
পাঁচ তলা এই মিনারের দেওয়াল জুড়ে আছে পোড়ামাটির কাজ
এক সময়ে বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়। ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই শহর রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় ভারত এবং বাংলাদেশের সীমান্তে। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও এর খানিকটা অংশ পড়েছে। বড়ো সোনা মসজিদ, দাখিল দরোয়াজা, লোটন মসজিদ, চিকা মসজিদের মতো বিখ্যাত সব স্থাপত্যের জন্য এই জায়গা পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। ফিরোজ মিনার এখানকার এক নাম করা স্থাপত্য। মালদা টাউন রেল স্টেশন থেকে ১৭ কিলোমিটার এবং দাখিল দরোয়াজা থেকে মোটামুটি এক কিলোমিটার দূরে এই মিনারের অবস্থান। দেখতে অনেকটা দিল্লির কুতুব মিনারের মতো। তুঘলকি শৈলীতে নির্মিত পাঁচ তলা এই মিনারের দেওয়াল জুড়ে আছে পোড়ামাটির কাজ।
এই মিনারটি নির্মাণ করিয়েছিলেন হাবসি সুলতান সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ। বাংলায় হাবসি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বারবক শাহকে তিনি হত্যা করেন। তাঁর আসল নাম ছিল মালিক আনদিল। ইলিয়াস শাহি বংশের শেষ সুলতান জালালউদ্দিন ফতে শাহর নাবালক ছেলেকে সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন তিনি। ফতে শাহর বিধবা স্ত্রী তাতে সম্মত না হওয়ায় তিনি নিজেই সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ নাম নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন। হাবসি শাসনকালে তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ সুলতান। রাজত্ব করেছিলেন ১৪৮৭ থেকে ১৪৯০ সাল পর্যন্ত। মাজানা বা আজান দেওয়ার জায়গা এবং বিজয় মিনার হিসেবে তিনি ফিরোজ মিনার তৈরি করিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকেরা চিরাগ মিনারও বলে থাকেন এটিকে। নামাজের সময়ে নির্দেশ দিতে কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে মাজানায় এক সময়ে প্রদীপ জ্বালানো হত। সম্ভবত, সেখান থেকেই এই নামটি এসেছে। পির আশা মিনার নামেও এটি পরিচিত।

এই মিনার নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে একটি আশ্চর্য গল্প। মিনারটি প্রথমে এতটা উঁচু ছিল না। যখন এই মিনার তৈরি হচ্ছে, সুলতান ফিরোজ শাহ একদিন কাজ দেখতে গেলেন। মিস্ত্রিকে জিজ্ঞেস করলেন, মিনার আরও উঁচু হওয়া সম্ভব কিনা। মিস্ত্রি বললেন, অনেক উঁচু করা সম্ভব। এতে ভীষণ রেগে গেলেন সুলতান। প্রশ্ন করলেন, তাহলে উঁচু করা হয়নি কেন? মিস্ত্রি জবাব দিলেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় মালপত্র তাঁর ছিল না। এতে সুলতান আরও রেগে গেলেন। বললেন, এই ব্যাপারে তাঁকে কেন জানানো হয়নি। মিস্ত্রি আর কোনো উত্তর দেন না। চুপ করে থাকেন। সেই মিস্ত্রিকে মিনারে চূড়া থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার আদেশ দিলেন তিনি। মিস্ত্রিকে প্রাণ হারাতে হল।
সুলতান মিনার থেকে নেমে পরিচারক হিঙ্গাকে মোরগাঁও যেতে হুকুম দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মোরগাঁও চলে গেলেন হিঙ্গা। কিন্তু ভয়ে সুলতানকে জিজ্ঞেস করেননি, এখানে তিনি কী কাজ করতে এসেছেন। অগত্যা মোরগাঁওতে তিনি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এমন সময়ে সনাতন নামে ব্রাহ্মণ যুবকের সঙ্গে দেখা হল তাঁর। কথায় কথায় হিঙ্গার সমস্যার কথা শুনলেন সেই যুবক। তিনি পরামর্শ দিলেন, মোরগাঁও থেকে দক্ষ রাজমিস্ত্রি নিয়ে সুলতানের কাছে যাওয়ার জন্য। মোরগাঁও ছিল রাজমিস্ত্রিদের জন্য বিখ্যাত। সনাতনের কথামতো রাজমিস্ত্রি নিয়ে হিঙ্গা সুলতানের কাছে হাজির হলেন। সুলতান তো মহাখুশি। হিঙ্গাকে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে তিনি সুলতানের মনের কথা জানলেন? তখন হিঙ্গা খুলে বললেন সনাতনের কথা। সুলতান সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ তখন সনাতনকে ডেকে পাঠালেন। রাজ দরবারের এক উঁচু পদে নিয়োগ করলেন তাঁকে। তারপর, এক সময়ে ফিরোজ মিনার বানানো শেষ হল। অনেকে বলে থাকেন, এই সনাতনই আসলে চৈতন্যদেবের শিষ্য সনাতন গোস্বামী।
তথ্যঋণ – এবিএম হোসাইন, নন্দিতা মিশ্র।
মালদার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান | ভিডিও সৌজন্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তর
