ধুত্ব নিয়ে এমনই মন্তব্য ভানুপুত্র গৌতম বন্দোপাধ্যায়ের (Goutam Bandyopadhyay)।
তিরিশ বছরের বন্ধুত্ব প্রতিদিন নতুন ঢেউয়ে বয়ে গেছে। শুরুটা হয়েছিল চল্লিশের দশকে। দেশ তখন স্বাধীন হয়নি। সময়ও অন্য খাতে বইছে। অভিনেতা-পরিচালক সুশীল মজুমদারের বাড়িতে। ভানু বন্দোপাধ্যায় (Bhanu Bandyopadhyay) তখন ছবিতে সুযোগের জন্য সবে চেষ্টা শুরু করছেন। জহরও তাই।
পাটনা থাকতেন একসময়। সেই সূত্রেই চিনতেন সুশীল মজুমদারের স্ত্রী আরতি মজুমদারকে। ভানুর চেনাটা ওপার-বাংলার ‘মাস্টার দিদিমণির পোলা’। সেই বাড়িতে দুজনেই যেতেন। আলাপটা সেখানেই। প্রথম দিকে লোকজন ‘লরেল-হার্ডি’ বলে ডাকত। ভানু লরেল, জহর হার্ডি। সেই ইমেজ কীভাবে যেন ছড়িয়ে পড় ছিল বাংলার দর্শকদের মধ্যেও।
দুজনেই দুজনের অভিনয়ের প্রতি অসম্ভব শ্রদ্ধাবান। জহর রায় অসম্ভব পড়ুয়া স্বভাবের। বন্ধুর এই গুণকে খুব কদর দিতেন ভানু। বন্ধুত্বের বাঁধনটা ছিল পারিবারিক পর্যায়ে। ছেলেমেয়েরা ‘জহরকাকা’ বলতে অজ্ঞান। তাঁদের কাছেই তিনিই সেরা।
জহর রায়ের মৃত্যুতে ভানু বলেছিলেন, “ব্র্যাকেটটা ভেঙে গেল”। বন্ধু বিয়োগ মানতে পারেননি।
নিজের জন্মদিন নিয়ে বাড়তি উচ্ছ্বাস কোনওদিন সেভাবে ছিল না সাম্যময় বন্দোপাধ্যায়ের। তবে পারিবারিক উদযাপন হতই। পায়েস-ফুল-মিষ্টিতে যেভাবে আর পাঁচটা বাঙালি বাড়িতে হয়। শেষ ৮-১০ বছর একটু বিশেষভাবে। দেখা করতে আসতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, শুভেন্দু চ্যাটার্জি।
একবার জন্মদিনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলনে, ‘জন্মদিনে কেমন লাগছে?’
উত্তর দিয়েছিলেন, “লাগছে ভালই, কিন্তু যমালয়ের দিকে আরও একটু এগিয়ে গেলাম…”।
ভানু বন্দোপাধ্যায় জীবনকে দেখতেন এভাবেই। লোক ভোলানো হাসির মাঝেও জীবন এবং সময়ের প্রতি গভীর অন্তর্দৃষ্টি। হাস্যকৌতুক বা অভিনয়ে সময় উঠে এসেছে সেই দেখা থেকেই। নায়ক-নায়িকা নির্ভর ছবিতে কৌতুক–অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেতে কম লড়াই করতে হয়নি। সেই লড়াইয়ে তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন জহর।
নায়ক-নায়িকার টানা অভিনয়ের মাঝখানে তাঁরা সুযোগ পেতেন ‘রিলিফ’ হিসেবে। সেই সুযোগকে কখনও হাতছাড়া করেননি। পর্দায় তাঁদের এক মুহূর্তের উপস্থিতিও তাই এত ব্যঞ্জনার।
অভিনেতা জীবনের কয়েকটা বছর জহর ছিলেন ‘শিল্পী সংসদ’-এ আর ভানু ‘অভিনেতৃ সঙ্ঘ’-এ। কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত তাঁরা একই ব্র্যাকেটে। যখনই একজনের কথা হবে, এসে পড়বেন অন্যজন। দিনটা যেদিনই হোক না কেন!
