
২০১৩ সালে বেলুড়ে প্রথম শুরু হয় ফটোগ্রাফি কোর্স
ছবি কথা বলে। ছবি গল্পও বলে। স্মৃতি সুখের হোক বা দুঃখের, সময়ের ঢেউ লেগে ফ্যাকাশে হয়ে আসে সবই। কিন্তু সময়ই যদি বাঁধা পড়ে? তবে নিরুদ্দিষ্ট মূহূর্তরা ঘরে ফিরে আসে। ছবি যেন সময়ের সেই প্রহরী। মূহূর্তরা ধরা পড়ে যায় ক্যামেরার লেন্সে। যেন ঐন্দ্রজালিকের মায়ায় স্থবির মূহূর্তরা খুলে দেয় পুরাতনী সময়ের বাঁক। ছবিতে ধরা থাকে সময়ের পর্ব, ধরা থাকে ইতিহাস, প্রেম ও প্রদাহ। বাংলা পেয়েছে বরেণ্য নিমাই ঘোষকে। এছাড়াও ভারতে প্রথম পেশাদারী আলোকচিত্রের শুরুও বোধহয় এক বঙ্গসন্তানের হাতে। বর্তমানে সমাজমাধ্যম জুড়ে ছড়িয়ে থাকে অজস্র ছবি। পটু-অপটু হাতের ছোঁয়া লাগা। তবু যেন বঙ্গ-সংস্কৃতির আলো তেমন লাগেনি ফটোগ্রাফির গায়ে। সাহিত্য, সংগীত, সিনেমার আসরে একটু যেন থমকে এসে দাঁড়ায় আলোকচিত্র, আজও। সেই অবস্থাকে বদলানোর চেষ্টা করছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির-এর ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সুব্রত রায় চৌধুরী। তাঁর উদ্যোগে এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সেখানে ফটোগ্রাফির উপর ১ বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করানো হয়। বর্তমানে সার্টিফিকেট দেওয়া হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে।
অধ্যাপক সুব্রত রায় চৌধুরী
“আমি যতদূর জানি, বাংলাতে ফটোগ্রাফির উপর প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স তেমন নেই, বিশেষত কলকাতায়। কিছু মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কোর্স বা ওয়ার্কশপ করান বটে, তবে তা পর্যাপ্ত নয় বলেই আমার ধারণা। এই কোর্স চালু করার পিছনে সেটা একটা বড়ো কারণ। আর বাকিটা আমার ফটোগ্রাফির প্রতি ভালোবাসা, প্যাশন।” বঙ্গদর্শন.কম-কে আলাপচারিতায় জানালেন সুব্রত রায় চৌধুরী (Subrata Roy Chowdhury)। রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির স্বায়ত্ত্বশাসন পাওয়ার পর এই কোর্স চালু করার কথা ভাবেন কলেজ-কর্তৃপক্ষ। ২০১৩ সালে জুলাই মাসের ৬ তারিখ এই কোর্সটি চালু হয়েছিল। প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন-সহ ৬ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স হিসাবে শুরু হলেও ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে কোর্সটি ১ বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে বদলে যায়। সুব্রতবাবু জানান, কোর্সটি শুরু হওয়ার দিন উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক নিমাই ঘোষ।
স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির
সুব্রতবাবু জানান, প্রতি শনিবার সাড়ে তিনটে থেকে ছটা-সাড়ে ছটা পর্যন্ত ক্লাস নেওয়া হয়। কখনও কখনও রবিবারেও ক্লাস নেওয়া হয়। অনলাইনেও নেওয়া হয় কিছু ক্লাস। এই কোর্সে ভর্তি হতে পারেন যে-কোনও বয়সের মানুষ। নেই কোনও যোগ্যতার পূর্বশর্ত। এমনকি অনেক প্রৌঢ়ও এই কোর্স করেছেন। তাঁরা নিজেদের শখ, নিজেদের ভালোলাগা থেকে এই কোর্স করেছেন বা করেন। কোর্স শেষ হওয়ার পরেও ফটোগ্রাফির চর্চা করেন বলে জানান সুব্রতবাবু। এই কোর্সে প্রধানত শেখানো হয় ছবির মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর গল্প বলা বা ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং (Visual Storytelling), ডক্যুমেন্টারি ফটোগ্রাফি (Documentary Photography)। তিনি বলেন, “চিত্রগ্রহণের এই ধারাটিতে পশ্চিমবঙ্গ যে কোনও কারণেই হোক পিছিয়ে আছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে।” তাই বাংলাদেশের ঢাকার বিখ্যাত ফটোগ্রাফি ইন্সটিটিউট কাউন্টার ফোটো (Counter Photo)-র সঙ্গে নিয়মিত স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চলে। বেলুড়ের ফটোগ্রাফি কোর্সের প্রথম ৭ জন ছাত্র বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানটিতে ৫ দিনের যৌথ ওয়ার্কশপে অংশ নেন। আবার ঢাকার প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৭ জন ছাত্র আসেন বেলুড়ে ওয়ার্কশপ করতে। দুই জায়গাতেই প্রশিক্ষণ দেন বিশিষ্ট প্রশিক্ষকরা। ২০১৬ সাল থেকে এই প্রোগ্রামটি শুরু হয়েছিল। মাঝে কোভিডের কারণে ২ বছর বন্ধ থাকার পর আবার ২০২২ সালে প্রোগ্রামটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুব্রতবাবু নিজের উদ্যোগে ঢাকা গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ সইফুল হক ওমি-র সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামটি শুরু করেছেন। সুব্রত রায় চৌধুরী জানাচ্ছেন, “ছবি তো একরকমের শিল্পমাধ্যম। তাই মনন, বোধ, জ্ঞানের প্রসার না ঘটলে ভালো ছবি তোলা সম্ভব নয়। সময়কে, সমাজকে দেখার চোখ তৈরি করতে হয়, তবেই ভালো চিত্রগ্রাহক হওয়া যায়, ছবি দিয়ে গল্প বলা যায়। আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে, যাঁরা ছবি তোলেন, শুধু তাঁরাই ফটোগ্রাফি শেখাতে পারেন। কিন্তু সারা বিশ্বে ফটোগ্রাফির তত্ত্বের উপর বিখ্যাত বইগুলির লেখকেরা অনেকেই ছবি তোলেননি কোনোদিন। তাই এই কোর্সে অন্য জগতের মানুষদেরও নিয়ে আসা হয়, তাঁদের দিয়ে ক্লাস করানো হয়। সিনেমা, ছবি আঁকার জগতের অনেক মানুষ, বিখ্যাত ভাস্করেরা ক্লাস নেন। আসেন যাদবপুরের চলচ্চিত্র বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপকেরা, আর্ট কলেজের অধ্যাপকেরা।” তিনি যোগ করেন, “আমার মনে হয়, একজন শিক্ষকের কাছে শিখলে তাঁকেই অনুসরণ করার একটা প্রবণতা চলে আসে ছাত্রদের মধ্যে। এই কোর্সে যেহেতু অনেক শিক্ষক শেখান, তাই ছাত্রদের কাছে সুযোগ এবং স্বাধীনতা থাকে একই বিষয়ের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার, তারপর নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গ্রহণ করার।”

ষষ্ঠ পলিফোনি ফটো ফেস্টিভ্যাল উদ্বোধনের মূহুর্ত
এই কোর্সে যুক্ত হন অনেক যুবকও। কোর্স শেষ করার পর তাঁরা আলোকচিত্র নিয়ে কী রকমের কাজ করেন? অধ্যাপক রায় চৌধুরী বলেন, “কিছু ছাত্র বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রান্ট পেয়েছেন। যেমন, এই কোর্সের ছাত্র শুভ্রজিত সেন, ২০১৮ সালে নিউ দিল্লির শ্রী অরবিন্দ সেন্টার ফর আর্টস অ্যান্ড কমিউনিকেশন অ্যান্ড মূর্থ নায়েক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সোশ্যাল ডক্যুমেন্টারি ফটোগ্রাফি গ্রান্ট (Social Documentary Photography Grant) পেয়েছিলেন। ২০২০ সালে ইয়ান প্যারি কমেন্ডেড অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। অনেকে ব্যক্তিগত স্তরে নানা কাজ করছেন। তাও বলবো, এই জায়গাতে খানিকটা পিছিয়ে আছি সার্বিকভাবে। আসলে আরও বেশি সময় দিতে পারলে ভালো হত। আমি নিজে কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক, তাই অতটা সময় দিতে পারি না। পরিকাঠামোগত উন্নতিরও অবকাশ আছে। তাও বলব, চিত্রগ্রহণের এই ধারাটিকে এই বাংলার চিত্রগ্রাহকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পিছনে এই কোর্সের একটা বড়ো ভূমিকা আছে।” তাঁর কথায়, হালে যে ওয়েডিং ফোটোগ্রাফির চল বেড়েছে, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উপার্জন করছেন তাঁর ছাত্ররা, যেখানে তাঁরা কাজে লাগাতে পারছেন এই কোর্স থেকে পাওয়া শিক্ষা।

রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড়ের ছাত্ররা
কিন্তু ছবির মাধ্যমে গল্প বলতে হলে অনেক বেশি সহজ মাধ্যম ভিডিওগ্রাফি নয় কি? কারণ সেখানে অনেক বেশি মূহূর্তরা ধরা পড়ে। প্রশ্ন করায় অধ্যাপক রায় চৌধুরীর উত্তর, “ভিডিওতে তো সবটাই দেখে ফেলছে দর্শক। কিন্তু স্থিরচিত্রে যেহেতু সবটা দেখতে পারছে না, তা দর্শককে স্বাধীনতা দিচ্ছে বিষয়টিকে বিভিন্ন ভাবে ভাবার। এই যে মূহূর্তদের আড়াল, এই আড়াল থেকে জন্ম হয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির, অন্ধকার সরে যায় চিন্তার ধোঁয়াটে অবয়ব থেকে। সে কারণেই এই মাধ্যম আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।” তাঁর নিজের ফটোগ্রাফির চর্চা বহু বছরের। ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার থেকে যে নেশার শুরু। তারপর নিজের উদ্যোগে আর বন্ধুদের উৎসাহে সেই নেশা ক্রমে প্যাশনে পরিণত হয়েছে। এখন সেই প্যাশনকে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সুব্রত রায় চৌধুরী।
_____________
প্রতিবেদন: সৌমিক দাস | প্রতিবেদন পরিকল্পনা: সুমন সাধু
