৭৬ বছর পূর্ণ করলেন কিংবদন্তি ‘মিস ক্যালকাটা’

যাঁরা বাংলা ছবির সংজ্ঞা পাল্টে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অপর্ণা সেন

‘বসন্ত বিলাপ’ ছবিতে পশ্চিমি পোশাক পরে এক উজ্জ্বল তরুণী নেচে উঠছেন, গাইছেন “আমি মিস ক্যালকাটা নাইনটিন সেভেনটি সিক্স, এখনও তো কেউ জানে না আমার স্ট্যাটিস্টিক্স” – তাঁর নাচের সঙ্গে সঙ্গে নেচে উঠেছিল বহু পুরুষ। পশ্চিমি পোশাকে এমন স্বতঃস্ফূর্ত নাচ সেযুগের বাংলা ছবিতে নতুন একটা অধ্যায়। আক্ষরিক অর্থেই সেই তরুণী মিস ক্যালকাটা। অপর্ণা সেন। বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি শিল্পী। অভিনয় ছাড়াও যিনি পরিচালনার কাজে সুদক্ষ। অপর্ণা সেন যখন পরিচালনায় আসেন, ভারতবর্ষে তখন মহিলা পরিচালকের সংখ্যা ছিল নেহাৎ কম।

প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়-এর হাত ধরে ‘তিন কন্যা’র সমাপ্তির মধ্যে দিয়ে অভিনয় জগতে এসেছিলেন অপর্ণা। পরবর্তীতে কাজ করেছেন ‘জনঅরণ্য’, ‘পিকু’ ও ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে। মৃণাল সেন-এর ‘আকাশকুসুম’, ‘একদিন আচানক’, ‘মহাপৃথিবী’-তেও অভিনয় করেছিলেন। বড়োপর্দার সেই সময়কার তুখোর ‘স্টার’দের সঙ্গে চুটিয়ে কাজ করেছেন অপর্ণা। উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিতাভ বচ্চন, শশী কাপুর, শত্রুঘ্ন সিন্‌হা কে না নেই সেই তালিকায়!

দেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ে বরাবর সোচ্চার অপর্ণা সেন। রাজনীতির বহু পালাবদল দেখেছেন চোখের সামনে। এমনকি তাঁর পরিচালনাতেও বারবার উঠে এসেছে যুদ্ধ ও দাঙ্গা বিধ্বস্ত মানুষের গল্প, জায়গা পেয়েছে নারীবাদের আসল মনস্তত্ত্ব। অপর্ণা বারবার বলেন, ফেমিনিস্ট না হয়ে আন্দোলন হিউম্যানিস্ট হতে পারত। বারবার তাই নারীবাদকে নিজের মতো করে ভেঙেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন, কখনও নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেন। নারীবাদ আন্দোলনের সময় যে ক্ষিপ্রতা, যে গতির প্রয়োজন ছিল তা সাধারণ জীবনে এসে হয়তো অন্য রূপ নেয়। একটি সংবাদপত্রে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অপর্ণা সেন বলেছিলেন, “আমার মনে হয়, যাঁরা সারা জীবন প্রাণ দিয়ে সংসার করেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা অর্থনৈতিক ভাবে সমমর্যাদা পান না। তবে মেয়েরা আজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। সমাজের সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করে নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। আর শুধু মেয়েদের কেন, পরিবারের কাঠামোরও বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। আজকাল কিন্তু পরিবার মানে সেই চিরাচরিত কয়েকটি সম্পর্কের সহাবস্থান নয়। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা-ভাই-বোন, শ্বশুরবাড়ি বাপের বাড়ি — এভাবে মানুষ বসবাস করছে না। যে যার সঙ্গে সুবিধেজনকভাবে জীবন কাটাতে পারবে, তার সঙ্গেই থাকছে। হয়তো দু’টি মেয়ে বা দু’টি ছেলে, তারা হয়তো ‘লেসবিয়ান’ বা ‘গে’ নয়, বা হতেও পারে — একসঙ্গে থাকছে। অথবা আরও নানা স্ট্রাকচারে মানুষ বসবাস করছে। কোনও কোনও পরিবারে আবার দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী ও দু’জনেরই মা-বাবা একসঙ্গে থাকছেন। সমাজের সামগ্রিক চেহারাটাই পাল্টাচ্ছে। আর ‘নারী’ সেখানে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আলাদা করে প্রকট নয়।”

‘পারমিতার একদিন’-এ তিনি দেখিয়েছেন শাশুড়ি-বৌমার চিরন্তন বন্ধুত্ব। এখানে দুটো আলাদা প্রজন্ম গুরুত্ব পায়নি, গুরুত্ব পেয়েছে অসমবয়সের বন্ধুত্ব। পাশাপাশি না থাকলেও জীবনের প্রত্যেকটি চিন্তা গ্রাস করছে সেই বন্ধুত্বে। অচেতনে কেউ কাঁধে হাত রাখছে, চুলে বিনুনি করে দিচ্ছে, ব্লাউজ খুলে কখনও পিঠে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। এই অপর্ণাই আবার ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এ আরও সোচ্চার হচ্ছেন। ভারতের একমাত্র সত্য যে মানবতাবাদ, তা এই ছবিতে প্রকট হয়ে উঠছে। সেখানে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে রাজনীতি, তাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছিলেন। অন্যদিকে ‘সোনাটা’ ছবিতে তিন বন্ধুর গল্প বলতে গিয়ে বর্ণনা করেছেন কর্পোরেট মেট্রো সিটির রঙে তাদের জীবন কতটা রঙিন আর কতটা অন্ধকারময়।

মিস ক্যালকাটার আজ ৭৬তম জন্মদিন। যাঁরা বাংলা ছবির সংজ্ঞা পাল্টে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অপর্ণা সেন। এই বয়সেও ছবি বানিয়ে যাচ্ছেন, অভিনয় করছেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন – একরোখা জেদি অপর্ণা চিরকাল মানুষের সঙ্গে মিশে মানুষের সাইকোলজিটাকে বোঝবার চেষ্টা করেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষা জারি রাখুক প্রতিবাদ। লাস্যময়ী অপর্ণার ভাষা বারবার ধাক্কা দিক দর্শকদের।

Developed by DXDasia