৩৬ চৌরঙ্গী লেন : স্বাধীন ভারতে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের অবস্থান চেনাচ্ছেন অপর্ণা সেন

দুই কেকের মধ্যিখানে ভায়োলেটের একটুকরো গল্প এই ছবির মূল কেন্দ্র

ভায়োলেট (জেনিফার কেন্ডাল) এক মধ্যবয়সী মহিলা। থাকে ৩৬ চৌরঙ্গী লেনের এক বিল্ডিঙের ফ্ল্যাটে। সে একটা গার্লস স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। তার সহোদর এডি (জিওফ্রি কেন্ডাল) বৃদ্ধাশ্রমে থাকে। তার ভাইঝি রোজমেরি (সোনি রাজদান) বিয়ে করে এখন স্বদেশে। সে স্বদেশ রোজমেরির এবং ভায়োলেটেরও। সেখান থেকে রোজমেরি চিঠি লেখে পিসিকে। তার পরিবারের আরো অনেকে চিঠি লেখে, টেলিফোনে যোগাযোগ রাখে তার সঙ্গে। কিন্তু সকলেই নানা উপনিবেশের প্রান্তে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষ। পাশাপাশি আপন কেউ নেই তার, এক পোষা বিড়াল স্যাটোবি ছাড়া – একটা পুরুষ বিড়াল। ভায়োলেটের যৌবনে এক পুরুষ ছিলো, কিন্তু বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সে যুদ্ধের শহীদ। ভায়োলেটের ভিতরে চোরাস্রোত বয় একটা বিয়ের স্বপ্নের। বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধাদের দেখে তার ভয় হয়; সে তো সেদিকেই; ভবিষ্যৎ তবে কোথায়? কী পেয়েছে সে জীবনে? যুদ্ধ বিচ্ছেদ আর বিদেশবাস ছাড়া! একলা মানুষ। স্কুলে শেক্সপিয়ার পড়ায় আর বাড়িতে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে বলতে শেক্সপিয়ার আওড়ায়।

১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। ইংরেজরা দেশ ছেড়ে পালালো। ইংরেজ কি বাঘ-ভাল্লুক, যে দেশ ছেড়ে দৌড়ে পালাবে? কতগুলো প্রজন্ম ধরে ব্রিটেনের বহু নাগরিক পেশার কারণে এদেশে এসে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করে। এখানে ফ্যামিলি-ট্রির ডাল-পালা ছড়ায়। দেশীয় মহিলাদের সঙ্গে বিয়ে হয় ইংল্যান্ডের যুবকের। পরে পরে দেশীয় পুরুষের সঙ্গে মহিলাদের। এক ধরনের মিশ্র জাতির ফ্যামিলি-ট্রির মূল এদেশ থেকে ওদেশে ছড়িয়ে। আমরা তাদের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বলি। এতই সোজা তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া! কলকাতা-মাদ্রাজের রাস্তায় রাস্তায় এদের এখনও আনাগোনা। তারা ভারতীয়। কিন্তু সেটা আপাত ভারতীয়রা হজম করতে পারে না।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। চাকরি নেই। বেকার যুব। সুযোগ মতো অ্যাংলো যুবক-যুবতী ছুটলো বিদেশে। কিন্তু যারা ভায়োলেটের মতো, যাদের স্মৃতির বিরাট অংশ এই দেশ – তারা কোথায় যাবে?

ছবিতে মিস ভায়োলেট স্টোনহ্যাম চরিত্রে জেনিফার কেন্ডাল

ইংরেজ-সংস্কৃতির পর্ক, হ্যাম, সসেজ, পাউরুটি, কেক, কাঁটা-চামচ, বাথটব, গ্রামোফোন-জ্যাজ — কী নিইনি তাদের! আমরা গ্রহণ করেছি সংস্কৃতি। এ সবই তো উপনিবেশের চাপিয়ে দেওয়া ছিল না। কিছু তো স্বেচ্ছায়। ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। চাকরি নেই। বেকার যুব। সুযোগ মতো অ্যাংলো যুবক-যুবতী ছুটলো বিদেশে। কিন্তু যারা ভায়োলেটের মতো, যাদের স্মৃতির বিরাট অংশ এই দেশ – তারা কোথায় যাবে? সিনেমা শুরু হচ্ছে সেমিট্রি থেকে। বংশানুক্রমিক মৃতের কবর। কে একজন ১৮০১-১৮৬৯। ভায়োলেটের পূর্বজ। তার শেকড়। ভায়োলেটের আবাসনে প্রতিবেশীদের ঘরে হিন্দি গান বাজে। ভায়োলেট তাতে অভ্যস্থ। রাস্তায় বাজারে সে হিন্দি বলতে অভ্যস্থ। কলকাতা শহরে একা চলতে অভ্যস্থ।

ধৃতিমান ও দেবশ্রী, ছবির অন্যতম দুই স্তম্ভ

একদিন অপর্ণা সেন একটি চিত্রনাট্য পড়ালেন সত্যজিৎকে। অপর্ণার নিজের লেখা। সত্যজিৎ উৎসাহিত করলেন তাকে সেটা নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্য। এবং অপর্ণা সেন প্রথম পরিচালক হিসেবে বেরিয়ে এলেন একটা ইংরেজি সিনেমার হাত ধরে – যদিও তার ভূগোল কলকাতা মহানগরী। নাম 36 Chowringhee Lane (৩৬ চৌরঙ্গী লেন)। চৌরঙ্গী লেনের প্রধান চরিত্র ভায়োলেট।

একদিন ময়দানের কাছে ভায়োলেটের পুরোনো ছাত্রী নন্দিতার (দেবশ্রী রায়) সঙ্গে দেখা। পাশে তার বয়ফ্রেন্ড সমরেশ (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়)। তাদের বাড়িতে ডাকে ভায়োলেট। কিনে আনে একটা কেক। সেও এক শীতকাল। এমনিই বড়োদিন-নতুন বছরের মেজাজ কলকাতায়। এ সূত্রেই বলা যায়, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কলোনিগুলোতে এখনও প্রায় ১২ দিন আগে থেকে বড়োদিনের আয়োজন শুরু হয়।

একাকিত্ব এবং প্রেম

একদিন অপর্ণা সেন একটি চিত্রনাট্য পড়ালেন সত্যজিৎ রায়কে। অপর্ণার নিজের লেখা। সত্যজিৎ উৎসাহিত করলেন তাকে সেটা নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্য। এবং অপর্ণা সেন প্রথম পরিচালক হিসেবে বেরিয়ে এলেন একটা ইংরেজি সিনেমার হাত ধরে – যদিও তার ভূগোল কলকাতা মহানগরী।

নন্দিতা-সমরেশ খুঁজছিল লুকিয়ে প্রেম করার মতো নির্ঝঞ্ঝাট জায়গা। তারা ভায়োলেটকে মিথ্যে বলে প্রতি দুপুরে তার অনুপস্থিতিতে তার ফ্ল্যাটে সময় কাটাতে চায়। কাটায়। স্বজনহীন ভায়োলেট একে সহজ আন্তরিকতায় গ্রহণ করে। সে ক্রমশ ভুলতে থাকে তার ভাইয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা, ওদেশের কথা – চিঠি উড়ে পড়ে টেবিলের নিচে। পড়া হয় না। একদিন এডি মারা যায়। কিন্তু ভায়োলেট নানাভাবেই উপভোগ করতে থাকে যুবক-যুবতীর সঙ্গ। এবং একটা দৃশ্যে আমরা দেখি, ভায়োলেট উল বুনছে চেয়ারে। বাইরে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি। আর স্যাটোবি গুটোনো উল নিয়ে খেলতে খেলতে উলে জড়িয়ে যাচ্ছে। এ জড়ানো ভায়োলেটের মনের, এদেশ-ওদেশের জড়ানো। সিনেমায় প্রথম থেকেই এই বিড়াল ভায়োলেটের লিবিডোর প্রতীক, তার সম্পূর্ণ ভিতর মনের। যাকে নন্দিতা-সমরেশ বাথটবে ছুঁড়ে দেয় সঙ্গমের সময়। যেন ভায়োলেটকেই ছুঁড়ে দিচ্ছে। তারপর নন্দিতা-সমরেশের বিয়ে হয়। সমরেশ ভায়োলেটের পূর্বপুরুষের স্মৃতি, গ্রামোফোনটা উপহার চেয়ে নেয়। তারপর আবার ভায়োলেট ফ্ল্যাটে একা।

৩৬ চৌরঙ্গী লেন (১৯৮২)

দেখতে দেখতে ক্রিসমাস আসে। ভায়োলেটের মনে পড়ে সমরেশ তার হাতের বানানো কেক খেতে চেয়েছিল। ফোন করে। সেদিন সমরেশ-নন্দিতার বাড়িতে পার্টি হবে। সেখানে ‘বুড়ি’ ‘আ ফিশ আউট অব ওয়াটার’ হবে বলে মনে করেছে সমরেশ। তাকে আবার ‘কাটিয়ে’ দিয়েছে মিথ্যে বলে (তারা বাড়িতে থাকবে না)। ততদিনে তাদের বড়ো বাড়ি, ‘বুড়ি’র প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এখন তাকে বিদায় করলেই তারা মুক্ত হতে পারে।

তবু ভায়োলেট ক্রিসমাসের কেক বানিয়ে নিয়ে যায়। গায়ে ওভারকোট। পরে হলেও খাবে – এই ভেবে। কিন্তু গিয়ে দেখে ভিতরে প্রচুর হল্লা, আলো! জ্যাজ। তারই দেওয়া গ্রামোফোন আর রেকর্ডস। কেঁপে ওঠে। এগিয়ে যায়। জানলার কাচে কুয়াশা। হাত দিয়ে মুছে ভিতরে তাকায়। সমরেশ তার বন্ধুকে বলছে এই গ্রামোফোন সে কোনো এক অ্যান্টিক শপ থেকে কিনেছে। এই দেখে-শুনে ভায়োলেট নিজের ‘জলের বাইরে’র অবস্থান টের পায়। ফেরে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে রাতে একা দাঁড়ায়। একটা রাস্তার কুকুর এসে কাপড় বাঁধা কেকটায় মুখ দেয়। আর ভায়োলেট বলে, এখানে নয়, তাকে খেতে হবে অন্য কোথাও। আর মুখে অনর্গল আওড়ে যায় কিং লিয়ারের সংলাপ। সে এগিয়ে চলে, কুকুরটা কেক শুঁকতে শুঁকতে তার পিছন পিছন।

ছবির পোস্টার

আসলে, দুই কেকের মধ্যিখানে ভায়োলেটের একটুকরো গল্প 36 Chowringhee Lane। একপ্রান্তে ভায়োলেটের এ দেশ-কাল-সমাজকে গ্রহণ; অন্যদিকে, এ দেশ-কাল-সমাজের ভায়োলেটকে বর্জন। ঔপনিবেশিক শক্তি থেকে পেয়েছি, নিয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতার পর তারা জায়গা চাইলে, আমরা দিতে পেরেছি? তাদের দারিদ্র্য বেড়েছে; তাদের একাকিত্ব বেড়েছে। তবু, তাদের হয় ভয় পেয়ে এসেছি, নয় ঘৃণা। স্বাধীন ভারতে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের অবস্থান চিনিয়ে দিয়েছিলো এই সিনেমা, সেই আটের দশকের শুরুতেই।

কিন্তু অপর্ণা সেন পরিচালিত এ সিনেমা বাণিজ্যসফল হয়নি সে সময়। প্রোডিউসার শশি কাপুর এতে হতাশ হন। যদিও, গুণী মানুষের নজর এড়াতে পারেনি এ সিনেমা। জিতে নিয়েছিলো একাধিক জাতীয় পুরস্কার। নমিনেশন পেয়েছিল বিদেশের প্রতিযোগিতাতেও।
 

Developed by DXDasia