চার দশক ধরে বন্যপ্রাণীর ছবি তুলছেন বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী
ছোটবেলায় বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের সরিয়া-য় ছুটি কাটাতে যেতেন বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী, শিশুমনে গাঢ় প্রভাব ফেলত সাঁওতালি সংস্কৃতি ও জীবনযাপন। আরও একটি ব্যাপার দেখে মুগ্ধ হতো ছেলেটি – সাঁওতালদের পশুপ্রেম। বেশ মনে আছে, একবার সঙ্গে করে দুটি বাঘের বাচ্চা নিয়ে এসেছিলেন কয়েকজন। তখন ষাটের দশক, ভারতের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনসমূহ সেভাবে চালু হয়নি।
ছোটবেলার সেই মুগ্ধতা ক্রমে পরিণত হয়েছে নেশায়, এবং পেশায়ও বটে। গত চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্যামেরা হাতে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরেছেন বিশ্বজিতবাবু, স্বীকৃতি পেয়েছেন দেশের অগ্রগণ্য ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার’ হিসেবে। তাঁর ভাণ্ডারে রয়েছে ভারতের অতি সমৃদ্ধ বন্য জগতের অমূল্য সব ছবি, এবং সব ছাপিয়ে রয়েছে বাঘের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ।
আজ আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস, প্রতি বছরই যা বিশ্ব জুড়ে পালিত হয় বাঘ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর স্বার্থে। কীভাবে বন্যপ্রাণীর বেআইনি ব্যবসা, মানুষের সঙ্গে সংঘাত, এবং বিচরণভূমি সঙ্কীর্ণতর হয়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে বাঘ, সেই সংক্রান্ত প্রচার করাই আজকের দিনটির উদ্দেশ্য। বিশ্বজিতবাবু যেমন বললেন, ইতিমধ্যেই চিরদিনের মতো বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে ক্যাসপিয়ান টাইগার, বালি টাইগার, এবং জাভা টাইগার। ভারতে ‘প্রজেক্ট টাইগার’ প্রকল্প চালু হয় ১৯৭৩ সালে, যার আগে থেকেই অপেশাদার ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় ভারতে ডোরাকাটা বাঘের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৬০ হাজার, অমন নির্বিচারে শিকার সত্ত্বেও।
সুন্দরবন
বস্তুত, যে চিতাবাঘ আমরা এখন শুধুমাত্র আফ্রিকায় দেখি, একসময় সেই চিতা দেখা যেত এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও। বড়ো বাঘ শিকারের সময় বাঘকে কোণঠাসা করতে কয়েকশো চিতাবাঘ ব্যবহার করতেন হুমায়ুন, জাহাঙ্গীর, বা শাহজাহানের মতো মুঘল সম্রাট। এশিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে চিতাবাঘ, এবং অবিরাম শিকারের ফলে ১৯৭২ সালে ভারতে বড়ো বাঘের সংখ্যাও এসে ঠেকে স্রেফ ১,৭০০-তে। “উদাহরণ স্বরূপ, ১৮২০ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসার পর স্রেফ ১০ দিনে নেপালে ৩৫টা বাঘ মেরেছিলেন রাজা চতুর্থ জর্জ” বলেন বিশ্বজিতবাবু। নানা ওঠাপড়ার পর ২০১৮ সালের গণনায় প্রকাশ পায়, ভারতে বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ২,৯৭৬, এবং যেহেতু চার বছর অন্তর গণনা হয়, তাই আশা করাই যায়, ২০২২ সালে এই সংখ্যার আরও কিছুটা উন্নতি হবে।
কাজিরাঙা
“আমি প্রথমবার ১৯৭৭ সালে যখন কানহা যাই, প্রায় কেউই জায়গাটার নামই শোনেনি,” বলছেন বিশ্বজিতবাবু। বাস্তবিক, ১৯৭৩-৭৪ সালে বান্দিপুর (কর্ণাটক), করবেট (উত্তরাখণ্ড), কানহা (মধ্যপ্রদেশ), মানস (আসাম), মেলঘাট (মহারাষ্ট্র), পালামৌ (ঝাড়খণ্ড), রনথমভোর (রাজস্থান), শিমলিপাল (উড়িষ্যা), এবং আমাদের পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন মিলিয়ে মোট ন’টি ব্যাঘ্র প্রকল্প নিয়ে পথ চলা শুরু প্রজেক্ট টাইগার-এর।
এদের মধ্যে সুন্দরবনের অভিনবত্ব এই যে, সেখানে প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে রয়েছে বড়ো নদী, যার ফলে চোরাশিকারিরা অবাধে যাতায়াত করতে পারে না। বিশ্বজিতবাবুর কথায়, “ব্রিটিশ সংরক্ষণবিদ পিটার জ্যাকসন একবার বলেছিলেন যে পৃথিবীতে কোথাও যদি বাঘ বেঁচে থাকে, তবে তা থাকবে সুন্দরবনে। কারণ এখানে বাঘ মেরে তারপর গোপনে সেটাকে নিয়ে নদীপথে পালিয়ে যাওয়ার অসুবিধে আছে।”
তবে সমস্যা তো একটা নয়। সুন্দরবনের ভৌগোলিক প্রকৃতি, এবং শিকার ধরার সমস্যা থেকেই যায়। সেখানকার স্থানীয় গাইডরা বলেন, সুন্দরবনেই একমাত্র পাওয়া যায় কাঁকড়া খেকো বাঘ। সত্যিই কি তাই? “জোয়ার নেমে যাওয়ার পর প্রচুর পরিমাণ কাদামাটি থেকে যায়, তাছাড়াও সুন্দরবনের বাঘকে শিকার ধরতে হলে কুমিরের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কেটে যেতে হবে। আমি নিজের চোখে অন্তত তিনবার দেখেছি জলের মধ্যে বিশাল কিং কোবরা। জল থেকে কোমর পর্যন্ত কাদা কাটিয়ে ডাঙায় উঠছে বাঘ, এমন ছবি তুলেছি আমি। ডাঙায় উঠেও রক্ষে নেই, লোহার রডের মতো উঁচু হয়ে আছে pneumatophores অথবা aerial roots, যাকে বাংলায় শুরো বলে,” বলেন বিশ্বজিতবাবু। 
বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী
সুন্দরবনের জঙ্গলে বাঘের প্রধান খাদ্য বলতে হরিণ এবং বুনো শুয়োর, তবে শারীরিক শক্তি প্রবল হলেও বাঘের দুর্বলতা হলো গতি বা ক্ষিপ্রতা। “হরিণ বা শুয়োর দুইই বাঘের চেয়ে জোরে দৌড়তে পারে, কাজেই শিকার করা সহজ নয়। এই পরিস্থিতিতে কাদায় আটকে থাকা কাঁকড়া বা বড়ো মাছ ধরে খেতেই পারে বাঘ, দেখবেন হয়তো তার আগে দশদিন সে না খেয়ে রয়েছে,” বলেন বিশ্বজিতবাবু।
আর মানুষ ধরে খাওয়া? সুন্দরবনের ‘মানুষখেকো বাঘ’ বলে কথা। এই তকমা একেবারেই মেনে নিতে রাজী নন বিশ্বজিতবাবু। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, সুন্দরবনের বাঘ স্বভাবত মানুষখেকো নয়। তিনি বলেন, “সহজলভ্য শিকারের একটি হলো মানুষ, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু এমন অজস্র উদাহরণ আছে যেখানে বাঘ গ্রামে ঢুকেছে বাড়ির গরু-ছাগল, মায় হাঁসমুরগি পর্যন্ত ধরতে, অথচ খোলা উঠোনে শুয়ে থাকা মানুষের দিকে তাকিয়েও দেখেনি। জিম করবেট বা কেনেথ অ্যান্ডারসনের গল্প পড়লে দেখবেন, সত্যিকারের মানুষখেকো একটিমাত্র বাঘ শয়ে শয়ে মানুষ মেরে থাকে। সুন্দরবনে এমন একটাও উদাহরণ নেই। এই মানুষখেকো কথাটা একেবারেই ভুল।”
‘প্রিন্স অফ বান্ধবগড়’
এত বছর ধরে এত বাঘের ছবি তোলার পরেও এত আগ্রহ বেঁচে থাকে কী করে? “কী প্রাণবন্ত, বুদ্ধিমান একটা জন্তু,” বিশ্বজিতবাবুর কণ্ঠে আবেগের সুর। “চোখের ভাষা এত জীবন্ত। আমার দেখা সবচেয়ে বড় বাঘগুলির একটার কথা আজও মনে আছে, অমন সজীব চোখ আমি আর দেখিনি। আমার ক্যামেরার দিকে তাকিয়েছিল, মনে হচ্ছিল এক্ষুনি কথা বলে উঠবে।”
অবশ্যই বাঘের রুদ্রমূর্তিও দেখেছেন বর্ষীয়ান এই চিত্রগ্রাহক। কানহায় তাঁর হাতির দিকে তেড়ে এসেছিল একটি বাঘ। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, এই ধরনের আক্রমণের পিছনে নির্দিষ্ট কোনও কারণ বা রাগ থাকে, মানুষ মেরে খাওয়া এখানে উদ্দেশ্য নয়। “এবছর লকডাউনের আগে সুন্দরবনে আমি একটা বাঘের ছবি তুলছিলাম, কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে যেন আমার জন্যই পোজ দিচ্ছে। অথচ আমি যে কিছুটা দূরেই আছি, সেদিকে ভ্রূক্ষেপই নেই,” হাসতে হাসতে বলেন বিশ্বজিতবাবু।
যতদিন বন্যপ্রাণী বা পাখির ছবি তুলবেন, ততদিনই বাঘেরও ছবি তুলবেন বিশ্বজিতবাবু। তিনি বলেন, “বাঘ সম্পর্কে সবকিছুই আমাকে টানে।” আজকের দিনে এই কথাগুলি বিশেষভাবে স্মরণীয় বটে।
(এই প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে চাইলে )
Biswajit Roy Chowdhury is Secretary, Nature Environment & Wildlife Society (NEWS); Member, State Wildlife Board; Senior Fellow, Ministry of Culture, Govt. of India; Member INC-IUCN; Editor, ENVIRON