মনোবীণা ও দেবলীনা : দেশে প্রথম ‘ক্যানডিড’ ফটোগ্রাফি শুরু করেছিলেন এই যমজ বোন

যে বছর (১৯৩১) ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তাঁর “লিটল হিস্ট্রি অফ ফটোগ্রাফি” প্রকাশ করছেন, ঠিক সেই বছরই উত্তর ভারতের রামনগরে দুই দ্বাদশী বঙ্গবালা তাদের জন্মদিনে বাবার থেকে উপহার পাচ্ছে একটি আগফা ব্রাউনি ক্যামেরা। সেই সময় মানে, ত্রিশের দশকে ক্যামেরা বস্তুটির সঙ্গে যখন যৎসামান্য পরিচিত হচ্ছে আমাদের দেশ, তখন কোনও বাঙালি ব্যক্তি তাঁর যমজ মেয়েদের চেতনাতে ফটোগ্রাফির বীজ রোপন করে দিচ্ছেন, এ ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু, ঘটেছিল এটাই।

মনোবীণা সেন রায় এবং দেবলীনা সেন রায়। সে সময়ের মুষ্টিমেয় মহিলা-চিত্রীদের তালিকায় তাঁরা ছিলেন অগ্রণী সারিতে। ত্রিশের পরবর্তী কয়েক দশক অক্লান্ত ছবি তুলে গিয়েছেন মনোবীণা। সে ছবি পরাধীন দেশের প্রদর্শনীগুলিতে, নতুন ভারতের অভিজাত সাপ্তাহিকী কিংবা অত্যাধুনিক ফ্যাশন-পত্রিকার আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। তাঁদের বাবা বিনোদ বিহারী সেন রায় ছিলেন শিক্ষক। চাকরি করতেন বেনারস-মহারাজার অধীনে এবং লন্ডনের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্যও ছিলেন। দুই মেয়েকে শুধু ক্যামেরা উপহার দিয়েই থেমে থাকেননি, ফটোগ্রাফির বিভিন্ন ঘরানা নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে, নিজস্ব শৈলী গড়ে তুলতে, ফটোগ্রাফির প্রদর্শনী করতে উৎসাহ দিতেন তিনি। সেই উৎসাহ কতখানি কাজে লেগেছিল তা পরবর্তী সময়ে নিজেদের আত্মজ স্থিরচিত্রগুলিতে ধরে রেখে গিয়েছেন দুই বোন। ইদানিং Candid Photography বলতে আমরা যা বুঝি, মনোবীণা ও দেবলীনা ত্রিশের দশকেই তার উৎকৃষ্ট নমুনা দেখাতে পেরেছিলেন।

Illustrated Weekly of India-তে প্রকাশিত মনোবীণা রায়ের ফটোগ্রাফি

১৯৩৭ থেকে ১৯৪০-এর মধ্যে ফটোগ্রাফার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন দুই বোন। দেবলীনা ও মনোবীণার ফটোগ্রাফ তাঁদের নামে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে, ‘সচিত্র ভারত’ জার্নালে। ১৯৩৭ সালেই প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা বিমল রায় (Bimal Roy)-কে বিয়ে করেন মনোবীণা। সেই থেকে তিনি হলেন- মনোবীণা রায় (Manobina Roy)। অন্যদিকে, ১৯৪৬ সালে পড়াশোনা শেষ করে নীতিশ চন্দ্র মজুমদার নামে এক শিল্পপতিকে বিয়ে করে দেবলীনা হলেন- দেবলীনা মজুমদার (Debalina Majumdar)।

মনোবীণা রায়ের তোলা দেবলীনা মজুমদারের পোর্ট্রেট

তাঁদের ছবি নিয়মিত প্রকাশিত হত ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে। মনোবীণা বিমল রায়ের সঙ্গে দেশ বা বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় যখন যেতেন সেখানকার মানুষ, প্রকৃতি, জীবনযাত্রার ছবি লেন্সবন্দি করতেন।

১৯৫৯ সালে জুরিখে এই ছবিটি তোলেন মনোবীণা

মনোবীণা ক্যামেরায় ধরেছিলেন বিখ্যাত সব ব্যক্তিত্বদের। ছবি তুলেছিলেন জহরলাল নেহরুর, রবীন্দ্রনাথের। ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথের একটি ছবি তোলেন। রবীন্দ্র-প্রয়াণের দশ বছর পর, ১৯৫১ সালে ছবিটি প্রকাশিত হয় বিশ্বভারতীর ‘টোয়েন্টিফাইভ পোর্ট্রেটস অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর’-এ। বইটিতে যে একমাত্র মহিলা ফটোগ্রাফারের উল্লেখ আছে, তিনি মনোবীণা রায়।

১৯৫১ সালে প্রকাশিত ‘টোয়েন্টিফাইভ পোর্ট্রেটস অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর’-এর সূচিপত্রে মনোবীণা রায়ের তোলা ছবির উল্লেখ

দেবলীনা মজুমদার থাকতেন কলকাতাতেই। পরবর্তীকালে ‘ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল’-এর সেক্রেটারি মনোনীত হয়েছিলেন।

দেবলীনা মজুমদারের তোলা ছবি

মনোবীণা বা দেবলীনা, দুই বোনের কেউই কৃত্রিম আলোয় ছবি তুলতে পছন্দ করতেন না। তাঁদের প্রায় সব ফটোগ্রাফিই দিনের আলোয়। শুধু তাই না, প্রাকৃতিক আলো কীভাবে কাজে লাগাতে হবে, তা ভালো মতোই আয়ত্ত করেছিলেন। তাঁদের তোলা ছবি দেখলেই একথা টের পাওয়া যায়। যেমন নীচের ছবিটা:

সবুজ বনানীর ভিতর দাঁড়িয়ে রয়েছেন একাকী এক মহিলা, তাঁর মুখ সূর্যের দিকে ফেরানো। আর প্রভাকরও যেন তার সবটুকু আলো দিয়ে শুধু তাঁকেই লক্ষ্য করছেন। এমন এক সন্ধিক্ষণের ছবি তুলেছেন দুই বোনের একজন। কে তুলেছেন তা সঠিক জানা যায় না কারণ, ছবিতে যে মহিলা রয়েছেন তাঁর মুখ দেখা যাচ্ছে না। মনোবীণা না দেবলীনা, কে তুলেছিলেন এই ছবি? দুজনের কেউ একজন তুলেছেন, এটুকুই জানা যায়।

মনোবীণা রায়ের তোলা ছবি

মনোবীণা রায়

বোম্বের মাউন্ট মেরি রোডের একটি পার্সি বাংলোতে থাকতেন রায় দম্পতি। সেই বাংলোর একটি হলঘরে পিয়ানো, বেশ কিছু পেইন্টিং-এর সঙ্গে ছিল দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো প্রমাণ সাইজের একটি ফটোগ্রাফ। মিস্টার রায়ের। ছবিটি তুলেছিলেন মিসেস রায় অর্থাৎ মনোবীণা। পরিচালক অনীক দত্ত (Anik Dutta) মনোবীণা ও দেবলীনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “ছবিটা এত রিয়েলিস্টিক আর বড়ো ছিল যে খুব গা ছমছম করত। দুম করে দেখলে মনে হবে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যদিও ছবিটা ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট। এটা আমার মনে হয় সবথেকে ইন্ট্রিগিং ছবি বিমল রায়ের, হাতে জ্যাকেট আর সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ‘মধুমতী’ ছবির শ্যুটিংয়ের সময় তোলা। এবং আরও একটু কাছ থেকে দেখলে দেখা যায় যে দিদিমার ছবি, মানে মনোবীণা রায়ের নিজের ছায়াটা ওঁর গায়ে কিছুটা পড়েছে। …এটা অন্য মাত্রা দেয় ছবিটাকে।” অনীকবাবু বর্ণিত ছবির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় নিচের ছবিটির (যদিও ছবিটিতে বিমল রায়ের হাতে কোনও জ্যাকেট নেই, শুধু সিগারেট)।

মনোবীণার লেন্সে বিমল রায়

যদুনাথ ভবন মিউজিয়াম অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার আয়োজিত প্রদর্শনীতে দর্শকদের গাইড করছেন অধ্যাপিকা-ইতিহাসবেত্তা তপতী গুহঠাকুরতা

ওয়াকিবহল মহলে তাঁদের নামডাক থাকলেও, সেভাবে কখনই প্রচারের আলোয় আসেনি অভূতপূর্ব ফটোগ্রাফগুলি। ২০২২-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মনোবীণা ও দেবলীনার ফটোগ্রাফি প্রদর্শনীর আয়োজন করে যদুনাথ ভবন মিউজিয়াম অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার (Jadunath Bhavan Museum and Resource Centre)। তখন অনেকেরই নজরে আসে দুই বোনের অবিস্মরণীয় কীর্তি, যেখানে তাঁরা সৃষ্টি করেছেন ফটোগ্রাফির নতুন ভাষা। সে ভাষার দৃশ্যকল্প নজর কাড়ে, ভাবায়, মননকে অভিনব রসে সিঞ্চিত করে। এবং শোনায় আলো-ছায়া মাখানো মুহূর্তদের উপাখ্যান।

__________________________

তথ্যঋণ: https://quod.lib.umich.edu/ | pinterest.com | enterpix.in | Jadunath Bhavan Museum and Resource Centre | সাক্ষাৎকার: অনীক দত্ত | The Hindu

Written by