শোলা শিল্পের বিশ্বকর্মা মধুমঙ্গল মালাকার, হাতের কাজে করেছিলেন বিশ্বজয়

বাংলার শোলা শিল্পের পাশাপাশি নানান হস্তশিল্পেরও কারিগর ছিলেন মধুমঙ্গল মালাকার

কখনও কালী, কখনও শিব, আবার কখনও বা রাবণ, শোলা কেটে রং তুলির ছোঁয়ায় তৈরি করতেন নিত্যনতুন মুখোশ। শুধু তাই কেন? ঘর সাজানোর সরঞ্জাম থেকে শুরু করে শোলার রঙিন ফুল কিংবা টোপর, ডাকের সাজ, সবেতেই তিনি যেন ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মার বরপুত্র। বাংলার শোলা শিল্পের সেই অন্যতম কারিগর দক্ষিণ দিনাজপুরের মুস্কিপুর গ্রামের মধুমঙ্গল মালাকার, মাত্র ৬২-তেই থেমে গেল তাঁর পথ চলা। বেশ কিছু দিন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন তিনি, শরীরে বাসা বেঁধেছিল দুরারোগ্য অসুখ। ভর্তি ছিলেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মধুমঙ্গল মালাকার।

এই শিল্পের হাত ধরেই মধুমঙ্গল পৌঁছে গিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে। একদিকে লন্ডন মিউজিয়াম থেকে শুরু করে ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অফ আর্ট, অন্যদিকে এডিনবরা থেকে শুরু করে সানফ্রান্সিসকো কিংবা স্কটল্যান্ড থেকে বার্সিলোনা সব জায়গাতেই সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর অসাধারণ শোলার কাজের নিদর্শন।

মধুমঙ্গল মালাকারের শোলার তৈরি মুখোশ

উত্তরাধিকার সূত্রেই শোলার কাজের প্রতি টান ছিল মধুমঙ্গলের। বাবার হাতে তাঁর শিল্পের হাতেখড়ি। বাবা তরুণীকান্ত মালাকারও ছিলেন একজন নামকরা শোলাশিল্পী। ছোটোবেলা থেকে শোলা নিয়ে কাটাকুটি করতে ভালোবাসতেন মধুমঙ্গল। নানা রকম নতুন নতুন নকশা করে তার ওপর রং তুলির টানে তৈরি করতেন বাহারি সব জিনিস। এরপর মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি পাড়ি দেন মুম্বাই শহরে। সেখানকার জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারির একটি মেলায় তাঁর হস্তশিল্পের পসরা নিয়ে হাজির হন। তারপর আর থেমে থাকতে হয়নি তাঁকে। কাজের গুণে সহজেই শিল্পমহলে পাকাপাকি আস্তানা গড়ে নেন মধুমঙ্গল মালাকার।

বাংলার ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য, শোলার মুখোশের পরম্পরাকে তিনি দিনাজপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম মুস্কিপুর থেকে পৌঁছে দিয়েছিলেন উন্মুক্ত পৃথিবীর কাছে। প্রায় সব ক’টি মহাদেশে নানান কর্মশালা ও নৃত্যানুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন তিনি। প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাংলার কারিগরদের। বাংলার শিল্পকলাকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। কাজ করেছেন মুম্বাই ফিল্ম ডিভিশনের সঙ্গেও। শুধু শোলা শিল্প নয়, সমগ্র হস্তশিল্পের পরিসরকে জোরদার করতেও আন্তরিক চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না তাঁর।

এই মুখোশই ছিল তাঁর শোলা শিল্পের সিগনেচার আর্ট। কিন্তু তার পাশাপাশি শোলা দিয়ে তাজিয়া, পীরের ঘোড়া, মনসার পট, অথাই পাথাই, দেবদেবীর শোলার সাজ, গয়না, নকশা করা টোপর কিংবা ঘর সাজানোর সরঞ্জাম ইত্যাদি সব ধরনের কাজই করতেন তিনি।

শোলার তৈরি রাবণের মুখোশ 

বঙ্গীয় পারম্পরিক সংগঠনের মুখ্য সংগঠক ছিলেন মধুমঙ্গল। বাংলার অন্যান্য পারম্পরিক শিল্পীদের নিয়ে তৈরি করেছিলেন WAPAG নামের একটি সংগঠন। শোলা শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন দুঃস্থ কারিগরদের চেনা আলোয় আনতে চেয়েছিলেন এই সংগঠনের মাধ্যমে, চেয়েছিলেন নগরের ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ঘটাতে। সারাজীবন এই শোলা শিল্পকে আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন মধুমঙ্গল মালাকার। তাঁর উদ্যোগেই ২০১৭ সাল থেকে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তিক শিল্পীদের নিয়ে কলকাতার প্রেস ক্লাবে শুরু হয় গ্রামকৃষ্টি উৎসব। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর এই উৎসবেই তাঁকে ‘জীবনকৃতী’ সম্মানে ভূষিত করা হয়।

“শুধু দিনাজপুর নয়, মালদা আর উত্তরবঙ্গের অনেক জায়গা থেকেই কাজের জন্য জেঠুর কাছে কাজের অর্ডার আসত। অনেকে আবার শুধু হাতের কাজ দেখতে ঘুরতে আসত আমাদের বাড়ি। ছবিও তুলে নিয়ে যেত।” এমনটাই জানালেন মধুমঙ্গলবাবুর ভাইপো গৌরব মালাকার। দিনাজপুরের মালাকার বাড়ির বিখ্যাত কার্তিক পুজোর কথা অনেকেই জানেন। এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ঠাকুরের শোলার সাজ। গৌরববাবু জানান, “জেঠু নিজেই সব দিক দেখতেন। আমরা সকলেই সাজ তৈরি করতাম জেঠুর সঙ্গে। আবার অন্য জায়গা থেকেও শিল্পীদের নিয়ে এসে এখানে কাজ করাতেন জেঠু।”

শোলার কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন সারাদিন

মধুমঙ্গল সারাজীবন চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন বাংলার শিল্পীরা যাতে যোগ্য সম্মান পান, যাতে তাঁদের হাতের কাজ দিকে দিকে ছড়িয়ে পরতে পারে তার জন্য। দারিদ্রের গ্লানিকে অতিক্রম করে যাতে বাংলার শিল্পের ঘরানা আলোর মুখ দেখতে পারে সেই চেষ্টায় কোনো ত্রুটি ছিল না তাঁর। তাই বাংলার প্রাচীন শিল্প জগতের সেই সদাহাস্য মানুষটির চলে যাওয়ায় শুধু যে পারম্পরিক শোলা শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল তাই নয়, এ ক্ষতি বাংলার সামগ্রিক কারিগর সম্প্রদায়েরও। তাঁর এই অকাল প্রয়াণে শোকস্তব্ধ শিল্প মহলের প্রত্যেকেই।

শোকের ঘোর কাটেনি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও। তবুও যেন গৌরববাবুর কথায় রয়েছে নতুন আশার খোঁজ, “আমাদের বংশগত পেশা এই শোলার কাজ। জেঠু ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক। এখন আমি আর ভাই মানে মধুমঙ্গল মালাকারের ছেলে, আমাদের দুজনেরই একটাই লক্ষ্য, যাতে জেঠুর কাজকে আমরা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।”

শোলা দিয়ে তৈরি অভিনব বিয়ের মণ্ডপ

হ্যাঁ, প্রকৃতই এক স্বপ্নসন্ধানী ছিলেন মধুমঙ্গল। তাঁর কাজের পরিসর খানিক হাতড়ালে আমরা আজও অনায়াসে বাংলার ফেলে আসা সংস্কৃতিকে ছুঁয়ে দেখতে পারি। আর মধুমঙ্গলবাবুর ভাইপো গৌরব এবং ছেলে বিবেকের মতো করে আশা খুঁজতে পারি নতুন একটা আগামীর। যে আগামীতে থাকবে মধুমঙ্গল মালাকারের স্বপ্নের খোঁজ আর থাকবে বাংলার হস্তশিল্পীদের মুখে লেগে থাকা চওড়া হাসির রেশ।

 

(গৌরব মালাকারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা)

Developed by DXDasia