দাখিল দরোয়াজা যেভাবে হয়ে উঠল সেলামি দরোয়াজা

গৌড় দুর্গে ঢোকার প্রধান ফটক ছিল দাখিল দরোয়াজা

বাংলায় তুর্ক-আফগান শাসকদের দীর্ঘদিনের রাজধানী ছিল লখনৌতি। এখনকার মালদা জেলায় বাংলাদেশ সীমান্তে এর অবস্থান। শহরটার পুরোনো নাম লক্ষ্মণাবতী ছিল। সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণসেনের নাম অনুসারে শহরের এই নামকরণ। গোটা জায়গাটা গৌড় নামেও পরিচিত। ১২০৫ সালে ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি নদিয়া আক্রমণ করেন। রাজা লক্ষ্মণসেন রাজপ্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান বিক্রমপুরের দিকে। আর বখতিয়ার খিলজি তারপর লক্ষ্মণাবতীর দখল করে সেখানেই বানিয়ে তোলেন নিজের রাজধানী। পরবর্তীকালে এই লক্ষ্মণাবতী পরিচিত হয় লখনৌতি নামে। অসাধারণ সব স্থাপত্য এখানে গড়ে উঠতে থাকে। কদম রসুল মসজিদ, লুকোচুরি দরোয়াজা, লোটন মসজিদ, দাখিল দরোয়াজা, বড়ো সোনা মসজিদ এবং আরো কত কী। সময়ের প্রভাবে এই সব সৌধ-অট্টালিকায় লেগেছে ক্ষয়ের ছাপ, তবুও দর্শনার্থীরা আজও মুগ্ধ হয়ে যান সামনে থেকে এগুলোকে দেখে।  

আজকের ‘বঙ্গদর্শন’-এ থাকছে দাখিল দরোয়াজার গল্প। অনেকে মনে করেন, গৌড় দুর্গ বানানোর সময় সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ এই দাখিল দরোয়াজা তৈরি করিয়েছিলেন। তবে অনেক গবেষকই তা মানতে রাজি নন। তাঁদের মতে এরকম সুদৃঢ় এক স্থাপত্য বানানোর পরিকাঠামো নাসিরউদ্দিন মাহমুদের সময়ে ছিল না। এই ধরনের পরিশীলিত সৌধ তৈরি করতে যথেষ্ঠ উন্নত স্থাপত্যবিদ্যার প্রয়োজন। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের পরে ইলিয়াস শাহি যুগেও এরকম শক্তপোক্ত কোনো কাজ চোখে পড়ে না। তাই হোসেন শাহি আমলেই দাখিল দরোয়াজা গড়ে উঠেছিল বলে তাঁরা মনে করেন। বড়ো সোনা মসজিদের সঙ্গে দাখিল দরোয়াজার সাজসজ্জায় অনেক মিল রয়েছে। হতে পারে, বড়ো সোনা মসজিদ যিনি তৈরি করেছিলেন, সেই আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আদেশেই দাখিল দরোয়াজা বানানো হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, রুকনউদ্দিন বারবাক শাহের সময়কালেই তৈরি হয়েছি এই সৌধ। 

আরবি ভাষায় ‘দাখিল’ শব্দের অর্থ ‘প্রবেশ’ আর ফারসি ভাষায় ‘দরোয়াজা’ মানে ফটক। অর্থাৎ সহজ বাংলায় গৌড় দুর্গে ঢুকতে হত এই দাখিল দরোয়াজা দিয়ে। দুর্গে যাওয়ার প্রধান ফটক ছিল এটাই। ৬০ ফুট উঁচু আর ৪২ ফুট চওড়া ফটকের ভেতরে প্রবেশপথটা ছিল বেশ বড়োসড়ো। মাহুত আর সওয়ারি নিয়ে একটা হাতি অনায়াসে এই ফটক পার হয়ে যেতে পারত। সুলতান বা অভিজাত শ্রেণির কেউ যখন দাখিল দরোয়াজা দিয়ে দুর্গে ঢুকতেন ফটকের দু’পাশ থেকে কামান দেখে তাকে জানানো হত সম্মান, সেলাম জানানো হত। এই সৌধের আরেক নাম তাই হয়ে গিয়েছিল ‘সেলামি দরোয়াজা’। 

তথ্যসূত্র – এ বি এম হোসেন  

Developed by DXDasia