দোগাছির চারশো বছরের পুরনো এই মন্দির ধর্মীয় সম্প্রীতির এক ‘পবিত্র’ নিদর্শন

মূল মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন নাটোরের রানি ভবানী

ভারতবর্ষের সভ্যতা, শিক্ষা সংস্কৃতির সূতিকাগার হল গ্রাম। নগরায়নের হুমকিতে আমাদের দেশে দ্রুত গ্রামীন জনপদ হতে থাকল রিক্ত। গ্রামের মানুষ পুষ্ট করতে থাকল নগরকে। মানুষ গ্রাম ছাড়লেও থেকে গেল গ্রামীণ সদর্থক সংস্কৃতি। যে কোন সম্প্রদায়ের প্রাচীন ধর্মীয় সংস্কৃতির আধারগুলির সাথে মিশে আছে লোক পরম্পরায় কিছু উপকথা, কথা, কাহিনি ও গাথা। এই লোকগাথাগুলি জনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলি যুগ যুগ ধরে সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।              

নদিয়া জেলার করিমপুর-২ ব্লকের থানারপাড়া থানার অধীন ঐতিহ্যসমৃদ্ধ দোগাছি গ্রামে এক সময় অভিজাত ও সম্পন্ন মানুষের বসবাস ছিল। আকবর বাদশার সুবা বাংলার সরকার মামুদাবাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল দেকারী তথা বর্তমানের দোগাছি গ্রাম। দীর্ঘদিন ধরে গোটা অঞ্চল সমস্ত ধর্মের মানুষ একসঙ্গে পুজো, মেলা, নামাজ পারস্পরিক মেলবন্ধনে ধর্মের সার্থকতা সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ মেল বন্ধনের সাক্ষ্য রয়েছে অতীত ও বর্তমানের অসংখ্য বহে চলা ঘটনা পরম্পরায়। গোটা দেশে করোনা  অস্থিরতার আবহে এক দুপুরে করিমপুর থেকে ১০ কিমি দূরে পৌঁছে গেলাম মিশ্র জনপদসমৃদ্ধ দোগাছি গ্রামের চারশো বছর অতিক্রান্ত মহিমান্বিত শ্রী শ্রী রাজবল্লভী মন্দির প্রাঙ্গণে। মন্দিরে তখন স্থায়ী পুরোহিত, নন্দ বাগচী একান্তমনে নিষ্ঠাসহ পুজার্চনায় ব্যস্ত। মন্দির ট্রাস্টিবোর্ডের অন্যতম সদস্য বুদ্ধদেব বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় জানতে পারলাম মন্দির সংক্রান্ত নানা জানা অজানা কথা ও কাহিনি। 

কয়েকশো বছর ধরে হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের সুস্থ সহাবস্থানের উদাহরণ দোগাছি গ্রামের আভিজাত্যের জৌলুষ কমলেও মন্দিরের মহিমায় ভাটা পড়ে নি। জনশ্রতি, সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি রাজবল্লভী নামে জনৈক জেলের জালে দোগাছির বিল থেকে ওঠে  পাথরের তৈরি এক দশভুজা মূর্তি। পরে জালে ওঠে বিষ্ণুমূর্তি। খবর যায় এই অঞ্চলের জমিদার নাটোরের রানি ভবানীর ( ১৭১৪-১৮৯৩ খ্রিঃ) কাছে। তিনি গ্রামে পোড়ামাটির কারুকার্য করা সুন্দর দোচালা মন্দির তৈরি করে মূর্তি দুটি প্রতিষ্ঠা করেন। নিত্য সেবার জন্য দেবোত্তর সম্পত্তির ব্যবস্থা করেন। রাজবল্লভ নামে জনৈক জেলে দুর্গামূর্তিটি বিল থেকে উদ্ধার করেন, তাই দুর্গা মায়ের নাম হয়েছে রাজবল্লভী। 
 
বাংলা ১৩০৪ সনে ভূমিকম্পে মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে যায়। মূল মন্দির ধ্বংস হওয়ার পরে, পুরাতন মন্দিরের ভিত্তিভূমির উপর এলাকার নানা সম্প্রদায়ের  মানুষের সাহায্যে বর্তমানে একটি পঞ্চরত্ন মন্দির তৈরি হয়েছে। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত তিনফুট লম্বা ও দেড় ফুট দশভুজা মূর্তিটি দুষ্প্রাপ্য কালো কষ্টিপাথরের। দশভুজার দশটি হাতে অস্ত্র সজ্জিত। মাথায় মুকুট, বিভিন্ন অঙ্গ অলঙ্কারে সজ্জিত। মহিষাসুর, সিংহ ও মহিষ রয়েছে। দুপাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী। এই মূর্তিগুলির নিচে গণেশ ও কার্তিক। সিংহটি ঘোড়ার মতো। 

মন্দিরের সম্মুখভাগ

পদ্মের উপর দণ্ডায়মান ত্রিবিক্রম বিষ্ণু মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় আড়াই ফুট, চওড়া প্রায় এক ফুট।  উপরের ডান হাতে দণ্ড বাম হাতে চক্র এবং নিচের ডান হাতে পদ্ম বাম হাতে শঙ্খ। দ্বিভঙ্গ ভঙ্গিতে ডান পাশে লক্ষ্মী আর বাম পাশে সরস্বতী। তাঁদের পাশে চক্র পুরুষ ও শঙ্খ পুরুষ। উপরের দিকে চালির দু’পাশে বিদ্যাধর বিদ্যাধরী উড়ন্ত অবস্থায় মালা হাতে। চালির শীর্ষবিন্দুতে কীর্তিমুখ। বিষ্ণুর মাথায় কিরীট মুকুট, কানে কর্ণকুণ্ডল, গলায় রত্নাহার, উপবীত, হাঁটু পর্যন্ত বনমালা, কোমরে কোমরবন্ধ, ধুতি পরিহিত, তা হাঁটু পর্যন্ত। হাতে বাজুবন্ধ। নিচের দুটি হাত ফোটা পদ্মের উপর, পাদপদ্মের নীচে রত্নপাত্র, জোড় হাতে গরুড় নমস্কার মুদ্রায় মালা হাতে দুজন ভক্ত। চালির নিচের দিকে দুপাশে বিভিন্ন দেবদেবীর ছোটো আকারের মূর্তি। 

এছাড়াও মন্দিরে আছে একফুট গৌরীপট্ট সহ শিবলিঙ্গ, অনেকগুলি শালগ্রাম শিলা, পিতলের ছোট বালগোপাল। আর আছে এক খণ্ড গোলাকার পাথর, যাকে বলা হয় বালেশ্বর। এছাড়াও  আছে মাঝারি একখণ্ড পাথর, যাকে বিজয়া বলা হয়। পূজারির কথায় জয়াও ছিল, চুরি হয়ে গিয়েছে। 

১৯৯১ সালের ২ সেপ্টেম্বর এক দুর্যোগপূর্ণ ঝড়বৃষ্টির রাতে দুর্গামূর্তিটি চুরি যায়। মূর্তি উদ্ধারে এলাকার বাসিন্দারা  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তৎপর হয়ে ওঠেন। সেই সময় বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। তাই  বাংলাদেশে মূর্তিটি যাতে পাচার না হয়ে যায় তারজন্য দিল্লির মন্ত্রীমহলে ও রাষ্ট্রপতিকে জানানো হয়। বেশ কয়েকদিন পর গ্রামবাসী ও প্রশাসনিক তৎপরতায় গ্রামের প্রান্তে এক বাঁশঝাড়ের মধ্যে থেকে মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়। লোকশ্রুতি, ডাকাতের দল কোনো এক অলৌকিক কারণে  উপায়ান্তর না দেখে মূর্তিটি ফেলে পালিয়ে যায়।    

মন্দিরের অভ্যন্তর         

প্রায় ২০০ বছর আগে এক সদানন্দ সাধু এই মন্দির আঙিনায় এক পবিত্র কুয়ো খনন করেন। এখনও মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ তুচ্ছ করে এই কুয়োর পবিত্র জল ভক্তিভরে গ্রহণ করেন। বংশানুক্রমিকভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরের সেবা করে। এই পুজো তান্ত্রিক মতে হয়। নিত্যসেবা ছাড়াও শারদীয়ায় বাৎসরিক পুজো হয়। শ্রীপঞ্চমীতেও মেলা বসে। বৈশাখ মাসের প্রতি মঙ্গলবারে বিশেষ পুজো হয়। শেষ মঙ্গলবারে মেলা বসে, চৈত্র মাসে গাজনের মেলায় বানফোঁড়া সহ গ্রামের মানুষ সন্ন্যাসী হন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, রাজবল্লভী খুবই জাগ্রত।        

নদিয়ার গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে আছে কৃষ্টিসমৃদ্ধ  অসংখ্য ধর্মীয় নিদর্শন। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এই সব মন্দির, মসজিদ, গির্জা একদিকে যেমন আমাদের সম্প্রীতির ইতিহাসকে তুলে ধরে অন্যদিকে তেমনি মানুষের জীবন, বিশ্বাস, ধর্ম-সংস্কৃতি ও আচার বিচারের পরিচয় বহন করে। অতীত ঐতিহ্যকে বারবার তুলে ধরা হয় উৎসব, অনুষ্ঠান, মেলা, পুজো এসবের মধ্যে দিয়ে। এইসব পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনকে ঘিরে যে লোকগল্প, জনশ্রুতি চালু আছে হয়তো একদিন আধুনিক যন্ত্র সভ্যতার দাপটে হারিয়ে যাবে। দরকার নিদর্শনগুলিকে সংরক্ষণ করা, লোকগল্প ও জনশ্রুতিকে লিখিত আকারে প্রকাশ করা এবং নিজের সংস্কৃতি সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অবহিত করা।এ মহান মানবিক দায়িত্ব আমার আপনার সকলের। ভারতের বর্তমান সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই সমস্ত ঐতিহ্যপূর্ণ ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শনগুলিকে মানবতার আঙ্গিকে সকলের সামনে নতুন করে তুলে ধরার সময় এসেছে।

ঋণস্বীকার – প্রণব আচার্য, মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল

Developed by DXDasia