
বাংলা চলচ্চিত্রের যত্নবান পরিচালক, ‘আপনজন’ তপন সিংহ
বাঞ্ছারাম ফলিডল খেয়ে মরবে ভোর রাতে। কর্তামশাইয়ের সঙ্গে এমনই চুক্তি হয়েছে তার। অপমান আর লাঞ্ছনার চাদর জড়ানো বাঞ্ছারূপী মনোজ মিত্র সেই মতো হাতে তুলে নিলেন বিষের শিশি। ছিপি খুলে মুখে সবে ঢালতে যাবেন অমনি এক অপার্থিব চিৎকরে দর্শকও নড়েচড়ে বসল। বাঞ্ছারামের পোয়াতি নাতবৌয়ের কোল আলো করে তখন পাশের ঘরে জন্ম নিয়েছে এক ফুটফুটে পুত্র সন্তান। তারপর, নতুন জীবনের স্পর্শ ধুয়েমুছে দিল বাঞ্ছারামের জীবন যন্ত্রণা। ঘটা করে তাকে শ্মশানে নিয়ে যেতে আসা কর্তামশাইকে বৃদ্ধ বাঞ্ছা বলতে বাধ্য হল, “বাবু আমি মরতে পারব না”। এরপর সবুজ ‘সাজানোবাগানে’র দিকে হেঁটে যাচ্ছেন মনোজ মিত্র। কখনও লং শটে, কখনও ক্লোজআপে ধরা পড়ছে বাঞ্ছারাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ক্যামেরা। আর তার সঙ্গেই এগিয়ে চলেছেন বাংলা সিনেমার যত্নবান পরিচালক, ‘আপনজন’ তপন সিংহ। সামনে তখনও যে তাঁর অনেকটা পথচলা বাকি! আবার পিছনেও ফেলে এসেছেন নানা চড়াই-উৎরাই। সে পথে কখনও ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনি শ্বশুর বাড়ি যায়। ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’র কাছে নিয়ে যায় কখনও সে পথ। কখনও বা এক ডাক্তারের স্বেচ্ছামৃত্যুর অভিঘাতে ক্ষতবিক্ষত করা হয় সহৃদয় দর্শককে।
কাবুলিওয়ালা (১৯৫৭)
যেকোনো শিল্পে প্রাদেশিকতাকে প্রাধান্য দিলে তা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তাই সচেতনভাবে ‘বাঙালি’ কথাটি ছেঁটে ফেলে বলাই যায় পরিচালক তপন সিংহ সেই মানুষ, যিনি সিনেমাপ্রেমী ভারতীয়দেরকে মননচর্চার অনেকখানি সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তপন সিংহ’র হাতের ছোঁয়ায় ‘গল্পেরা’ ‘সত্যি’ হয়ে উঠেছে বারবার। তাঁর নিজের জীবনটাও যেন এক গল্পের চিত্রনাট্য।
বীরভূমের মুরারই থানার জাজিগ্রামে প্রসিদ্ধ ‘সিংহ’ পরিবারের সন্তান তপন সিংহ। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছোটোবেলা থেকেই। আর ছিল গতে বাঁধা ছকের বাইরে একটি অনুসন্ধিৎসু ব্যতিক্রমী মন। এই কারণেই হয়তো, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাত দশক আগে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পাশ করার পরেও ছকে বাঁধা দশ-পচিশের ঘুঁটিঘরে আটকে পড়েননি তপন সিংহ। নতুন কিছু করার আশায় তাঁর প্রথম কাজের সুযোগ এসেছিল তখনকার নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে। ১৯৪৬ সালে এখানেই তপনবাবু শব্দসহকারী হিসেবে যোগ দেন। হাতেকলমে কাজ শেখার সেই শুরু। ‘সাউন্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট’ থেকে সিনেমার ‘ডিরেক্টর’ হয়ে ওঠার পথটা খুব সহজ যে ছিল না তা বোঝাই যায়। কিন্তু নতুন নতুন কাজের আগ্রহই পরবর্তীতে তপন সিংহের জন্ম দিয়েছিল। নারায়ণ গাঙ্গুলির গল্প অবলম্বনে তপন বাবুর নিজের পরিচালনায় প্রথম ছবি ‘অঙ্কুশ’ মুক্তি পায় ১৯৫৪ সালে। প্রথম পরিচালনা হিসেবে এই ছবি যথেষ্টই উল্লেখের দাবি রাখে, কারণ এর পরবর্তীতে তপন সিংহ তাঁর সিনেমা ‘উপহার’-এর জন্য নায়ক হিসেবে পান উত্তমকুমারকে। তখনও তিনি ‘মহানায়ক’ হয়ে ওঠেননি। তপন সিংহের ডাকে পার্শ্বচরিত্রে এখানে অভিনয় করেছিলেন উত্তমকুমার। চিত্রনাট্য পছন্দ হয়েছে এ কথা তপনবাবুকে জানাতেই তিনি উত্তম কুমারকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন নিজের মতো করে সংলাপ বলতে। শুনে উত্তমকুমার অত্যন্ত খুশি হয়ে বলেছিলেন ‘তোমার কাছেই প্রথম শুনলাম জানো! সব ডিরেক্টর যা ডায়লগ লেখে, সেটাকেই বলতে বলে। এতে কি অভিনয় হয় বলো?’ পরিচালক তপন সিংহ ভিতরের আমিটাকে বের করে আনার জন্য এতটাই ‘স্পেস’ দিতেন অভিনেতাদের।
জতুগৃহ (১৯৬৪)
‘উপহার’-এর পরে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় উত্তমকুমার ও তপন সিংহের। ‘ঝিন্দের বন্দী’তে তপনবাবুর এককথাতেই ঘোড়ায় চড়া শিখতে রাজি হয়েছিলেন উত্তমকুমার। সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের ‘জতুগৃহ’ করতে গিয়ে উত্তমকুমার নিজেই তপন সিংহকে জানালেন “আমি তো ভবানীপুরের রকে আড্ডা মেরে বড়ো হয়েছি, উচ্চারণ খুব একটা ভালো নয়। ছবিদার মতো মার্জিত ডায়লগ বলতে পারি না।” উপায় বলে দিলেন তপন বাবু। “রোজ সকালবেলা একটা করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করবেন।” শোনা যায়, এ কথা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিলেন মহানায়ক। বড়ো পর্দায় তপন সিংহকে প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্য এনে দেয় ‘কাবুলিওয়ালা’। তপনবাবু তখন জুনিয়র পরিচালক, এদিকে তাঁর ছবিতে কাবুলিওয়ালার ভূমিকায় অভিনয় করছেন দিকপাল ব্যক্তিত্ব ছবি বিশ্বাস। তপন সিংহ হঠাৎ একদিন দেখলেন, মাথায় জরির পাগড়ি গায়ে সিল্কের আচকানের ওপর জরির কাজ করা প্রায় ঔরাঙ্গজেবের পোশাক পরিহিত ছবি বিশ্বাস মেটিয়াবুরুজের সেটে এলেন কাবুলিওয়ালার অভিনয় করতে। কী বলবেন বুঝতে না পেরে ‘ইগনোরেন্স ইজ ব্লিস’ ভেবে নিয়ে কাজ শুরু করে দেন তপন সিংহ। তিন চার দিনের শুটিং ওইভাবে হয়ে গেলেও পরে ছবির প্রযোজক অসিত চৌধুরীর জোরাজুরিতে তপন বাবু ও অসিত বাবু দু'জনে মিলে ছবি বিশ্বাসকে অনুরোধ করাতে সেই ‘রাজবেশ’ ছেড়ে কাবুলিওয়ালার গরীব বেশ পরতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। তখন আবার প্রথম থেকে শুরু হয়ে ছিল সিনেমার শুটিং। কিন্তু ছবি বিশ্বাসের রাজকীয় খামখেয়ালি মেজাজ জুড়ে ছিল সারা ছবিতে। স্পিরিট গাম দিয়ে কিছুতেই দাড়ি লাগাতে চাননি ছবি বিশ্বাস। তাই সারা ছবি জুড়ে কিম্ভুতকিমাকার এক দাড়ি নিয়ে দেখা যায় মিনুর কাবুলিওয়ালাকে। কেন পরিচালক হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে জোরাজুরি করেননি এ নিয়ে পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায় খুব বকাবকি করেছিলেন তপন সিংহকে। যদিও ততদিনে ‘কাবুলিওয়ালা’ নিয়ে হইচই পড়ে গেছে গোটা দেশেই। বার্লিন ফেস্টিভ্যালে ছবিটি দেখে এক বিদেশি সাংবাদিক তপন সিংহকে জানিয়েছিলেন, ছবি বিশ্বাসের অনবদ্য অভিনয়ে ওঁর দাঁড়ির বিষয়টি নিয়ে সমস্তরকম অভিযোগ উনি ভুলিয়ে ছেড়েছেন। আবার নিজের খেয়ালে এই ছবি বিশ্বাসই কাশ্মীরের শুটিংয়ে কাবুলিওয়ালার কস্টিউম পরে হাজির করেছিলেন সহকারি বলাই সেনকে। অজেয় অভিনেতা ছবিবাবুকে কী বলবেন ভেবে পাননি তপন সিংহ। আজও তাই ওই সিনেমায় বাকি সব অংশের কাবুলিওয়ালা ছবি বিশ্বাস হলেও কাবুলের দৃশ্যে কাবুলিওয়ালা রূপে যাকে দেখা যায় তিনি বলাই সেন। তপন সিংহ পরিচালক হিসেবে এভাবেই অনেকটা ছেড়ে দিতেন সিনেমার কলাকুশলীদের ওপর। আর তাতে প্রতিবারই শাপে বর হত। এই মেজাজি ছবি বিশ্বাসকেই দেখা যায় তপন সিংহের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এ নিজে থেকে এগিয়ে এসে ‘রোল’ নিতে, ওই বয়সেও প্রাণান্তকর পরিশ্রম করতে।
বাঞ্ছারামের বাগান (১৯৮০)
নিজের ভদ্রতার গুণেই তপন সিংহ সেসময়ের তাবড় তাবড় অভিনেতা অভিনেত্রীদের দিয়ে খুব সাবলীল কাজ করিয়ে নিতে পেরেছিলেন। ‘সাগিনা মাহাতো’র শুটিং এ অভিনেতা দিলীপকুমারকে নিয়ে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। কোন সিন পছন্দ না হলে নানা টালবাহানা করে তা বাদ দেওয়ার চেষ্টা করতেন দিলীপকুমার। একদিন সেটে এসে দেখা গেল দিলীপকুমার গ্রিনরুমে বসে আছেন ঘাড়ে ‘হটব্যাগ’ নিয়ে। আতঙ্কিত তপন সিংহ তাঁর কাছে যেতেই তিনি বললেন ঘাড়ে ব্যথা, আজ আর হবে না কিছু। একটা গোটা দিন শুটিং ক্যানসেল মানে অনেক টাকার ধাক্কা। বুদ্ধি করে তখন তপনবাবু দিলীপকুমারকে বললেন, ‘ব্যথা তো একটু হবেই। নার্গিস, মীনাকুমারী, বৈজয়ন্তীমালা… কত কত নায়িকা ওই কাঁধে মাথা রেখে অভিনয় করেছে..’। ‘অসুস্থ’ দিলীপকুমার হেসে ফেলে তখন বলেছিলেন, '’বাবা শ্যুটিং করবে চলো,….বাঙালিদের সঙ্গে পেরে ওঠা দায়’। আবার এর উল্টো ঘটনা অভিনেতা অশোককুমারের ক্ষেত্রে। ‘হাটেবাজারে’র সেটে সত্যিই অসুস্থ অশোককুমার হাঁপানি নিয়েও নিজে থেকেই অভিনয় চালিয়ে গেছিলেন। তপন সিংহের অনুরোধেও শ্যুটিং বন্ধ করেননি শুধুমাত্র পরিচালকের কাজের ক্ষতি হবে বলে। নিজের ভেতরকার ভালোত্বর গুণেই সকলের কাছে এভাবেই এত প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তপন সিংহ।
আদালত ও একটি মেয়ে (১৯৮২)
বাস্তবের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ তপন সিংহের পরিচালনার মূল শর্ত। ‘হুইলচেয়ার’-এ অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যাতে ঠিকঠিক এক প্রতিবন্ধীর যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলেতে পারেন তার জন্য বনহুগলীতে এক পরিচিত ডাক্তারের কাছে দু-তিন বার তাঁকে পাঠান তপনবাবু। দুর্ঘটনায় ওই ডাক্তারবাবুর দুটি পা'ই বিকল হয়ে গেলেও হুইলচেয়ারে তিনি গোটা হাসপাতাল চক্কর দিতেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে এই বিষয়টি রপ্ত করাতেই তপনবাবুর এই উদ্যোগ ছিল। বাস্তব বারবার কথা বলেছে তপন সিংহের ছবিতে। ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’, ‘আতঙ্ক’, ‘অভিমন্যু’র মতো সিনেমা তার প্রমাণ। আজও যখন দিল্লি, উন্নাও, হাসরতে কিংবা ভারতবর্ষের প্রতিটি কোণায় কোণায় প্রায় প্রতিদিন নির্ভয়ারা ধর্ষিত হন, ছিন্নভিন্ন করা হয় মণীষা বাল্মীকিদের শরীরকে, তখনও দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তপন সিংহের ছবি ‘আদালত ও একটি মেয়ে’। মানুষকে এভাবেই বারবার জীবনের আয়নার সামনে দাঁড় করানো, শিক্ষিত মননকে উস্কে দেওয়া যে নাম তপন সিংহ, আজ তাঁরই মৃত্যুদিন।
এক ডক্টর কি মউত (১৯৯১)
তথ্যঋণঃ
মনে পড়েঃ তপন সিংহ

