কার্শিয়াং নামের আড়ালে ভোরের তারা আর সাদা অর্কিডের স্মৃতি

নিসর্গ বদলায়, বদলে যায় লেপচাদের দেওয়া পুরোনো নামও

কার্শিয়াং বলতেই প্রথমে কী মনে পড়ে? পাইন পাতার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে ঘাসে। উচ্ছল হেসে উঠছে ঝর্না। উত্তাল হয়ে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে খালি পায়ে গাইতে গাইতে নেমে যাচ্ছেন অনিল চট্টোপাধ্যায়। তাঁরই লিপে জর্জ বিশ্বাসের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানের সুর-ধ্বনি-শব্দেরা যেন আলিঙ্গন করছে অপার প্রকৃতিকে। দূরে আকাশের গায়ে ঝকঝক করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ‘কোমল গান্ধার’ সিনেমার এই সমস্ত দৃশ্যকেই আশ্রয় দিয়েছিল কার্শিয়াং। দার্জিলিং-এর আগে আমাদের বড়ো কাছের এক ছোট্ট হিলটাউন। দার্জিলিং হয়তো পাহাড়ের রানি, কিন্তু কার্শিয়াঙেরও আলাদা নেশা আছে। তাছাড়া, দার্জিলিং যেভাবেই যেতে চান না কেন, কার্শিয়াংকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

দার্জিলিংকে পুরোদস্তুর শৈলশহর হিসেবে গড়ে তোলার সময় কার্শিয়াংকে এড়িয়ে যেতে পারেনি ব্রিটিশরাও। অবশ্য তাদের আসার আগে এই ছোট্ট পাহাড়ি অঞ্চলটি ছিল সিকিম রাজার অধীনে, কিছুদিনের জন্য গোর্খারাও দখল নিয়েছিল। তারপর, অবশেষে ব্রিটিশরা মালিকানা পেল কার্শিয়াঙের। তখন কার্শিয়াঙের নাম ছিল ‘খর্সং’। ব্রিটিশদের উচ্চারণে এদেশের প্রায় সব অঞ্চলের নামই বদলেছে, বলা ভালো বিকৃত হয়েছে। খর্সং-ও উচ্চারণ বদলে হয়ে গেল কার্শিয়াং। আর, এই ‘খর্সং’ নামের আড়ালে আছে কার্শিয়াঙের বহু পুরোনো লেপচা-বসতির ইতিহাস।

আকাশের গায়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা

উত্তরবঙ্গের নানা পার্বত্য অঞ্চলের মতো কার্শিয়াঙেরও আদি অধিবাসী লেপচারা। তখনো দার্জিলিং-এ শহরের চিহ্নমাত্র নেই। গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে জাপান থেকে আনা ধুপি পাইন থুড়ি ক্রিপ্টোমারিয়া জাপানিকার অস্তিত্বও নেই। পাহাড়ের আদিম পথ জুড়ে দৈত্যাকার ওক, চেস্টনাট, ম্যাগনোলিয়া গাছেরা সেজে আছে মস আর অর্কিডিগুচ্ছে। গোটা অঞ্চলই বনে ঢাকা। বনের নিচে হাইড্রোজেনিয়া, তার ওপরে ফার্ন, লতা-পাতা, নাম না-জানা ছোটো ছোটো ফুল। এক-একটা গাছের ডাল যেন নিঁখুত বাগান। মার্চ-এপ্রিলে ম্যাগনোলিয়া গাছে ফুল আসে। গোলাপি ফুলে ভরে ওঠে হাইড্রোজেনিয়ার শাখাও। আর ফোটে জ্যোৎস্নার মতো সাদা রঙের এক অর্কিড। সেই সাদা ফুল যেন বরফের বিছানার মতো বিছিয়ে থাকে কার্শিয়াং-এর পাহাড়-বন জুড়ে। স্থানীয় লেপচারা এই অর্কিডের নাম দিয়েছিল খুর্সন।

আর, সাদা অর্কিডে সাজানো এই পাহাড়ের নাম তারা দিল ‘খর্সং’। সাদা অর্কিডের দেশ। অবশ্য, ‘খর্সং’-এর একটা অন্য অর্থও আছে—ভোরের তারা। সকালে যখন ফুল ফোটে, তখন মনে হয় আকাশের তারারা নেমে এসেছে মাটিতে। পাহাড় জুড়ে তারার শয্যা। অলস জাতি হিসেবে লেপচাদের দুর্নাম চিরকালের। আলস্য মাঝে মাঝে এমন কাব্যিক কল্পনারও জন্ম দেয় বটে।

সাদা অর্কিডের দেশ ‘খর্সং’ তখন সিকিমরাজের অধীনে। ১৭৮০-তে নেপালিরা এই অঞ্চলের দখল নেয়। তারপর, ১৮১৪-১৭তে গোর্খা যুদ্ধে ব্রিটিশদের হাতে পরাজিত হয়ে খর্সং-এর মালিকানা হারিয়েও ফেলে। কিন্তু, খর্সং, দার্জিলিং-এর এই পার্বত্য প্রদেশকে নিজেদের হাতে না রেখে ‘তিতালিয়া চুক্তি’র মাধ্যমে ব্রিটিশরা এর মালিকানা ফিরিয়ে দেয় সিকিমরাজ চোগিয়ালকে। কিন্তু, ততদিনে এই সবুজ বনে ঢাকা, ‘হোম ওয়েদার’-এর ঘোর বুনে দেওয়া অঞ্চল দেখে লোভ জন্মে গেছে ব্রিটিশদের। ১৮৩৫ সালে অসুস্থ ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য একটি স্বাস্থ্যনিবাস গড়ার উদ্দেশ্যে বাৎসরিক ৩০০০ টাকার বৃত্তির বিনিময়ে সিকিমরাজের থেকে দার্জিলিং দানপত্র হিসেবে লিখিয়ে নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। একইসঙ্গে খর্সং-ও অধিকারে আসে তাদের।

শৈলশহর বানানোর জায়গা হিসেবে শুরু থেকেই দার্জিলিং প্রথম পছন্দ ছিল ব্রিটিশদের। সেই মতো তোড়জোড়ও শুরু হল। বন-বাদাড় সাফ করে বসতি নির্মাণের জন্য পাহাড়ের ঠিক নিচের সমতল থেকে কালো চামড়ার কুলি-মজুর-শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া শুরু হল দার্জিলিং-এ। তখন তিতালিয়া থেকে পাঙ্খাবাড়ি হয়ে দার্জিলিং যাওয়ার একটাই পথ। সেই পথের মাঝেই পড়ে খর্সং। এতটা পথে মাথা গোঁজার ছাউনিও নেই। এভাবে এতটা দূরে শৈলশহর গড়ে তোলা কঠিন। ব্রিটিশরা বুঝল মাঝে আরেকটা ছোটো আস্তানা গড়ার প্রয়োজন। ৪,৭৮৩ ফুট উঁচুতে খর্সং দেখে ভারি পছন্দ হল তাদের। খর্সং থেকে সামান্য আগে পিছনে তাকালে দেখা যায় গোটা সমতলভূমি আর সামনে আকাশচুম্বী হিমালয়। এক আশ্চর্য বৈপরীত্যকে সন্ধিতে বেঁধে গাছ-ফুল-বন-পাহাড়ে ছেয়ে রয়েছে এই অঞ্চল। দেখে প্রেমে না পড়ে উপায় নেই।

ওই আঁকাবাঁকা পথ

দার্জিলিং যাওয়ার নতুন রাস্তা বানানো শুরু হল। হিল কার্ট রোডের কাজ শেষ হল ১৮৬১-তে। দার্জিলিং জমজমাট হতে শুরু করল ক্রমশ। তার আগেই ১৮৫৭-তে খর্সং-এর মকাইবাড়িতে পোঁতা হয়ে গেছে চা-গাছের চারা। দার্জিলিং চায়ের নাম ছড়িয়ে পড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা তখন। হু হু করে বদলে যেতে লাগল খর্সং। ততদিনে অবশ্য নামও বদলে ‘কার্শিয়াং’ হয়ে গেছে তার। বদলাতে শুরু করেছে তার নিজস্ব নিসর্গও। জাপান থেকে আনা ধুপি পাইনের চারা রোপণ শুরু করে দিয়েছে ব্রিটিশরা। কার্শিয়াং থেকেই এখন ইতিউতি চোখে পড়ে পাইন। আর বছর তিরিশ-চল্লিশের মধ্যে শুধুই পাইন দেখা যাবে এই অঞ্চলে। প্রায় হারিয়েই যাবে এই অঞ্চলের বার্চ, ওক, ম্যাগনোলিয়ার পুরোনো বন।

এরপর, আরো কত বদল দেখবে কার্শিয়াং। দেখবে টয় ট্রেন। আদি অধিবাসী লেপচাদের থেকেও সংখ্যায় বেড়ে যাবে নেপাল থেকে আসা গোর্খারা। সাদা অর্কিডের দেশ ক্রমে হয়ে উঠবে টাউন। চার্চ, স্কুল, কলেজ, জেলখানা। একের পর এক হোটেল, খেলনাবাড়ি। শুকনা, চুনাভাট্টি, রংটং হয়ে ঘুরে আসা সাবেক হিলকার্ট ছাড়াও পাঙ্খাবাড়ি আর রোহিণী হয়ে আরো দুটো বাইপাস এসে মিশবে কার্শিয়াঙেই। যেভাবেই যাও, দার্জিলিং যেতে হলে এই শহরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অবশ্য সোনাদার ওপরে ঘুমন্ত মিলিটারি রোড রয়েছে। কিন্তু, ও পথে আর কেই বা পা বাড়ায় এখন!

কার্শিয়াং থেকে উঁকি দিলেই সমতল

বদলাতে বদলাতে নিজের পুরোনো আদলকেই হয়তো আর চিনতে পারে না কার্শিয়াং। তবু, এখনো সন্ধের মুখে দার্জিলিং-এর ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে তার পুরোনো নাম ধরে ডাকে ড্রাইভাররা—খর্সং খর্সং। মুছে যাওয়া নাম এভাবেই বেঁচে থাকে। ঋতু এলে গাছগাছালির গায়ে যেভাবে বেঁচে ওঠে সাদা অর্কিডেরা। আকাশের গায়ে ঘুমন্ত বুদ্ধ কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো কিছু কিছু জিনিস কখনোই বদলায় না। কুয়াশা ঘেরা কার্শিয়াং-এর উঁচু-নিচু পথ, ঢেউ খেলিয়ে নেমে যাওয়া ঢাল, ঈগল’স ক্রেগ পাহাড়ের চুড়োটা জানে এই কথা। নাম তো মানুষই দেয়। এইসব পাহাড়ের বয়স তো সেই নামের ইতিহাসের চাইতেও অনেক অনেক প্রাচীন।

Developed by DXDasia