
মানবসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই চার্চ ও মিশন
“চাও, দেওয়া যাইবে; অন্বেষণ কর, পাইবে; দ্বারে আঘাত করো, খুলিয়া দেওয়া যাইবে।” ( মথি ৭:৭)
এই মন্ত্রের উপর ভিত্তি করে নদিয়ার শিকারপুর চার্চ ও মিশনের জন্ম হয়।
১৮৭০ দশকের শেষের কথা। তখন অবিভক্ত বাংলার নদিয়ার শিকারপুরের চতুর্দিকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল মেদিনীপুরের নীলকর সাহেবদের জমিদারির, ১৫২টা তালুকের সদর কার্যালয় ছিল। শিকারপুর সদরে সাহেবরা সপরিবারে বসবাস করতেন। কিন্তু কোনো খ্রিস্টান পালকীয় পরিচর্যার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। নিকটবর্তী অঞ্চলেও কোন মিশনকেন্দ্র ছিল না। ঈশ্বরের প্রার্থনা ও পরিচর্যার জন্য বহু দূর থেকে পুরোহিত ভাড়া করে আনতে হতো। সেই সময় করিমপুর হয়ে কৃষ্ণনগর-শিকারপুর যাতায়াতের সড়ক যোগাযোগ ভালো ছিল না। পুরোহিত আনতে হলে ভেড়ামারা রেলস্টেশন (এখন বাংলাদেশ) হয়ে রেলপথে যাতায়াত ছাড়া উপায় ছিল না। অসুখ-বিসুখে, বিপদ-আপদে পালকীয় পরিচর্যা প্রাপ্তি অসম্ভব ছিল। এই সকল অসুবিধার জন্য শিকারপুর নীলকর সাহেবেরা ইংল্যান্ডের বন্ধু মহলে একটা লিখিত প্রার্থনা জানালেন, শিকারপুরে একটি মিশন কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য। চিঠি পেয়ে, কয়েকজন ইংরেজ বন্ধু মিলে, একটা ঘরোয়া মিটিং করেন। নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, শিকারপুর অথবা নিকটবর্তী অঞ্চলে পালকীয় পরিচর্যা কাজের জন্য একটি মিশন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এই প্রকার প্রকল্প চালাতে সরকার থেকে হুকুম পাওয়া সম্ভব হবে না। তাই বন্ধুরা লন্ডনে, চার্চ মিশনারি সোসাইটির দ্বারস্থ হলেন। বন্ধুদের মধ্যে একজন, রবার্ট ডাডলে স্মিথ ( ১৮৩০- ১৮৯৭) তাঁর সম্পত্তি প্রস্তাবিত মিশন কেন্দ্রে, উপাসনাগৃহ ও মিশনকেন্দ্রের সংস্থাপনার্থে লিখে দিলেন। নীলকর সাহেবদের সহযোগিতায় এক নিস্তব্ধ, শান্ত পরিবেশে ৬৬ ( ছেষট্টি) বিঘা জমি ক্রয় করে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে মিশনকেন্দ্র সংস্থাপন শুরু হল। উপযুক্ত ও শান্ত পরিবেশ দেখে নামকরণ করা হল – শান্তিরাজপুর।
তৈরি হল একটা প্রাইমারি স্কুল, একটা ডিসপেন্সারি, একটা মিশনারি বাংলো, কয়েকটি কর্মচারী কোয়ার্টার ও ঘোড়ার গাড়ির আস্তাবল। কবর স্থানের জন্য নির্দিষ্ট হল প্রস্তাবিত গির্জাঘরের উত্তর-পূর্ব কোণে সাড়ে বারো কাঠার একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, বর্তমান ঘণ্টাঘরের সংলগ্ন। পরবর্তীকালে এই কবরস্থান পশ্চিমদিকে বিস্তৃত করা হয়। সেই সময় পাকা গির্জাঘর হয়নি – অস্থায়ী ঘরে উপাসনা চলত।
১৮৮৬ সালে প্রথম মিশনারি হয়ে এলেন, রেভাঃ সি এইচ গিল (Rev. C.H.Gill)। তিনি আসার পর, পাকা গির্জাঘর তৈরি আরম্ভ হয়। ১৮৮৮ সালে ‘সুসমাচার প্রচার দল’ নামে তিন জনের একটা ছোটো দল, এস ডব্লিউ ডন ( S.W.Donn), পার্সি হার্টচার্ড সল (Percy Hartchard Shaul) ও আর্থার লিফিউভার (Arthaur Lefeuvre) মিশন কেন্দ্রকে আস্তানা করে, রেভাঃ গিলের ছত্রছায়ায় ঘুরে ঘুরে প্রচার আরম্ভ করেন। তাঁদের তিনজনের কেউই পুরোহিত ছিলেন না —স্থানীয় লোকদের নিয়েই প্রচার অভিযান চালাতেন। রেল ও নদীপথের যোগাযোগের সুবিধা থাকায়, শিকারপুরকে উত্তর নদিয়ার প্রচার কেন্দ্র হিসাবে উন্নত করার চিন্তা নেওয়া হয়।
১৮৯০ সালে ৭ ই ডিসেম্বর, ২য় রবিবারে উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে, কলকাতার লর্ড বিশপ এডওয়ার্ড (Edward, Calcutta) গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই দিনের অনুধ্যান ছিল ‘খ্রিস্টের পক্ষে সাক্ষ্য’। ঐ দিন তিনবার উপাসনা হয়। ১টি ইংরেজি ও ২টি বাংলায়। উপাসকদের উপস্থিতিতে গির্জাঘর উপচে পড়ে। বাংলা উপাসনা পরিচালনার জন্য বল্লভপুর (এখন বাংলাদেশ) থেকে রেভাঃ কৈলাস চন্দ্র দে আসেন। গির্জার দান সংগ্রহ হয় ৬৭ টাকা ১০ আনা, তা সবটাই ডিস্পেন্সারির জন্য দেওয়া হয়। উপাসনা মন্দিরের নামকরণ করা হয় – ‘ক্রাইস্ট চার্চ’। ১৮৯৯ সালে যোগদান করেন রেভাঃ লকেট এবং রেভাঃ আর বি মেরিয়ট। প্রথম মিশনারি পুরোহিত রেভাঃ সি এইচ গিল গির্জাঘর প্রতিষ্ঠার পূর্বেই ত্রিবাঙ্কুরের বিশপ হয়ে দক্ষিণ ভারতে চলে যান।
কলকাতার লর্ড বিশপ এডওয়ার্ড এই গির্জা প্রতিষ্ঠা করেন
আধা গথিক স্থাপত্যে তৈরি এই উপাসনা গৃহ ইংল্যান্ডের এক গ্রাম্য উপাসনা গৃহের অবিকল প্রতিচ্ছবি। এই প্রত্যন্ত উপাসনালয় দেখে বহিরাগতরা ভূয়সী প্রশংসা করেন। সর্বাপেক্ষা দর্শনীয় এর বেদীর অর্থবহ রঙিন তিনটি জানালা। উপভোগ্য এবং শ্রুতিমধুর এর ঘণ্টাসমষ্টির ধ্বনি। প্রতিটি রঙিন জানালাতে একটি করে বাইবেলের পদ উল্লেখ করা আছে। ঘণ্টাঘরে বসানো আছে অপূর্ব ঘন্টাগুলি। পরপর বসানো পাঁচটি ধাতব নাদের সমষ্টিতে এই ঘণ্টা তৈরি। এর স্বরশৈলি — সা-রে-গা-মা-পা। ছোটো ছোটো গান বাজানো যায়। এখন এর আওয়াজ কমে গেছে, কিন্তু নতুন অবস্থায় এর সুমধুর স্বর মাঠের পর মাঠ পার হয়ে বহু দূরের মানুষকে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে আসার আহ্বান জানাত। শোনা যায় বিলাতের পাওয়েল কোম্পানি (Powel Company) মোট সাতটি ঘণ্টা পাঠিয়েছিল ; কিন্তু দুটি ঘণ্টা বহু দেরিতে পৌঁছায়। আগেই পাঁচটি ঘণ্টা বসিয়ে দেওয়া হয়। শেষে আসা দুটি ঘণ্টা বল্লভপুরে (এখন বাংলাদেশ) পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
শিকারপুর মণ্ডলী শৈশব থেকে কৈশোরে, কৈশোর থেকে যৌবনে প্রবেশ করার সাথে সাথে, তার কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রাইমারি স্কুল ছাত্র-ছাত্রীতে প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। ডিস্পেনসারির মাধ্যমে শত শত রোগার্তরা জীবনকাঠির পরশ পায়, আর পরিশ্রান্ত ভারাক্রান্ত লোকেরা অনন্ত জীবনের পথের সন্ধান পায়। কয়েক বছর পরে স্থাপন করা হয় বাংলা ডিভিনিটি স্কুল। জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় রেভাঃ জোনাথন মণ্ডল একসময় এই ডিভিনিটি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। শাশ্বত জীবনের বার্তা দূর গ্রামান্তরে পৌঁছে দেবার জন্য শুরু হল প্রচার ‘ক্যাম্প’। প্রতিবছর নভেম্বর মাসে গির্জাতে উপাসনাসহ প্রচার অভিযানের সূত্রপাত হত। এর পর ‘খ্রিস্ট সেনাদল’ তাঁবু নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ অভিযান চালিয়ে রবিবারের পূর্বে ফিরতেন। সঙ্গে থাকতেন মিশনারি সাহেব ও আধুনিক ওষুধের বাক্স। প্রচারের সাথে সাথে অসুস্থ ব্যক্তিদের গাড়ি করে শিকারপুরে নিয়ে আসা হত।
আধা গথিক স্থাপত্য
দেশি-বিদেশি নানা শ্রেণির বিশিষ্ট অতিথিদের স্নেহধন্য এই শান্তিরাজপুরে সাংস্কৃতিক ও আত্মিক পরিবর্তন আসতে থাকে। সেকালে এখানে বাঘ, বুনোশুয়োর ও নদীর চরে শীতের পাখি শিকার করতে বহু শিকারি দূর দূরান্ত থেকে এসে স্বল্পকালীন অতিথি হতেন। এই অঞ্চল ছিল শিকারিদের তীর্থক্ষেত্র, তাই জায়গার নাম — শিকারপুর। তখন উত্তর নদিয়ার এই মিশন কেন্দ্র শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন, এর কর্মব্যঞ্জনা তৎকালীন খ্রিস্টীয় সমাজের নামিদামি ব্যক্তিদের হাতছানি দিয়ে আহ্বান করত। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশপ, পুরোহিত ও মিশনারিগণ। তাছাড়া “দেখ প্রেমের মহাসাগর” ও “বাইবেল ভালোবাসি”-এর গীতিকার পেঙ্গুওয়ার্ন জোন্স, তৎকালীন কলকাতার সেন্ট পলস্ স্কুলের প্রিন্সিপাল রেভাঃ সি বি ক্লার্ক, তৎকালীন কলকাতা বাইবেল সোসাইটির সেক্রেটারি ক্রেডেন এনমান্ডস, সি এম এস বঙ্গীয় শাখার বিখ্যাত পুরোহিত রেভাঃ আই ডাবলু চার্লটন সাহেব ইত্যাদি ব্যক্তিগণের নাম উল্লেখযোগ্য।
দারিদ্র থাকা সত্ত্বেও এই মণ্ডলীর দানশীলতা যথেষ্ট অগ্রগণ্য ছিল। মণ্ডলীর দান পাঠানো হত স্থানীয় ডিস্পেন্সারিতে, বল্লভপুর বালিকা অর্ফ্যান হোমে, কলকাতার মালভানি হোমে, তৎকালীন শোলুয়ার আশ্রমে, কৃষ্ণনগর কুইন্স স্কুলে, কনভার্ট ফান্ডে, কলকাতার ওল্ড মিশন চার্চের যিহুদি মিশনে এবং ভারতের বাইরেও দান পাঠানো হত। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষের সময় এই মণ্ডলী অর্থ সাহায্য পাঠায়। ১৯০২ সালে হিকিনবোথাম সাহেব মহোপবাসকালে ‘আত্মত্যাগের দান’ বেদীতে আনতে মণ্ডলীকে শেখান।
বিশাল এলাকা জুড়ে এই মণ্ডলীর কর্মকাণ্ড – সমগ্র নদিয়ার উত্তরাংশে, মুর্শিদাবাদের কিছু অংশ, রাজশাহীর পোড়াদহ অঞ্চল ( এখন বাংলাদেশ),পাবনা জেলার পাকসী (এখন বাংলাদেশ)। এই কেন্দ্রের মিশনারিগণ সেই সময়ে রেল কোম্পানির চ্যাপলেন হতেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চল, শান্তিরাজপুর পালকীয় ক্ষেত্রের অন্তর্গত ছিল।
শিকারপুর মণ্ডলীর কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেতে থাকে ধীরে ধীরে
পাকা গির্জাঘর প্রতিষ্ঠার পূর্বেই শান্তিরাজপুরের মাটিতে প্রথম শিশু বাপ্তিস্ম হয় ডিসেম্বর ২৫, ১৮৮৯ সালে — দশ মাসের শিশুর নাম তিলোত্তমা। পুনরায় ২রা জানুয়ারি ১৮৯০ সালে বাপ্তিস্ম হয় নীলকুঠির মার্গারেট এলিস বয়লিন-এর। গির্জা প্রতিষ্ঠার পর চমৎকারিনী নামে এক শিশুর বাপ্তিস্ম হয়।
প্রথম সমাধি— ১১ ডিসেম্বর ১৮৯১ সালে তেঁতুলবেড়িয়ার (বর্তমান বাংলাদেশ) অজিত বিশ্বাস— বয়স ৩ বছর।
প্রথম বিবাহ — ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩ সালে —ডাঃ জন্ ডড্ প্রাইস ও জেসিকা এলনর স্টুয়ার্টের।
প্রথম কনভার্ট — ২৫ ডিসেম্বর ১৮৯৩ সালে —শ্রী তারকনাথ নন্দী, প্রথম বয়স্ক বাপ্তিস্ম হয়, ৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯২ সালে।
শতাব্দী প্রাচীন শান্তিরাজপুর মণ্ডলী আজ ইন্ধন নিঃশেষিত নিষ্প্রভ প্রদীপের মতো ম্লান
১৯৪৭ সালে নেমে এল দুর্দিন। দেশে ধর্মীয় অশান্তি হল। দেশবিভাগ হয়ে গেল—সবথেকে ক্ষতিগ্রস্থ হল এই সোনার বাংলা। বিশাল ধাক্কা এল শান্তিরাজপুর মিশন কেন্দ্রেও। শান্তিরাজপুর মণ্ডলীর অধীনস্থ যত মিশন কেন্দ্র ছিল, তার অন্তর্গত কেবলমাত্র শিকারপুর ও মুরুটিয়া ভিন্ন, আর সব কেন্দ্রই ওপার বাংলার ভৌগোলিক এক্তিয়ারভুক্ত হয়ে গেল। মিশন কেন্দ্রের পরিধি ছোট হয়ে পড়ল। মিশনারিরা একে একে দেশ ছেড়ে চলে যেতে লাগলেন। কেবল শান্তিরাজপুর নয়, সমগ্র নদিয়ার মণ্ডলীতেই হতাশা নেমে আসে।
২৬ শে আগস্ট ১৯৫৬ সাল, কলকাতা ডায়োসিস বিভক্ত হল। কলকাতা ও পাশ্ববর্তী অঞ্চল থাকল কলকাতাতে। অবশিষ্ট বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যারাকপুরের অধীনে গেল, নাম হল ব্যারাকপুর ডায়োসিস। বিশপ রোনাল্ড উইনস্টন ব্রায়ন কলকাতা ডায়োসিসের সহকারী বিশপ থেকে ব্যারাকপুরের পূর্ণ-দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশপ পদে উন্নীত হলেন। শান্তিরাজপুর মণ্ডলী ব্যারাকপুরের অধীনে চলে এল। পরিবর্তনের যুগ অনেক আগেই শুরু হয়, এবার আরও পরিবর্তন হয়। মিশন পরিচালিত প্রাইমারি স্কুল অন্যত্র সরে গিয়ে রাজ্য সরকারের অধীনে ‘শান্তিরাজপুর প্রাইমারি স্কুল’ নামেই চলতে থাকে। মিশনের স্কুল ঘর ফাঁকা হয়ে যায়। কচিকাঁচাদের কলকাকলি আর শোনা যায় না। বিভাজন ও নানা পরিবর্তনের ডামাডোলের মাঝে রোগী আসা অনেক কমে যায়, ডিস্পেন্সারি বন্ধ হয়ে যায়। কামরাগুলিও খালি পড়ে থাকে। প্রচারকার্য বন্ধ হয়ে যায়। কর্মচারীরা একে একে চলে যান। তাদের বাড়িগুলোও পড়ে থাকে। স্থানীয় এক বালিকা বিদ্যালয় পরিত্যক্ত বাড়িগুলো মিশনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে স্কুল চালায়। পরে নিজস্ব বিদ্যাভবন তৈরি হলে তাঁরা চলে যান। এরপর কয়েকটি কামরা নিয়ে একটা বালকদের অর্ফান হোম কয়েক বছর চলে। পরে সেটিও স্থানান্তরে চলে যায়। কিছু বাইরের ভদ্র পরিবার এখানে ভাড়াটে হয়ে আসেন। পরে তাঁরা একে একে চলে গেলে সব আবাসনগুলিই খালি পড়ে থাকে। তখন মণ্ডলীর সভ্যদের মধ্যে বিলি ব্যবস্থা করা হয়। দেশ বিভাগের আঘাতে অভিষিক্ত পুরোহিত ও ক্যাটেকিস্ট প্রচারকের অভাবে অনেক মণ্ডলী অসুবিধায় পড়ে। শিকারপুরেও পূর্ণ সময়ের পুরোহিতের অভাব হয়। প্রায় কুড়ি বছর কোনো পূর্ণ সময়ের পুরোহিত না থাকায় স্থানীয় গৃহী সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন উপাসনা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, এঁদের মধ্যে সন্তোষ মণ্ডলের নাম উল্লেখযোগ্য। বিশেষ সময়ে একজন পুরোহিত পাঠানো হত।
মাথাভাঙ্গা নদী। শিকারপুরের পাশ দিয়ে গিয়েছে। দু’দিকে এপার বাংলা-ওপার বাংলা।
দেশ বিভাগের পর মিশনারি সাহেবরা দেশে ফিরে যান। তাঁদের বাংলো খালি পড়ে থাকে। খালি বাড়ি রক্ষা করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ালো। অবশেষে কলকাতা ডায়োসিসের অধীনে থাকাকালীন সময়ে বিশপ ব্রায়েন ১৯৫২ সালে সিস্টার রবিনসন নামে এক নার্সিং সিস্টারের অধীনে এই বাড়িতে মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা করেন। মিসেস রবিনসন চলে গেলে মিসেস প্রভাসিনীর তত্ত্বাবধানে মাতৃসদন চলতে থাকে। সেই সময়ে এই সংস্থা রানাঘাটের ‘দয়াবাড়ি মিশন’-এর সাথে যুক্ত ছিল। সেখান থেকে মাসে মাসে ডাক্তার, সিস্টার ও নার্সেরা পালাক্রমে এসে তত্ত্বাবধান করে যেতেন। আর্থিক সাহায্যও রানাঘাট থেকে আসত। বিশপ গরাই-এর সময় মাতৃসদনে উন্নতি হয়। সিস্টার প্রভাসিনী কর্মরত অবস্থায় এখানে মারা গেলে মিসেস মীনা মণ্ডল হাল ধরেন। ১৯৮৩ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। মাতৃসদনে তালা পড়ে। ১৯৮৬ সালে বিশপ বৈরাগীর আমন্ত্রণে ডাঃ এস এ সরকার ঐ তালা খুলে মাতৃসদনকে আবার সঞ্জীবিত করেন। তাঁকে সহায়তা করার জন্য সিস্টার শান্তময় বিশ্বাস কয়েক মাস বাদে যোগদান করেন। প্রসূতির তত্ত্বাবধানের সাথে সাথে কলকাতা ‘ক্রাইস্ট চার্চ’ মণ্ডলী থেকে ডাঃ আশিস বিশ্বাসের প্রেরিত স্কুলছুট মেয়েদের প্রত্যেককে দু’মাস করে প্রায় চল্লিশ জনকে প্রসূতি ট্রেনিং দেওয়া হয়। তারা প্রত্যেকেই পরবর্তীতে কোনও না কোনও সেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতা ছিলেন। মাতৃসদন এখন নেই।
ব্যারাকপুর বিশপ মালাকার ও দমদম সেন্ট স্টিফেন্স স্কুলের প্রিন্সিপাল, শ্রী হরিপদ দাস মহাশয়, উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় শান্তিরাজপুরপুর কেন্দ্রকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে এখানে এক খণ্ড জমি ক্রয় করে ২০০৬ সালের ১ জুলাই শিকারপুর সেন্ট স্টিফেন্স্ স্কুল (বাংলা বিভাগ) স্থাপন করেছেন। সেই সময় মাত্র ৬৪ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে বিদ্যালয়ের পঠনপাঠনের প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়। এই কেন্দ্রের হৃতগৌরব কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে।
শিকারপুর-কৃষ্ণনগর রাস্তা। বহু পুরোনো বৃক্ষশোভিত।
শতাব্দী প্রাচীন শান্তিরাজপুর মণ্ডলী আজ ইন্ধন নিঃশেষিত নিষ্প্রভ প্রদীপের মতো ম্লান। একদা নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, রাজশাহী, পাবনা এলাকার প্রায় ৪০০ পৃথক পৃথক গ্রাম নিয়ে এই পালকীয় কেন্দ্র এখন নিঃসঙ্গ; সম্পূর্ণ একাকী। এর বর্তমান অস্তিত্ব গির্জা সংলগ্ন ৬৬ বিঘাতেই সীমাবদ্ধ। একটি উপাসনাগৃহকে কেন্দ্র করে কৃষি খামার, একটি আবাসিক স্কুল ও একটি খ্রিস্টান কলোনি, সব মিলিয়ে এক মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়েই এখন শিকারপুর প্যাস্টোরেটের স্থিতি। অতীতের শান্তিরাজপুর মহীরুহ আজ যেন গতায়ু বীথিকা — শীর্ণ পাতাঝরা, রিক্ত, নগ্ন। এমনই এক নগ্নপ্রায় দ্রাক্ষাতরুর উদ্দেশ্যে এক দ্রাক্ষাপালক বলেছিলেন— “প্রভু, উহাকে আর এক বৎসর থাকিতে দিউন……(লুক ১৩:৭)।” সাধ্যাতীত নিবিড় তত্ত্বাবধান ভিন্ন এই মৃতপ্রায় কেন্দ্রকে কে সঞ্জীবিত করবেন?
ঋণস্বীকার:
স্বর্গীয় ডাঃ স্নিগ্ধ আলোক সরকার,
মনোরঞ্জন মাঝি
ছবি: দীপক সাহা
শিকারপুর-কৃষ্ণনগর রাস্তার ছবি : জয়ন্ত দাস বৈরাগ্য

