
সম্পত্তি ভাগাভাগির পর সাড়ে পাঁচ আনা জমিতে বানানো হল পুঠিয়া রাজবাড়ি
বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে যাঁরা একটু-আধটু নাড়াচাড়া করেছেন, তাঁরা সবাই জানেন যে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার জমিদারদের মধ্যে একটা আড়াআড়ি বিভাজন ঘটিয়ে দিয়েছিল। একদিকে ছিলেন আদি জমিদারেরা, যাঁরা সেই মধ্যযুগ থেকে বংশ পরম্পরায় গ্রাম বাংলার রাজস্ব আদায় করতেন, আরেক দিকে ছিলেন শহুরে টাকাওয়ালা বাবু শ্রেণির কিছু মানুষ, জমি ছিল যাঁদের কাছে টাকা বিনিয়োগের একটা জায়গা মাত্র। আজ যাঁদের গল্প বলতে চলেছি, তাঁরা সেই মুঘল আমল থেকে পূর্ব বাংলায় জমিদারি চালাতেন। আমার গল্পটা অবশ্য সেই জমিদারদের নিয়ে নয়, তাঁদের বাড়িটা নিয়ে। তবে সেই প্রসঙ্গে আসার আগে ওঁদের সম্পর্কে অল্প কিছু তথ্য জেনে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। তান্ত্রিক সাধক বৎসাচার্যের ছেলে পীতাম্বরকে সম্রাট আকবর লস্করপুরের জমিদারি প্রদান করেছিলেন, পীতাম্বরের মৃত্যুর পর জমিদার হন তাঁর ভাই নীলাম্বর। এরপর থেকে নীলাম্বরের বংশ পুঠিয়ার রাজবংশ নামে পরিচিত। নীলাম্বরকে সম্রাট জাহাঙ্গির ‘রাজা’ উপাধি দেন বলে একটি জনশ্রুতি আছে। আরেকটি মত অনুযায়ী, দিল্লির সম্রাটের থেকে ‘রাজা’ উপাধি পেয়েছিলেন নীলাম্বরের ছোটো ছেলে আনন্দরাম।

আমার গল্পের শুরু এই বংশের মহারানি শরৎসুন্দরী দেবীর থেকে। রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায়ের স্ত্রী এই ভদ্রমহিলা ছিলেন ওই যুগের বিদুষী নারীদের অন্যতম। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শরৎসুন্দরীকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিতেন। তাঁর দত্তক নেওয়া ছেলে যতীন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে বিয়ে হয় হেমন্তকুমারী দেবীর। ১৮৯৫ সালে মহারানি হেমন্তকুমারী দেবী তাঁর শাশুড়ি মহারানি শরৎসুন্দরী দেবীর সম্মানে তৈরি করিয়েছিলেন পুঠিয়ার বিখ্যাত রাজবাড়ি। এই বাড়ি নিয়েই আজকের গল্প। রাজবাড়ির সামনে পূর্ব আর পশ্চিমে রয়েছে দু’টো গাড়িবারান্দা আর ফটক। দোতলা বাড়িটার সামনে উত্তর দিকে খোলা উঠোনে রয়েছে এক দোলমঞ্চ। বাড়ির সামনে একটানা বারান্দা থেকে পেছনের বিশাল হলঘরে ঢোকার রাস্তা রয়েছে। গাড়িবারান্দার সামনে রয়েছে দু’টি ঝুলবারান্দা। ঝুল বারান্দার ছাদ দোতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা তিনটে থামের ওপর দাঁড় করানো। বারান্দা দু’টোয় ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। কাছারির উত্তর দিকে একতলার ঘরটা ছিল ট্রেজারি অফিস। জমিদারের সঙ্গে প্রজারা যাতে দেখা করতে পারেন, তার জন্য একটা হলঘর তৈরি করা হয়েছিল। উঠোনের পূর্ব আর পশ্চিমের ঘরগুলো ব্যবহৃত হল মহাফেজখানা হিসেবে।
এই বাড়িটার আরেক নাম পাঁচ-আনি রাজবাড়ি। নামের একটা ইতিহাস রয়েছে। পুঠিয়ার রাজা অনুপনারায়ণের চার ছেলে – নরেন্দ্রনারায়ণ, রূপেন্দ্রনারায়ণ, মোদননারায়ণ এবং প্রাণনারায়ণ। অনুপনারায়ণের মৃত্যুর পর বড়ো ছেলে নরেন্দ্রনারায়ণ চেয়েছিলেন গোটা সম্পত্তি আত্মস্যাৎ করতে। কিন্তু বাকি তিন ভাইয়ের চাপে সম্পত্তিকে সমান চার ভাগ করতে বাধ্য হন। তারপর নরেন্দ্রনারায়ণ জ্যেষ্ঠত্বের দাবি জানালে অন্য তিন ভাই নিজেদের অংশ থেকে আধ আনা করে বড়ো ভাইকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ শেষমেশ সম্পত্তি ভাগাভাগিতে বড়ো ভাই পান সাড়ে পাঁচ আনা আর বাকি ভাইরা প্রত্যেকে সাড়ে তিন আনা করে। এই সাড়ে পাঁচ আনা জমির ওপরেই পুঠিয়ার রাজবাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। পাঁচ-আনি রাজবাড়ি থেকে একটু দূরে শ্যামসাগর দীঘির দক্ষিণপাড়ে রয়েছে চার-আনি রাজবাড়ি। এই বাড়িটার প্রধান ফটক এবং কাছারি আধভাঙা অবস্থায় থাকলেও বাকি অংশ এখন পুরো ভেঙে গেছে।

পাঁচ-আনি রাজবাড়ির উঠোনে রয়েছে চৌকো আকারের গোবিন্দ মন্দির। মন্দিরের ঠিক মাঝখানে আছে গর্ভগৃহ আর চার কোণে চারটে ছোটো ঘর। মন্দিরে ঢোকার মূল রাস্তাটা পশ্চিমদিকে। দেওয়াল আর স্তম্ভে সাজানো রয়েছে দেবদেবী, ফুল, হাতি, ঘোড়া, শিকার, যুদ্ধ ইত্যাদির পোড়ামাটির সাজসজ্জা। বড়ো শিব মন্দির রয়েছে পুঠিয়া বাজারের শুরুতে শিবসাগর দীঘির দক্ষিণ পাড়ে। সিঁড়ি সহ মন্দিরের প্রধান দরজা দক্ষিণদিকে। বড়ো শিব মন্দিরের পূর্ব দিকে পুঠিয়া বাজারের মধ্যে রয়েছে চৌকো কাঠামোর চার তলা জগন্নাথ মন্দির বা রথ মন্দির। স্থানীয় মানুষ এই মন্দিরকে ‘হাজারদুয়ারি’ নামে ডাকেন। লোকমুখে শোনা যায়, জমিদার ভুবেন্দ্রনারায়ণ তাঁর কিশোরী স্ত্রীর সঙ্গে লুকোচুরি খেলার জন্য এই মন্দির বানিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে পুঠিয়া রাজবাড়িতে চালু হয় ডিগ্রি কলেজ, এখন যেটা লস্করপুর ডিগ্রি বিদ্যানিকেতন নামে পরিচিত।
তথ্যসূত্র –
১) রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং রাজশাহী পরিচিতি – কালীনাথ চৌধুরী
২) Tour Today Bangladesh
৩) jagonews24.com
৪) pepeelika.com
৫) সচলায়তন
