
বড়ো আউটলেট এবং বিপুল বইয়ের সম্ভার চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো
মধ্যরাতে একটা শহর বড়ো হতে থাকে। শাখা-প্রশাখা মেলে তখন আমার ব্যক্তিগত একটি খিদে উজাগর হয়। বই পাঠের খিদে। মনে হয় বই পড়তে পড়তে লম্বা হয়ে উঠছি। দ্বিধা নিবারণ করে বই। আর ক্রমাগত বইয়ের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজন মহীরুহ কল্পবৃক্ষের মতো বিপণি। মালদা শহরে আগে মননশীল বইয়ের যোগান দিতেন পলাশ গোস্বামী। যাঁর পুস্তক বিপণির নাম মালদা বুক ফ্রেন্ড। অবশ্য সে দোকানের আয়তন সীমিত। ২০১৭ সালে পঁচিশে বৈশাখ উদ্বোধন হয় মালদা পুনশ্চ-র। বড়ো আউটলেট এবং বিপুল বইয়ের সম্ভার দেখে প্রথমদিন চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল।
মালদা পুনশ্চ-র কর্ণধার সুশান্ত সরকার আমাদের বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন মালদা পুনশ্চ-র পরিকল্পনা এবং হয়ে ওঠা নিয়ে। তিনি জানিয়েছেন যে, পুনশ্চ পাবলিশারের শিলিগুড়ি আউটলেট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁর এরকম একটি বইয়ের বিপণি করার কথা ভাবনায় আসে। অবশ্য তিনি বইয়ের বিপণি শুরু করার কথা ভেবেছিলেন ২০১৫ সালে। সে-সময় তিনি ভেবেছিলেন স্কুলের পাঠ্য বই এবং অন্যান্য বই সব মিলেই বইয়ের বিপণি শুরু করবেন। তবে পরবর্তীকালে শুধু বিষয়ভিত্তিক বই এবং অন্যান্য ভিন্ন ধারার বই নিয়ে একটি বিপণি শুরু করার কথা ভাবেন। সেখানে পুনশ্চ পাবলিকেশনের বইয়ের পাশাপাশি থাকবে অন্যান্য ছোটো বড়ো সমস্ত প্রকাশনার বই। প্রথম দিকে মালদা জেলার পাঠকের রুচি বুঝতে একটু সময় লেগেছে ওঁদের। কিন্তু ধীরে ধীরে নানারকম পাঠকের রুচি বুঝে বইয়ের সম্ভার ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছেন। মালদা পুনশ্চ-র কর্ণধার সুশান্ত সরকার অনেককিছু বলেছেন তা ক্রমশ এখানে জানানো হবে।
আসলে ব্যক্তিগতভাবে মালদা পুনশ্চ-র সঙ্গে শুরু থেকে জড়িয়ে আছি। সেখানকার প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানে সবার প্রথমে আমার ডাক পড়ে। প্রীতম বসাক যিনি এই মালদা পুনশ্চ পরিবারের প্রাণপুরুষ, তাঁর সহৃদয় আমন্ত্রণ এবং ভালোবাসা নানা ধরনের পাঠকদের এই বিপণির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। মালদা পুনশ্চ নামে একটি ফেসবুক প্রোফাইলও আছে। সেই প্রোফাইলের মাধ্যমে বইয়ের প্রচার এবং প্রসার যেমন করা হয়, তেমনই নানা অনুষ্ঠান যা এই বিপণিতে অনুষ্ঠিত হয় তা পূর্বপ্রচার করা হয়। মালদা পুনশ্চ’র পাঠক, প্রীতম বসাক, সুশান্ত সরকার এবং লেখকেরা যাঁরা আসেন, সবাই আমরা একটা পরিবারের মতো।
প্রতি সপ্তাহে নতুন বই আসে। আমরা পাঠকেরা উন্মুখ হয়ে থাকি নতুন বইয়ের জন্য। প্রথম দিকে অনেক প্রকাশনার বই মালদা পুনশ্চ-তে এসেছিল। তারপর ধীরে ধীরে আরও বিভিন্ন প্রকাশনার বই এখানে আসতে শুরু করে। বিশেষভাবে আকর্ষণ করে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা থেকে যেসব বই বেরোয়, সেগুলোও এখানে পাওয়া যায়। এতে বইয়ের বিস্তৃত ভুবন আমাদের সামনে খুলে গেছে।
শুধুমাত্র বই বিক্রি তো উদ্দেশ্য নয়, সঙ্গে লেখক-পাঠক যোগাযোগ এবং আদানপ্রদান এখানে নিয়মিতভাবে হয়ে চলেছে। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরাও আসেন। তাঁদের সঙ্গে লেখক এবং পাঠকদের যোগাযোগ হয়। সম্পাদকদের মধ্যে এসেছেন আদম পত্রিকার গৌতম মণ্ডল, দমদম জংশন পত্রিকার বৈদ্যনাথ মিশ্র, আলোচনা চক্র পত্রিকার চিরঞ্জীব শূর, তবুও প্রয়াস পত্রিকার সেলিম মণ্ডল এবং আরও অনেকে। অনেক অন্ধকারে থাকা লেখকেরাও এসেছেন। অন্ধকারে অর্থে যাদের নিবিড় এবং মেধাদীপ্ত লেখা সেভাবে এখনও পাঠকের সামনে আসেনি। লেখকেরা আসেন। নিজের লেখকজীবনের কথা বলেন, সঙ্গে তাঁদের লেখা সম্পর্কে বলেন। ‘গো রাখালের কথকতা’-র লেখক আনসারউদ্দিন এসেছিলেন মালদা পুনশ্চ-র বর্ষপূর্তি উপলক্ষে। সে এক অনন্য সন্ধ্যা।

এই বিপণিতে আমরা এমন মূল্যবান বই সংগ্রহ করতে পারি তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আরও একটা বিশেষ অবদান আছে মালদা পুনশ্চ-র সেটা হল, বই প্রকাশ অনুষ্ঠান। এখানে লেখকদের নতুন বই প্রকাশ অনুষ্ঠান হয়, যা সহজেই একদিনে পাঠকের হাতে আসে। সঙ্গে বইটার বিপণনের দিকটাও দেখা হয়ে যায়।
জেলা এবং জেলার বাইরের অনেক লেখকদের সমস্ত বই মালদা পুনশ্চ আন্তরিক চেষ্টায় পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে ক্রমাগত। অজানা বইয়ের খোঁজও আমরা পাই পুনশ্চ পরিবারের অক্লান্ত চেষ্টায়। আসলে একটি প্রসঙ্গ এতক্ষণ ধরে তোলা হয়নি তা হল ‘নাম প্রসঙ্গ’। মালদা পুনশ্চ নামটাই কেন দেওয়া হল?! আসলে পুনশ্চ প্রকাশনার কর্ণধার সন্দীপ নায়কের সঙ্গে সুশান্ত সরকারের বহুদিনের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা আছে। এবং তাঁরা ভাবলেন যে, পুনশ্চ নামটাই থাক সঙ্গে মালদা জুড়ে দেওয়া হল। শুধুমাত্র পুনশ্চ প্রকাশনার বই থাকবে না, সঙ্গে বিভিন্ন ছোটো বড়ো প্রকাশনীর বইও রাখা হবে সেখানে। এমন পরিকল্পনাই যা বাস্তবায়িত করেছেন সুশান্তবাবু।
আসলে বর্তমান সময়ের মূল সমস্যা হল বই বিক্রয়। মফঃস্বল শহরে কবিতার বইয়ের পাঠক খুব স্বল্প। এটা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশান্তবাবু। এমনিতেই পাঠক স্বল্প, তবুও পাঠক সংস্কৃতি তৈরি করার পেছনে মালদা পুনশ্চ-র এক বিশাল অবদান আছে। ধীরে ধীরে পাঠকেরা ভিন্ন ধারার বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। এটা মালদা পুনশ্চ-র অবদান। এখানে আড্ডার সঙ্গে চা জুটে যায় অফুরন্ত। এই অন্তরঙ্গতাও বড়ো প্রাপ্তি। আরও অনেক আন্তরিক কথা থেকে যায় তা বই এবং মালদা পুনশ্চ পরিবারেই আবদ্ধ থাক।

