
শরৎ বসু ও নেতাজির গোপন ঠিকানা ছিল এই বাড়িটি
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তখন কার্শিয়াং-এর গিদ্দা পাহাড়ে। সালটা ১৯৩৭ সালের ১৯ অক্টোবর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেতাজিকে চিঠি লিখেছেন। তাতে ‘বন্দেমাতরম’ গানের প্রসঙ্গ টেনে এনে কবি লিখছেন, “বন্দেমাতরম গানের কেন্দ্রস্থলে আছে দুর্গার স্তব। একথা এতই সুস্পষ্ট যে এ-নিয়ে তর্ক চলে না। অবশ্য বঙ্কিম এই গানে বাংলাদেশের সঙ্গে দুর্গাকেও একাত্ম করে দেখিয়েছেন। কিন্তু স্বদেশের এই দশভূজা মূর্তি রূপের যে পূজা যে কোনও মুসলমান স্বীকার করে নিতে পারে না। …কিন্তু যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষের সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের মিলন ক্ষেত্র সেখানে এ গান সর্বজনীন ভাবে সঙ্গত হতেই পারে না। …বন্দেমাতরম প্রবন্ধটি কৃষ্ণ কৃপালিনীর লেখা। বিশ্বভারতীর কাগজে তিনি এটা প্রকাশ করবেন আমি জানতুম না। বিশ্বভারতীর সঙ্গে এই আলোচনার কোনও যোগ নেই।” এই নিয়ে জহরলালকে তিনি পত্র লিখবেন এই কথা ছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে এই চিঠি লিখলে তার জবাবও দিয়েছিলেন নেতাজি। কিন্তু তাঁর সেই জবাবের হাতের লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। চিঠিটির বিভিন্ন স্থান অস্পষ্ট থাকায় তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এই চিঠিটি ছাড়া নেতাজির লেখা আরও চিঠি সেখানে সযত্নে রাখা আছে। পাহাড়ের বাসিন্দাদের সমস্যা নিয়ে নেতাজি যে আন্তরিক ছিলেন সেটাও ফুটে উঠেছে তাঁর আর একটি চিঠিতে।
কার্শিয়াং-এর গিদ্দা পাহাড়ে নেতাজি স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিতে এসব মূল্যবান ঐতিহাসিক চিঠি ছাড়া নেতাজির অনেক ছবি আছে। নেতাজি এখানে এসে মর্নিংওয়াক করতে বের হতেন। পাগলাঝোরাতে পাহাড়ি ঝর্নার ধারে নেতাজির মর্নিংওয়াকের ছবিও আছে এখানে। বসু পরিবারের সঙ্গে নেতাজির তোলা অনেক ছবিও আছে। তার বাইরে নেতাজির ব্যবহার করা খাট, ড্রেসিং টেবিল, লেখাপড়ার টেবিল, চেয়ার সবই আছে। নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসু ১৯৩৪ সালে ক্যামেলিয়া গাছ সেখানে লাগিয়েছিলেন। আজও তা রয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন
কেমন আছে দার্জিলিং-এ নিবেদিতার বাড়ি?
নেতাজি ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজের তত্ত্বাবধানে সেই ঐতিহাসিক বাড়ি এখন নেতাজি মিউজিয়াম। তার দায়িত্বে রয়েছেন গণেশ প্রধান। আর সেখানে কেয়ারটেকার হিসাবে রয়েছেন পদমবাহাদুর ছেত্রি। তাঁদের কাছ থেকেই জানা গিয়েছে, নেতাজির দাদা স্বাধীনতা সংগ্রামী শরৎচন্দ্র বসু এই বাড়িটি ১৯২২ সালে কিনে নেন সেই সময়ের অসম পুলিশের ডেপুটি সুপার পিটার লেসলির কাছ থেকে। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাড়িটি বসু পরিবারের অধীনে ছিল। ১৯৯৭ সালে রাজ্য সরকার বাড়িটি সংস্কার করে। নতুন মিউজিয়াম আকারে বাড়িটি ২০০০ সালে উদ্বোধন হয়। ১৯৩৬ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত নেতাজি এই বাড়িতে ব্রিটিশের হাতে গৃহবন্দি ছিলেন। হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণ এই বাড়িতে বসেই লিখেছিলেন নেতাজি। এখান থেকে গান্ধীজি ও জহরলাল নেহেরুকেও তিনি চিঠি লিখেছিলেন। বসু পরিবারের সদস্যরা প্রতি বছর গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে এই বাড়িতে এসে সময় কাটাতেন। আর সেই বসু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেতাজিও এসেছেন বেশ কয়েকবার। ১৯২২ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত তার তথ্য আছে সেখানে। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত শরৎ বসুও এখানে অন্তরীণ ছিলেন বলে খবর। নেতাজি এখানে গৃহবন্দি থাকার সময় চৌকিদারের মাধ্যমে গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে অনেক নির্দেশ পাঠিয়েছেন। আবার এই বাড়িতে বসেই নেতাজি ভাইপো ভাইঝিদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছেন। তাদের দোলনায় চড়িয়েছেন। বসু পরিবারের সদস্য শিশির বসু, কৃষ্ণা বসুদের কাছ থেকে ১৯৭৩ সালে প্রতিদিন ২ টাকা হাজিরায় এই বাড়ি দেখভালের কাজ পান পদমবাহাদুর ছেত্রি। ১৯৯৬ সালে রাজ্য সরকার এটি সংস্কারের দায়িত্ব নেয়।
পদমবাহাদুরের বয়স এখন আশির কাছাকাছি। রোজ সকালে সেই বাড়িতে নেতাজিকে ধুপধুনো দিয়ে দিন শুরু করেন পদম বাহাদুর। নেতাজি আজ না থাকলেও তার ছবি দেখেই মনে করেন পদম, নেতাজি জীবিত আছেন। তিনি একাই পুরো বাড়ি বা মিউজিয়াম দেখাশুনা করেন।
