স্কুল বন্ধ, ইন্টারনেট নেই, প্রত্যন্ত গ্রামে শিক্ষার ত্রাতা হয়ে উঠেছেন ‘রাস্তার মাস্টার’

প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন দীপ নারায়ণ নায়ক

২০২০ সালের মার্চ মাসে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা হওয়ার পর আমাদের চারপাশে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে। বদল এসেছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়। দেশব্যাপী সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক সবাইকেই অভ্যস্ত হতে হয়েছে ই-শিক্ষা বা অনলাইন-ক্লাসের সঙ্গে। কিন্তু, সমীক্ষা বলছে সারা দেশে মাত্র ২৪ শতাংশ পরিবারের ইন্টারনেট অ্যাক্সেস রয়েছে। সবথেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে সরকারি স্কুলে পাঠরত শিশুদের, সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে ৪০ শতাংশের বেশি সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা লকডাউন চলাকালীন পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত উপকরণ, সুযোগসুবিধে থেকে বঞ্চিত হয়েছে।এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে, প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখে উদাহরণ তৈরি করেছেন ‘রাস্তার মাস্টার’ দীপ নারায়ণ নায়ক।

জামুড়িয়া বিধানসভার তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপ নারায়ণ নায়ক। লকডাউনের দীর্ঘ সময় পশ্চিম বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামের রাস্তার পাশেই পড়িয়েছেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের। গ্রামের বাড়ির দেওয়ালগুলো ব্ল্যাকবোর্ড এবং রাস্তাগুলো ক্লাসরুম, এভাবেই স্কুল গড়ে তুলেছেন তিনি, আর এভাবেই হয়ে উঠেছেন ‘রাস্তার মাস্টার’। অনলাইন-শিক্ষার বিকল্প এর থেকে ভালো আর কী-ই বা হতে পারে। দীর্ঘদিন বন্ধ বিদ্যালয়গুলি। ফলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের মধ্যে বাড়ছিল স্কুলছুট হওয়ার আশঙ্কা। তাই এমন অভিনব পন্থা। গ্রামের মানুষ এ ব্যাপারে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান, নিজেদের বাড়ির দেওয়াল পড়াশোনার কাজে ব্যবহার করতে দিতে সম্মত হন। স্কুল বন্ধ থাকলেও, তিলকা মাঝি আদিবাসী পাড়ায় গিয়ে গাছের তলায় বসে পড়িয়েছেন দীপবাবু। শুধুমাত্র ছোট ছোট পড়ুয়াদের নয়, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা সেভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি, তাদেরও পড়াশোনা শিখিয়েছেন তিনি।গত ৫ সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবসে রাস্তার মাস্টার নিয়েছিলেন বিশেষ কর্মসূচি। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন শিক্ষা। ‘শূন্য থেকে শুরু’ কর্মসূচির মাধ্যমে, দুয়ারে শিক্ষার আয়োজন করেছিলেন তিনি। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের মাটির বাড়ির দেয়ালগুলিতে এঁকে দেওয়া হয়েছিল বর্ণমালা, সংখ্যা। খোলা আকাশের নিচে অভিনব পন্থায় দুয়ারে শিক্ষার আয়োজন করেছিলেন তিনি। আট থেকে আশি সবাইকে শিক্ষা দিয়েছেন এই শিক্ষক।

এছাড়াও সমাজে পিছিয়ে থাকা মানুষের মনে কুসংস্কারের কালোছায়া দূর করতে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তিনি। দুয়ারে শিক্ষার পাঠশালায় নিয়ে আসা হয়েছিল মাইক্রোস্কোপ। সেখানে দেখানো হয়েছিল ম্যালেরিয়ার জীবাণু। শিক্ষা শেষে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, কুসংস্কার নয় ম্যালেরিয়া জ্বর থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে প্রয়োজন চিকিৎসকের।লকডাউনের দীর্ঘসময় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে, একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সবাই। সকলেই বলছেন, এই ধরনের শিক্ষকই সমাজকে নতুন দিশায় চালিত করতে পারবে। এই ধরনের শিক্ষকই আসল শিক্ষারত্ন। এভাবেই গ্রামের মানুষের কাছে ক্রমশ শিক্ষার ত্রাতা হয়ে উঠছেন ‘রাস্তার মাস্টার’।

Developed by DXDasia