
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই স্কুলের অবদান ভোলার নয়
ইতিহাস-সাক্ষী ঐতিহ্যশালী শিকারপুর গ্রাম ও শিকারপুর উচ্চ (উচ্চতর মাধ্যমিক) বিদ্যালয় একে অপরের পরিপূরক। গ্রামের জন্ম ও ইতিহাসের সঙ্গে স্কুলের জন্ম ও ইতিহাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অবিভক্ত ভারতে শিকারপুর গ্রাম ছিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর সাব ডিভিশনের অন্তর্গত। অন্যান্য জায়গার মতো শিকারপুরেরও লিখিত ও অলিখিত একটি ইতিবৃত্ত রয়েছে। লোকশ্রুতি, ঘন বনজঙ্গলে হিংস্র বন্যপ্রাণীর শিকার মিলত বলে স্থাননাম শিকারপুর। শিকারপুরের প্রাকৃতিক পরিবেশ মনোরম। এ রাজ্যে এমন চিরহরিৎ গাছগাছালি পাখপাখালির প্রাচুর্য ভরা শান্ত মেদুর শ্যাম ভূমি কম-ই আছে। সেই সঙ্গে জলবায়ুও স্বাস্থ্যপ্রদ। পদ্মার শাখা নদী মাথাভাঙা বয়ে চলেছে বাংলাদেশ আর নদিয়ার সীমানা ভাগ করে দিয়ে। ১৮১৫ সালের দিকে এই এলাকার বনজঙ্গল কেটে জনপ্রবাহের সাথে নতুন বসতি স্থাপন করে নীলকর সাহেবরা। মাথাভাঙ্গার তীরে অখ্যাত এক জনপদ কালক্রমে শিকারপুর নামে পরিচিত হয়ে উঠল।
মাথাভাঙা-জলঙ্গি-ভৈরব-গড়াই নদী অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ চর অঞ্চলের পলল মৃত্তিকা ছিল নীল চাষের উপযুক্ত। এই অঞ্চলে ১৮৩০ সাল থেকেই নীল চাষের প্রসার ঘটে। ঐতিহাসিক রানি ভবানীর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত, পরে নীল কুঠিয়ালদের মেদিনীপুর জমিদার কোম্পানির নর্দান জোনের হেডকোয়ার্টার্স ছিল শিকারপুর। ১৫২টি কুঠি শিকারপুরের অধীনে ছিল। ঊনবিংশ শতকে ভরাযৌবনা মাথাভাঙা নদী ছিল কলকাতা ও পূর্ববঙ্গের অন্যতম যোগাযোগ মাধ্যম। শিকারপুরে নীলকুঠি হেডকোয়ার্টার্স স্থাপনের কারণ হল, এখানকার প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও যোগাযোগের বাণিজ্যিক অনুকূল ব্যবস্থা। আজকের শিকারপুরের হাল হকিকত দেখে অনুমান করা একটু কঠিনই যে স্বাধীনতার আগে এর কী বৈভব ছিল। ছিল একটা সমৃদ্ধ জনপদ। নীলকুঠির বিশাল সৌধের কণামাত্র স্মৃতির ভার বহন করছে শতবর্ষ অতিক্রান্ত ঐতিহ্যমণ্ডিত বিদ্যালয়ের শালপ্রাংশু পুরোনো দরজা জানলাগুলো। সাহেব কুঠিয়ালদের ছিল ঘোড়ার আস্তাবল, মোটরলঞ্চ, স্পিড বোট, মোটর গাড়ি, পাইক বরকন্দাজ, লেঠেল, মহুরি, গোমস্তা , টাইপিস্ট, আমিন, মোক্তার, নায়েব, ম্যানেজার। বিশাল সুইমিং পুল, বোটিং লেক, বিস্তৃত সুসজ্জিত বাগান, রাসায়নিক পদ্ধতিতে বিজলিবাতি, পাউরুটি কারখানা, প্রশস্ত লন, আইভি লতা দিয়ে সজ্জিত প্রাসাদোপম কুঠি আর চাবুক। এগুলোর মধ্যে অবশিষ্ট আছে সুন্দর সুশ্রাব্য চার্চবেল-সহ প্রোটেস্টান্ট চার্চটি। আর সাগর পাড়ি দিয়ে আসা সাহেবদের সঙ্গী কিছু অমূল্য বই যা বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারকে দান করে তাঁরা শোষণের পাশাপাশি পোষণ-মনস্কতার অভিজ্ঞান রেখে গেছেন।
স্কুল ভবন
নীল বিদ্রোহের শরিক ছিল এ অঞ্চল। বিপ্লবী বাঘা যতীনের নেতৃত্বে নদিয়া জেলার প্রথম স্বদেশী ডাকাতি শিকারপুর গ্রামে সংঘটিত হয়। ১৯২২ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রেরিত ব্রহ্মচারী সোমেশ্বর চৌধুরীর নেতৃত্বে নীলচাষের কফিনে শেষ পেরেকটি শিকারপুরে গাঁথা হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠন এখানে করে গিয়েছেন। স্বাধীনতা যজ্ঞের স্বদেশী আন্দোলনকারী কয়েকজন প্রকৃত দেশসেবক এই গ্রামের সন্তান এবং বিদ্যালয়ের ছাত্র। যেমন – হরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, সুখময় চৌধুরী, জগন্নাথ তলাপাত্র, সুধাংশু বাগচী, মৌলবী আবুল সামাদ, নইমুদ্দিন ইত্যাদি। এঁরা তাম্রপত্র বর্জনের দিকের ব্যক্তিত্ব।
পুরানো নথিপত্র থেকে জানা যায়, এই বিদ্যালয় প্রথমে মাটির বাড়িতে গড়ে ওঠে ১৮৭৬ সালেরও আগে মাথাভাঙা নদীর অপর পারে, বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার প্রান্তীয় গ্রামে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে তৎকালীন শিকারপুরের নীল কুঠিয়াল এম এম ক্রফোর্ড এক ঝাঁক স্থানীয় কৃতী বিদ্যোৎসাহী, সুধাময় সান্যাল, বিজয়কৃষ্ণ বিশ্বাস, সরিয়াতুল্লা বিশ্বাস, গৌরীকান্ত বাগচী, চন্দ্রময় সান্যাল, লক্ষ্মীপতি চৌধুরী ও জনসাধারণের মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষায় অনগ্রসর এই বিস্তৃত অঞ্চলের অধিবাসীগণের মধ্যে প্রবেশিকা স্তরের শিক্ষা প্রসারের জন্যে একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। যতদিন কুঠিয়ালরা শিকারপুরে ছিলেন অর্থাৎ স্বাধীনপূর্ব ভারতে, তাঁরাই বিদ্যালয়ের সভাপতি হতেন। বিদ্যালয়ের প্রথম সভাপতি ছিলেন নীল কুঠিয়াল সাহেব এম এম ক্রোফর্ড। আনুমানিক ১৮৭৬ সাল বিদ্যালয়ের স্থাপনকাল। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু শ্রীসতীশচন্দ্র সেন। শিকারপুর এইচ. ই. বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষকের নাম বাবু জাহ্নবীচরণ ভৌমিক। তখন বিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা ছিল ৭০-৭৫। বিদ্যালয়ের তখনও নিজস্ব গৃহ ছিল না। বিদ্যালয় চলত একটি বড়ো বাংলো ধরনের ঘরে। ১৯০১ সালের শেষাংশ থেকে ১৯০৫ সালের প্রথমাংশ অবধি জাহ্নবীচরণ ভৌমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর আমলে বিদ্যালয়ের নিজস্ব গৃহের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হয় এবং অর্ধেক কাজ হওয়ার সময়ই তিনি অন্যত্র উচ্চপদে চলে যান।
বিদ্যালয়ের একটি অংশ
বিদ্যালয় নিজস্ব গৃহের কাজ সম্পন্ন হয় পরবর্তী প্রধান শিক্ষক বাবু শ্রীসুরেন্দ্রমোহন মৈত্র মহাশয়ের আমলে। স্বাধীনতাপূর্ব আমলে তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রাণপুরুষ। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৩৯ দীর্ঘ ৩৪ বছরে তাঁর আমলে এই বিদ্যালয়ের পড়াশোনা, শাসন, অনুশাসন, শৃঙ্খলা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক – সর্বক্ষেত্রে এক অসামান্য অগ্রগতি লাভ করেছিল। বিদ্যালয়ের নিজস্ব গৃহ-সমস্যা ১৯০৭ সালের মধ্যেই অনেকাংশে সমাধান হয়। মেদিনীপুর জমিদার কোম্পানি বিদ্যালয়কে সাত একরের বেশি জমি দান করে। সেই জমিতে বিদ্যালয় নিজস্ব ভবন গড়ে ওঠে। বিদ্যালয় ভবনের বাদবাকি অংশ সবই স্বাধীনতার পর নির্মিত। প্রথম দিকে দুটি হোস্টেল ছিল, একটি হিন্দু ছাত্রদের, অন্যটি মুসলমান ছাত্রদের জন্য। পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর মেয়েদের জন্য একটি হোস্টেল হয়েছিল। ৩ জানুয়ারি ১৯৩৯, প্রধান শিক্ষক হয়ে আসলেন বাবু সত্যচরণ বাগচী। তিনি ১৯৪৫ সালে প্রধান শিক্ষক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তারপর প্রধান শিক্ষক হলেন কলকাতা থেকে আগত বাবু অবনী মোহন সরকার। ১৯৪৭ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করেন।
স্কুল চত্বর
স্বাধীনতার আগে গ্রামে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ছিল অটুট। সেই সুসম্পর্ক এখনও বিদ্যমান। শিকারপুরে সাম্প্রদায়িক গোলযোগ প্রথম দেখা দেয় দেশ বিভাগের পর। স্কুলে দু’দিন পাকিস্তানের পতাকাও শোভা পায়। উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। নদিয়া জেলা তিন দিন পর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। স্কুলে আবার ভারতীয় জাতীয় পতাকা তোলা হয়। স্বাধীনত্তোর পর্বের পর কয়েক মাস বোমফিল্ড সাহেব স্কুলের সভাপতি ছিলেন। সেই সময় স্কুলে এক মজার ঘটনা ঘটেছিল। স্বাধীনতার খুশির স্বাদ চেটেপুটে আস্বাদন করার জন্য স্কুলের শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মীরা সাহেব সভাপতির কাছে এক দিনের বেতন ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স বোনাস’ হিসাবে আবদার করেন। সাহেব তাঁদের আবেদন মঞ্জুর করেন।
স্বাধীনতার ঠিক পরবর্তী অধ্যায়ে বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শিক্ষানুরাগী বিভূতিভূষণ চট্টোপাধ্যায় বিদ্যালয়ের সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ২০ আগস্ট ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট অবধি বাবু মনোরঞ্জন সরকার প্রধান শিক্ষক ছিলেন । তাঁর বাড়ি ছিল অধুনা বাংলাদেশের তোকলা গ্রামে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির অব্যবহিত পরেই তাঁর কর্মকাল। উদ্বাস্তু ছাত্রদের সাহায্যদান; বিভিন্ন সরকারি গ্রান্ট নিয়ে তদ্বির তদারক করতেই তাঁর সময় কেটে গেছে। সদ্য দেশভাগের পর মুসলমান ছাত্ররা বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মুসলিম ছাত্রাবাস ফাঁকা হয়ে যায়। ছাত্রসংখ্যা দ্রুত কমছে। দেশ বিভাগের কালো ছায়া বিদ্যালয়েও থাবা বসিয়েছে। মনোরঞ্জনবাবু হতাশ হয়ে বাঁকুড়ার খাতরা হাই স্কুলে বদলি হয়ে যান। উদ্বাস্তু সমস্যায় আক্রান্ত বিদ্যালয়ের এরকম চরম দুর্দিনে ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট শ্রদ্ধেয় অসীমানন্দ মজুমদার প্রধান কাণ্ডারী হিসাবে শক্ত হাতে হাল ধরেন। ছাত্রসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার ফলে তাঁর অনুপ্রেরণায় শিক্ষকরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহিত করে বিদ্যালয়কে পুনর্জীবন দান করেন। বিদ্যালয় পুনরায় উন্নয়নের পথে দৃঢ় পদে এগিয়ে চলে। অনুমোদন প্রাপ্ত সহশিক্ষা প্রথা প্রবর্তনে জেলায় শিকারপুর উচ্চ বিদ্যালয় পথিকৃত বলে গণ্য হয়। তাঁর সময়কাল একদিকে সংঘাতের ইতিহাস, অন্যদিকে গঠনের ইতিহাস। সংঘাত বলতে উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের সাথে শিকারপুর গ্রাম বা শিকারপুর বিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য সংঘাত। শিকারপুর অঞ্চলের উন্নতির স্বার্থে বিডিও অফিসের জন্য স্কুলের জমি দান। বর্তমান শিকারপুর বাজারের জমিও স্কুলের দান। আবার ওই বিডিও অফিস যখন শিকারপুর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্ত শুরু হল, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে গণ আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। অনড় আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত চক্রান্ত ভেস্তে যায়। এখনো বিডিও এবং তার অনুসারী অফিসসমূহ শিকারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দান করা জমিতেই বিরাজমান। শুধু তাই নয়, শিকারপুরে বিদ্যুতায়ন, নিরাপত্তার গাফিলতিতে স্থানীয় বিএসএফ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তিনিই সংগঠিত করেছিলেন। এ বিষয়ে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় তাঁর লেখা আজও ইতিহাস। তাঁর আমলেই বিদ্যালয়ে ১৯৫৯ সালে রামকৃষ্ণ নাট্য মঞ্চটি তৈরি হয়। তৎকালীন যুগে নারীশিক্ষায় অগ্রণী ছিল এই স্কুল। পাঁচের দশকে প্রথম দিকে বিদ্যালয়ে মেয়েদের হোস্টেল ছিল। এ এক অনন্য নজির। তাঁর আমলে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস এই স্কুলে দু’বছর পড়াশোনা করেন। স্বর্গীয় অসীমানন্দ মজুমদার শিকারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের কিংবদন্তী, এক মিথ।
বিদ্যালয়ের প্রথম সভাপতি এম এম ক্রোফোডের হস্তাক্ষর ও সই
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিকারপুর গ্রাম ও বিদ্যালয়ের ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম । পশ্চিম পাকিস্তানের শক্তিশালী ‘বালুচ রেজিমেন্ট’, আক্রমণ করার জন্য শিকারপুরের দক্ষিণদিকে অবস্থান নেয়। সেই সময় শিকারপুরে ভারতীয় বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। এরই মধ্যে মাথাভাঙা নদীতে রাত্রিবেলা এক স্থানীয় জেলে নৌকা করে মাছ ধরছিলেন। তিনি ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনীকে এই বিপদের বার্তা পৌঁছে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষা বাহিনী পাকিস্তানের বালুচ রেজিমেন্টকে চারপাশে ঘিরে ফেলে। দু’পক্ষের প্রচুর গোলাগুলি চলে। ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে স্কুল মাঠ থেকে ভারতীয় বাহিনী আক্রমণ জোরদার করে। বালুচ বাহিনী পরাস্ত হয়। প্রচুর মৃতদেহ বিদ্যালয়ের মাঠে কবর দেওয়া হয়। গ্রামের প্রবীণ নাগরিকরা গল্প করেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ জয়লাভের প্রাক মূহুর্তে বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী রাতের অন্ধকারে বিশালাকার প্রজ্জ্বলিত গ্যাস বেলুন মাথাভাঙা নদীর ওপারে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার রাতের আকাশে খুব চতুরতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে উড়িয়ে দেয়। শত্রুপক্ষ পাক বাহিনী ভেবেছিল বেলুন এক গুপ্ত স্যাটেলাইট। পাকবাহিনী ভয়ে পালিয়ে যায়। ৭১-এর যুদ্ধোত্তর কালে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভাই এডওয়ার্ড কেনেডি শিকারপুর স্কুলে রিফিউজি ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন।
২১ বছর বিদ্যালয়কে সেবা করার পর শ্রদ্ধেয় অসীমবাবু তেহট্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে চলে গেলে অর্ধেন্দুভূষণ কুণ্ডু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের গুরুদায়িত্ব যোগ্যতার সঙ্গে সামলান। বিদ্যালয় ১৯৭৬-এ উচ্চতর মাধ্যমিক রূপে অনুমোদন পায়। তখন থেকেই কলা, বাণিজ্য, বিজ্ঞান বিভাগ বহাল। তাঁর সময়ে সাতের দশকের শেষের দিকে তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বিদ্যালয়ের বিশালাকার গীতাঞ্জলি ভবনটি উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলান গোপাল নন্দী। তারপর দীর্ঘ ১৭ বছর নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে প্রধান শিক্ষকের পদটি অলঙ্কৃত করেন শ্রীঅধীর রঞ্জন মিত্র। তাঁর আমলেই ২০০০ সালে খুব আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে বিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে তরুণ তুর্কি অরুণ প্রামাণিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার
সুদীর্ঘকাল ধরে এই প্রতিষ্ঠান অগণিত কৃতী নাগরিক উপহার দিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতেও দেবে। শিকারপুরের মাটিতে ছড়িয়ে আছে যেমন নীলচাষের বিষণ্ণ স্মৃতি, তেমনি মুক্তিকামী মানবের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের রূপকথা। ধর্মাবেত্তা ও মহান সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর জন্মভিটা, ফকির কালাচাঁদের আখড়া, পুরোনো মসজিদ ও ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের প্রোটেস্টান্ট চার্চ এখনো সজীব। জাতীয় সংহতির ক্ষুদ্র সংস্করণের ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিকারপুর গ্রাম। অন্যদিকে আত্মচেতনার পাশাপাশি আত্মোন্মেষণারও উৎসমুখ এই বিদ্যালয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, নাট্যচর্চা, খেলাধূলার জগতে এই বিদ্যামন্দিরের বিজয়-বৈজয়ন্তী আরো আরো উঁচুতে উঠে এক দিগচিহ্ন হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে আলো দেবে। এ অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের জোরালো দাবি, ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সুপ্রাচীন ঐতিহ্যশালী শিকারপুর উচ্চ উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ‘হেরিটেজ স্কুল’ হিসাবে ঘোষণা করা হোক ।
ঋণ স্বীকার – প্রণব আচার্য, কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়, দিবাকর ভৌমিক, সনৎ রায়।
ছবি – দীপক সাহা
