১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর এই বাড়িতেই দেহ রেখেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা
১২ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিবস। স্বামীজির অন্যতম শিষ্যা ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। মহীয়সী এই নারীর জন্মের দেড়শো বছর পালন উপলক্ষ্যে এখন নানান অনুষ্ঠান চলছে দেশ জুড়ে। ‘নিবেদিতা’ নামটি উচ্চারণ করলেই চলে আসে দার্জিলিং-এর নাম। কারণ তিনি দার্জিলিং-এ ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর দেহ রেখেছিলেন। দার্জিলিং-এর লেবং কার্ট রোডের তেনজিং রকের কাছে থাকা রায় ভিলা আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে।
নিবেদিতা সাত বার দার্জিলিং এসেছিলেন। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি রাজ্য সরকার সংস্কার করে এখন অন্য রূপ দিলেও নিবেদিতার ব্যবহার করা কোনও সামগ্রীই নেই সেখানে। দার্জিলিং পুরসভার তথ্য অনুযায়ী, ১৯০১ সালে এই বাড়িটি তৈরি হয়েছিল। এটি তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর ভায়রাভাই ডাঃ দ্বারিকানাথ রায়। আইরিশ মহিলা নিবেদিতা এখানে মূলত গরমের সময়েই আসতেন। জগদীশ চন্দ্র বসুর ‘প্লান্ট রেসপন্স’ বইয়ের সম্পাদনার কাজ নিবেদিতা এই বাড়ি থেকেই করেছিলেন। তাছাড়া জগদীশ চন্দ্র বসুর অনেক বিজ্ঞান বিষয়ক লেখাতেও নিবেদিতার নাম পাওয়া যায়। নিবেদিতার চিঠি থেকে সেসব জানা যায়। খ্রিস্টান হওয়া সত্ত্বেও নিবেদিতার ইচ্ছা অনুসারে তাঁর দেহ দার্জিলিং-এর রেল স্টেশনের নিচে মুর্দা হাটে দাহ করা হয়েছিল। বাড়িটি সমতল থেকে ৬৩০০ ফুট উঁচুতে। বিভিন্ন সময় এই ঐতিহাসিক বাড়ি হাতবদল হয়েছে। ১৯৫৪ সালে এই বাড়িতেই হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের কার্যালয় তৈরি হয়। সেই সময় ১৯৫৪ সালের ৪ নভেম্বর জহরলাল নেহেরু এবং ইন্দিরা গান্ধী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসেন। ১৯৫৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর এইচএমআই এটি ছেড়ে চলে যায়। তারপর চিনের যুদ্ধের পর এটি তিব্বতি রিফিউজিদের আস্তানা হয়। তার আগে ১৯৪৮ সালে এটি একবার দার্জিলিং গভর্নমেন্ট কলেজের ছাত্রাবাস হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে তিব্বতি রিফিউজিরা এই বাড়ি থেকে চলে যায়। এরপর ১৯৮৪ সালে সুবাস ঘিসিং এর সময় এটি সিআরপিএফ-এর শিবির হয়ে ওঠে। ১৯৯৭ সালে এটি ডিজিএইচসি-র ইয়ুথ হোস্টেল হয়। ২০০৭ সালে পাহাড়ে বিমল গুরুঙ্গের দাপট শুরু হলে এটি জিএলপির ত্রিবেণী রঙ্গিত ট্রেনিং ক্যাম্প হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন
রবীন্দ্রনাথের চোখে ভগিনী নিবেদিতা
২০১৩ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াসে এই বাড়ি রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে হস্তান্তরিত হয়। সেখানকার একটি অংশ জিটিএ-কে ইয়ুথ হস্টেলের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ১০ জুলাই উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব এই বাড়ির চাবি রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত বর্তমান রামকৃষ্ণ মিশন নিবেদিতা শিক্ষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের হাতে তুলে দেন। আর ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন রূপে এই বাড়ির উদ্বোধন করেন। মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে এক কোটি, পরে আরও এক কোটি টাকা দেন এর সংস্কারের জন্য। এই কেন্দ্রের সম্পাদক স্বামী নিত্যসত্যানন্দ জানালেন, তারা একেবারে ভাঙাচোরা অবস্থায় বাড়িটি পেয়েছিলেন। সেই বাড়িতে আজ মোট ২২টি কক্ষ। যে ঘরে নিবেদিতা দেহ রেখেছিলেন সেই ঘর এখন সুন্দর করে সংরক্ষণ করে রাখা আছে। তার সঙ্গে আছে একটি প্রার্থনা ঘর। একটি ঘরকে বিরাট মিউজিয়ামের আকার দেওয়া হচ্ছে পর্যটকদের জন্য।
নিবেদিতা বারবার পাহাড়ে এসে ঘুরতে বের হতেন। নিবেদিতা স্মরণে সেখানকার মিউজিয়ামকে আরো ভাল করার চেষ্টা হচ্ছে। এর জন্য সেই কেন্দ্র থেকে সরকারের কাছে আরও আর্থিক সাহায্য চাওয়া হয়েছে বলে স্বামী নিত্যসত্যানন্দ জানালেন। তিনি বলেন, ভারতবর্ষ সম্পর্কে অদ্ভুত ধারণা ছিল নিবেদিতার। ভারতের পতাকার প্রথম একটি ছবি তিনিই এঁকেছিলেন। তার মধ্যে বজ্রের চিহ্ন ছিল। নিবেদিতা বিশ্বাস করতেন, ত্যাগই হল ভারতের মূল কথা। তিনি দার্জিলিং-এর গ্রামের রাস্তায় হাঁটার সময় অনেককে প্রশ্ন করতেন, এখানে মেয়েরা পড়াশুনা কম করে কেন, কেন তারা এত পরিশ্রম করে। এসব অনেক লেখা দিয়েও সাজিয়ে তোলা হয়েছে নতুন রূপের এই ঐতিহাসিক বাড়িকে।