
সাধারণ সৌরকোষের থেকে এই জেনারেটারের কার্যকরিতা দ্বিগুণ
“We are actually tampering with the climate of the earth and atmosphere that we breathe”
—-Isaac Asimov
দূষণ, বর্তমানে সারা পৃথিবীর সবথেকে বড়ো বিপদ। বিপদ গোটা মানবপ্রজাতির জন্য। সংকট শুধু মানুষের নয়, গোটা বাস্তুতন্ত্র, জীবজগতের। খুব তাড়াতাড়ি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণ। গলছে হিমবাহ, ফুরিয়ে যাচ্ছে বনানী, বাতাসে বাড়ছে বিষ। কমে আসছে প্রচলিত জ্বালানির ভাণ্ডার। মানুষের উন্নয়ন-যজ্ঞের আগুনে পুড়তে বসেছে মানুষই। একা নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু এ ধ্বংস থামানোর উপায় কী? ‘প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা।’ কমাতে হবে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ, বাড়াতে হবে অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার। সারা বিশ্ব জুড়ে সেই কাজে মগ্ন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মধ্যে কেউ যখন নতুন পথের সন্ধান দেন, তখন আশা জাগে। নতুন করে বাঁচার, নতুন পৃথিবী দেখার। তেমনই আশা দেখালেন জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের (Kyushu University, Japan) গবেষক প্রীতম সাধুখাঁ (Pritam Sadhukhan)। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা মিলে তৈরি করে ফেললেন পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম জেনারেটার। যা সূর্যালোক এবং সৌরতাপ থেকে তৈরি করবে বিদ্যুৎ। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত নেচার জার্নালের সাব-জার্নাল নেচার কমিউনিকেশনসে। প্রীতম এই গবেষণাপত্রের প্রথম প্রণেতা (First Author)।

কী এই জেনারেটার? উত্তরে প্রীতম বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, “এটি একটি ন্যানোক্রিস্টাল (Nano-Crystal)। যা সূর্যালোক এবং সৌরতাপ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করতে সক্ষম।” সাধারণ সৌরকোষগুলি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে বটে, কিন্তু সেই বিদ্যুৎ নিজে থেকে ধরে রাখতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন পড়ে বাহ্যিক তড়িৎকোষের শক্তির। কিন্তু প্রীতমদের এই জেনারেটার নিজে থেকেই বিদ্যুৎশক্তি সঞ্চয় করে রাখতে সক্ষম, যা পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা যাবে। প্রীতম আরও জানান, “সিলিকন মৌল দিয়ে তৈরি সাধারণ সৌরকোষগুলি শুধুমাত্র সূর্যালোক থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু আমাদের ক্রিস্টালটি সূর্যালোক এবং সৌরতাপ, দুটি থেকেই বিদ্যুৎ তৈরিতে সক্ষম। আর কোনও বাহ্যিক তড়িৎকোষের সাহায্য ছাড়াই সেই বিদ্যুৎকে সঞ্চয় করে রাখতে পারে। তাই আমরা একে 3-in-1 ব্যবস্থা বলতে পারি।”

গবেষক প্রীতম সাধুখাঁ
প্রীতম সাধুখাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই ক্রিস্টালটি কোবাল্ট আর গ্যালিয়াম ধাতু দিয়ে তৈরি। সঙ্গে আছে কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন। কিন্তু মুখ্য ভূমিকা নেয় কোবাল্ট আর গ্যালিয়াম। কীভাবে কাজ করে এই জেনারেটার? যখন বাইরে থেকে আলো আর তাপ ক্রিস্টালের উপর পড়ে, তখন ক্রিস্টালের ধাতব অণুগুলি ইলেকট্রন ত্যাগ করে। ফলে অণুগুলিতে আধানের তারতম্য হয়। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ডাইপোল (Dipole)। তার ফলেই তৈরি হয় বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎই প্রবাহিত হয় সার্কিটে। সাধারণ অবস্থায় এই বিদ্যুতের পরিমাণ অতি সামান্য। কিন্তু প্রীতমরা ক্রিস্টালটি তৈরি করার সময় প্রয়োগ করেছেন ক্রিস্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি (Crystal Engineering Technology)। ফলে ক্রিস্টালের ডাইপোলগুলি সমগ্র ক্রিস্টাল জুড়ে একইরকমভাবে সজ্জিত হয়ে গিয়েছে। তার ফলে সমগ্র বিদ্যুতের পরিমাণ বেড়ে গেছে অনেকগুণ।
ক্ষুদ্রতম এই জেনারেটারে কোনওরকম ফ্যাব্রিকেশনের দরকার হয় না। “আমরা কতগুলো মৌল নিয়ে একসঙ্গে মিশিয়ে ক্রিস্টাল তৈরি করলেই আমাদের জেনারেটার তৈরি।
কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়,জাপান
প্রীতমের কথায়, “আমরা পরীক্ষাগারে খুব ছোটো মাত্রায় এই পরীক্ষাটি করেছি। কিন্তু কেউ যদি অনেক পরিমাণে বিদ্যুৎ তৈরি করতে চান, তাহলে ক্রিস্টালের আকার বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ক্রিস্টালের আকার বাড়িয়ে বা কমিয়ে বিদ্যুতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটাও ব্যবস্থাটির একটি বিশিষ্টতা।” ব্যবস্থাটি রোবোটিক্স আর স্পেস সায়েন্সের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী। বিজ্ঞানের এই দুটি ক্ষেত্রের অনেক কাজে কম পরিমাণ শক্তি দরকার হয়, যেমন ব্যাটারি রিচার্জ করা। সেসব কাজে কোনও বাহ্যিক প্রচলিত শক্তি ছাড়াই এই ব্যবস্থাটিকে ব্যবহার করা যাবে। ক্রিস্টালটির আকার ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে তা ব্যবহার করা যাবে গাড়িশিল্প-সহ অন্য শিল্পেও। প্রীতমের কথায়, “বিশ্বে প্রচলিত শক্তির পরিমাণ সীমিত। আর তা ফুরিয়েও আসছে দ্রুত। আমাদের তৈরি এই ক্রিস্টালটি প্রচলিত শক্তি ব্যবহার করছে না। ফলে সেই সীমিত জ্বালানি ভাণ্ডারে হাত দিতে হচ্ছে না। আর যেহেতু সৌরশক্তি ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ তৈরি করা যাচ্ছে, ফলে পুরো ব্যবস্থার খরচও কমছে অনেকটা।” তাঁর দাবি, সূর্যলোক থেকে বিদ্যুৎ আগে তৈরি হলেও, সৌরতাপ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করা এবং তাকে সঞ্চয় করে রাখার এই সম্মিলিত ব্যবস্থা (Integrated Nano-Generator) তৈরি হলো এই প্রথমবার। “এটাই আমাদের গবেষণার বিশিষ্টতা”, জানালেন প্রীতম। সাধারণ সৌরকোষগুলিতে দুটি পদার্থ একসঙ্গে জুড়তে হয়। যার একটিতে ইলেকট্রনের আধিক্য এবং অন্যটিতে ইলেকট্রনের ঘাটতি থাকে (p-n junction fabrication)। কিন্তু ক্ষুদ্রতম এই জেনারেটারে কোনওরকম ফ্যাব্রিকেশনের দরকার হয় না। “আমরা কতগুলো মৌল নিয়ে একসঙ্গে মিশিয়ে ক্রিস্টাল তৈরি করলেই আমাদের জেনারেটার তৈরি। তাই সাধারণ সৌরকোষ তৈরির মতো খরচও হয় না এতে”, বলেন তিনি। আরও জানান যে, এই ক্রিস্টালের প্রতিটি অণুই সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন-এ সক্ষম, তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে ন্যানো জেনারেটার (nano generator), যা স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম জেনারেটার (world’s smallest generator) হিসেবে। সাধারণ সৌরকোষে, সৌরশক্তির ২৫-৩০ শতাংশ বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। এই জেনারেটারে তার পরিমাণ হয়ে যায় দ্বিগুণ।
গবেষক দল
বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটির চিত্র
গবেষণার ফান্ডিং এসেছে আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি আর ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি থেকে। গবেষণায় কিউশু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও যুক্ত ছিলেন জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এবং ইংল্যান্ডের ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। গবেষণা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সাল থেকে। এখন এই ন্যানো জেনারেটারের কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছেন ব্যারাকপুরের ছেলে, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন এবং আইআইএসইআর ভোপালের (IISER Bhopal) প্রাক্তনী প্রীতম। প্রখ্যাত মহাকাশবিজ্ঞানী কার্ল সাগান বলেছিলেন, “to me, it underscores our responsibility….to preserve and cherish the pale blue dot. The only home, we've ever known.” আমাদের একমাত্র বাড়ি, আমাদের পৃথিবী, ‘the pale blue dot’ আদৌও বাঁচবে কি না তার উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ। কিন্তু প্রীতম সাধুখাঁদের মতন এমন উদ্যোগ দেখলে মনে হয়, ঠিক জিতে যাবে জীবন।
___________________
ছবিঋণঃ প্রীতম সাধুখাঁ
