ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধির নিরাময় কীভাবে সম্ভব! প্রশ্ন তুলছেন অপর্ণা সেন

আগামী ১ মে নন্দন ১-এ প্রদর্শিত হবে অপর্ণা সেনের ‘দ্য রেপিস্ট’

ই সমাজে ধর্ষক কীভাবে তৈরি হয় – চলচ্চিত্রের মোড়কে অত্যন্ত সাবলীলভাবে প্রশ্নটি তুলছেন অপর্ণা সেন (Aparna Sen) তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবি ‘দ্য রেপিস্ট’ (The Rapist)-এ। ধর্ষণ এক সামাজিক ব্যাধি। ব্যাধির কীভাবে নিরাময় সম্ভব, তা দেখাতে গিয়ে মিসেস সেন ধর্ষকের মনস্তত্ব ভেঙেছেন – গড়েছেন। এ সংক্রান্ত লেখার জন্য কিছু তথ্যের সন্ধানে আন্তর্জালিক মাধ্যমে পেয়ে গেলাম গা শিউড়ে ওঠার মতো কিছু তথ্য। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে ভারতে পুলিশের কাছে ধর্ষণজনিত কেস জমা পড়েছিল ৩২,৫০০টি। অনুমান করা যেতে পারে, প্রতিদিন ৯০টি ধর্ষণ কাণ্ড। দ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (The National Crime Records Bureau) ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর এই রিপোর্ট পেশ করে। যেখানে এ-ও বলা হয়, প্রতিবছর প্রায় ৩৫৯,৮৪৯ কেস জমা পড়ে, যা প্রধানত নারীদের প্রতি মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার এবং অন্যান্যকে কেন্দ্র করে। ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। এটাই বাস্তব চিত্র। যেখানে নারীমুক্তি বা নারী-স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার হন দেশের গুণীজনেরা, রাস্তায় নামেন, মিছিল হয়, বক্তৃতা সভা হয়; কিন্তু তাদের প্রতি অত্যাচারের গ্রাফ প্রতিবছর বাড়তে থাকে। হ্যাঁ, এই ‘উদারমনস্ক’, ‘প্রগতিশীল’ সমাজেই। এ এক কঠিন ব্যাধি। এ অসুখ সারানোর জন্য পুলিশ, প্রশাসন করা হলেও উপায় খুঁজে বের করা যায় না। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর মতো সাহসটুকুও নেই অসংখ্য নির্যাতিতার। পরিবারের ভয়ে, সমাজের ভয়ে তাঁরা মুখ কামড়ে পড়ে থাকেন ঘরের এক কোণে।

‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর পর এখনও পর্যন্ত অপর্ণা সেনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবি হতে চলেছে ‘দ্য রেপিস্ট’। যেখানে নির্যাতিতা, ধর্ষক এবং অপরাধবিদ্যার অধ্যাপক – তিন মানুষের তিনরকম মনস্তত্ব অত্যন্ত দক্ষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অপর্ণা সেন।

পুরুষতন্ত্র এখনও মাথাচাড়া দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখনও অসংখ্য মানুষ ‘মেয়েছেলে’ বলতে অভ্যস্ত, নারীসুলভ পুরুষদের ‘মেয়েলি’ অথবা ‘লেডিজ’ বলতে অভ্যস্ত, তথাকথিত স্রোতের বাইরে কোনো কাজ করলেই ছেলেদের শুনতে হয় ‘মেয়ে নাকি!’ কিংবা ‘হাতে চুড়ি পরে বসে থাকো’ ইত্যাদি। যা দৈনন্দিন জীবনে প্রায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। কথা বলা বা সোচ্চার হওয়ার লোক খুব কম। একালের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার ভরা জনসভায় যখন হাতে চুড়ি পরে বসে থাকার কথা বলেছিলেন ‘মুখ ফসকে’ – সমাজের এক অংশের মানুষ তা ভালো চোখে নেননি এবং সেটাই সুস্থতার লক্ষণ। আসলে আমরা কী করি, কী ভাবি তা নিজেদের খেয়াল থাকে না অনেকসময়, যা প্রধানত অসচেতনতার ফসল। ব্যক্তিগতভাবে আমার এহেন অজ্ঞতা দূরীকরণের উপায় জানা নেই। বইয়ের পড়াশোনার বাইরেও হয়তো এক সাংস্কৃতিক চর্চার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্ব বা গরিবপ্রধান দেশগুলোর সবচেয়ে বড়ো ব্যাধি বোধহয় শিক্ষার অভাব। যদিও সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ধর্ষণকাণ্ডে বিশ্বে প্রথম স্থানাধিকারী দেশটির নাম আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ প্রথম বিশ্ব আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে। এই রিপোর্টের পাশে ভারত তো তুচ্ছ।

অপর্ণা সেনের ‘দ্য রেপিস্ট’ এই এতগুলো প্রশ্নের সন্ধান দিচ্ছে। ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’(Mr. & Mrs. Iyer)-এর পর এখনও পর্যন্ত অপর্ণা সেনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবি হতে চলেছে ‘দ্য রেপিস্ট’। যেখানে নির্যাতিতা, ধর্ষক এবং অপরাধবিদ্যার অধ্যাপক – তিন মানুষের তিনরকম মনস্তত্ব অত্যন্ত দক্ষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অপর্ণা সেন। ছবিতে প্রশ্ন তোলা হয়, মৃত্যুদণ্ডের বৈধতা নিয়েও। এই ছবি তাই শুধুমাত্র নির্যাতিতার কাহিনিচিত্র হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে ধর্ষকের উন্মাদচিত্র। যে চরিত্রে ভারতীয় চলচ্চিত্র আবিষ্কার করবে অভিনেতা তন্ময় ধনানিয়াকে। ধর্ষিতা কেন প্রকাশ্যে এসে বিচারের দাবি করতে ভয় পান? কেনই বা লজ্জায় মুখ ঢাকতে হয়? সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, ধর্ষণ কেন হয়? এই ছবিতে সেসবেরই সন্ধান মিলবে।

এর আগেও অপর্ণা সেন চলচ্চিত্রের ভাষ্যে নিয়ে এসেছেন সামাজিক রাজনীতি। ২০০২ সালে নির্মিত ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’ ছবিতে দেখিয়েছিলেন বিভাজনের রাজনীতি। যেখানে জাত-ধর্ম প্রধান হয়ে দাঁড়াচ্ছে ‘আধুনিক’ সমাজব্যবস্থায়। দুই বছর আগে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ঘরে বাইরে আজ’-এ এই একই চিত্র দেখিয়েছেন আরও সোচ্চার কণ্ঠে।

ধর্ষণের রাজনীতি আজকের নয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ এক সামাজিক ক্ষয়। সবসময়ই নিজের মতো করে গল্প বলতে চেয়েছেন অপর্ণা। তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষ্যে আমরা পেয়েছি মেয়েদের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান। স্বাধীন ভারতের মেয়েদের তিনি নানাভাবে ভেঙেছেন গড়েছেন। যেমন ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর ভায়োলেট স্টোনহ্যাম বা নন্দিতা রায়, ‘পরমা’-‘পারমিতা’ কিংবা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর মীনাক্ষি আইয়ার, ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’-এ সন্ধ্যা ও মিয়াগে, ‘সোনাটা’-র তিন অবিবাহিত মহিলা প্রত্যেকেই একা। কিন্তু অসহায় নন। তাঁদের দিয়ে লড়িয়েছেন সাহসী অপর্ণা। লড়াইয়ের নতুন খোঁজ দিলেন ‘দ্য রেপিস্ট’ ছবিতেও।

‘সারি রাত’, ‘সোনাটা’-র পর ‘দ্য রেপিস্ট’ অপর্ণার তৃতীয় হিন্দি ছবি। একটি সাক্ষাৎকারে অপর্ণা সেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, চলচ্চিত্রে সৃজনশীলতা এবং স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর মত কী? উত্তরে অপর্ণা বলেছিলেন, শুধু সিনেমা নয় প্রতিটি ক্ষেত্রে এগুলিকে দমন করা হচ্ছে। কেউ দেশের সমালোচনা করলেই ‘দেশদ্রোহী’ হয়ে যায় না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সকলের থাকা উচিত। কারণ এই স্বাধীনতা আমাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। ‘দ্য রেপিস্ট’ দর্শকদের আশাহত করবে না।

ছবিতে অভিনয় করেছেন কঙ্কনা সেনশর্মা (Kankana Sen Sharma), অর্জুন রামপাল (Arjun Rampal), তন্ময় ধনানিয়া (Tanmay Dhanania)। গতবছর বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য রেপিস্ট’ আ উইন্ডো অন এশিয়ান সিনেমা বিভাগে কিম জিসেওক পুরস্কার পান অপর্ণা সেন। এই ছবির চিত্রনাট্যের বড়ো শক্তি হল বাস্তবের চালচিত্র এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ। নির্ভয়া ধর্ষণকাণ্ডের একটা সুদীর্ঘ ছায়া এই ছবিতে লক্ষ্য করা যায়। সমীক্ষায় দেখা যায়, ভারতে ১০০ জন নারীর মধ্যে ৯৮ জনই আত্মহত্যা করেন। এই ছবি হেঁটেছে আত্মহত্যার বিপ্রতীপে। বরং সোচ্চার কণ্ঠ অনেকবেশি জোরালো হয়ে উঠেছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ছবিতে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসংগীত ‘গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে, আর কোলাহল নাই’-এর একটি চমৎকার হিন্দি সংস্করণ রাখা হয়েছে। গানটি গেয়েছেন হরিহরণ। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২২-এ ‘দ্য রেপিস্ট’ প্রদর্শিত হবে আগামী ১ মে নন্দন ১-এ বিকেল সাড়ে চারটেয়।

Developed by DXDasia