উত্তরবঙ্গের ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর মন্দির

এঁদের কথাই উপন্যাস হিসেবে ধরা দিয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের কলমে

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ও ঐতিহ্যপূর্ণ নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হল জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের শিকারপুর চা বাগানের মধ্যে থাকা ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর মন্দির। প্যাগোডা ধাঁচের সেই মন্দিরের দেখভালের দায়িত্বে এক আদিবাসী কেয়ারটেকার। নাম ভোলা ওঁরাও। সঙ্গে পুরোহিত কমল রায়।

জলপাইগুড়ির গবেষক উমেশ শর্মা জানান, জলপাইগুড়িতে একসময় রাজা ছিলেন দর্পদেব রায়কত। সেই সময় জলপাইগুড়ি ছিল রংপুর জেলার অধীনে। রংপুরে আর একটি ষ্টেট ছিল, তার নাম মন্থনা। আর তার রানী ছিলেন বিধবা জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী। দেবী চৌধুরানীর স্বামী ছিলেন শিবচন্দ্র। ইংরেজ শাসনের আদিপর্বে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখেও দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে দর্পদেব রায়কতের সঙ্গে তিস্তাপক্ষের যুদ্ধও হয়। রংপুর জেলে এক সময় ১৮ বছর ধরে বন্দি করে রাখা হয় দর্পদেব রায়কতকে। এরপর ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় প্রজাদের ভালো রাখার জন্য ধনীদের কাছ থেকে ধনদৌলত ডাকাতি করে তা বিলি করেন তাঁরা। ১৮৮৬ সালে সেই গল্পই স্থান পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চটোপাধ্যায়ের ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসে।

 

ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় দেবী চৌধুরানী ও দর্পদেব রায়কতকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন ভবানী পাঠক, ফকির বিদ্রোহের মজনু সাহা প্রমুখ। তাঁরা সকলে মিলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রের সঙ্গে তাঁরা পেরে ওঠেননি। ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করতে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী বৈকুণ্ঠপুরের দিল্লি ভিটা, চাঁদের খাল ও শিকারপুর চা বাগানের জঙ্গলে ঘাঁটি তৈরি করেন। তারই স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে শিকারপুর চা বাগানের মধ্যে থাকা ঐতিহাসিক মন্দিরটি। কিছু ইতিহাসবিদ বলেন, শিকারপুর চা বাগানের মধ্যে থাকা মন্দিরটি রাজা দর্পদেবের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। মিঃ রেমন্ড হেলাইচ পাইন নামে এক ইংরেজ স্থপতি মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পড়ে ১৮৭১ সালে রাজা যোগেন্দ্রদেব রায়কতের আমলে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়। ভবানী পাঠক ডাকাত সর্দার হিসাবে পরিচিত থাকলেও তিনি সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করতেন। তিনি অত্যাচারী ইংরেজ ও দেশীয় জমিদারদের জিনিস লুঠপাট করে তা দীন দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। আর তাঁরই সুযোগ্য শিষ্যা ছিলেন দেবী চৌধুরানী।

 

সেই মন্দিরে প্রথমে কাঠের মূর্তিই ছিল। দুই পাশে দুটি কাঠের কালী মূর্তি। সেই কালীকে পুজো করেই নাকি ভবানী পাঠক তাঁর অভিযানে বের হতেন। পরে সেই কাঠের মূর্তি পুড়ে যাওয়ায় মাটির মূর্তি তৈরি হয়েছে। মন্দিরের পুরোহিত কমল রায় বলেন, তাঁদের এই মন্দিরে মা কালীর মূর্তি ছাড়াও তিস্তাবুড়ি, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, গঙ্গা দেবী, সিদ্ধপুরুষ মোহনলালের মূর্তি আছে। মন্দির প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় খোলে, বন্ধ হয় বিকেল পাঁচটায়। কালী পুজো হয় আষাঢ় মাস ও কার্ত্তিক অমাবস্যায়।

Developed by DXDasia