বাংলার মন্দির স্থাপত্য

অম্বিকা কালনা এই তিনতলা বিশিষ্ট পঁচিশরত্ন মন্দির

হাওড়া থেকে অম্বিকা কালনা স্টেশনের দূরত্ব ৮২ কিলোমিটার। স্টেশনের পূর্বদিক দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ভাগীরথী। আর এই নদীর তীরেই অবস্থিত কালনা শহর। অম্বিকা কালনার রাজবাড়ির মন্দির চত্বরের পূর্ব দিকে অবস্থিত কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। ১৬৭৩ শকাব্দে (১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে) বর্ধমানরাজ ত্রিলকচন্দ্রের মা লক্ষ্মীকুমারী এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরটি উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত। দক্ষিণমুখী এই মন্দির তিনতলা বিশিষ্ট পঁচিশরত্ন মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রধান সিংহাসনে রয়েছেন কৃষ্ণচন্দ্র, রাধা ও তাঁর চারসখীর বিগ্রহ। উচ্চতা যথাক্রমে ২ ফুট ৬ ইঞ্চি (৭৬ সেমি) ও ২ফুট (৬১ সেমি)। সবগুলি মূর্তিই কাঠের তৈরি।

মন্দিরের প্রথম তলের ছাদ ধনুরাকৃতি। ছাদের চারটি কোণে পর্দার আকারে খানিকটা উঁচু করে দেওয়াল তোলা। সেই দেওয়ালে দেখা যায় চুন-সুরকির বড় আকৃতির হাতি ও সিংহের মূর্তি। ঐ পর্দা-দেওয়ালের উপরেই উঁচু করা কোণগুলিতে আছে ৩টি করে চারকোণে মোট ১২টি চূড়া। গোটা মন্দিরের ১২+৮+৪+১ করে পঁচিশটি চূড়া আছে।

মন্দিরের সামনে সন্নিবদ্ধ রয়েছে একটি ‘একবাংলা’ মণ্ডপ। এটি পরিদর্শন কক্ষ রূপে ব্যবহৃত হয়। গর্ভগৃহের সামনে ত্রিখিলান দালান। তোরণগুলির তিনটি খিলান ধারণের জন্য মধ্যে দুটি পূর্ণ স্তম্ভ ও ধারে দুটি অর্ধ স্তম্ভ রয়েছে। স্তম্ভগুলিতে ফুলকারি নকশা ছাড়াও আছে টেরাকোটার অলংকরণ। অন্যান্য টেরাকোটার অন্যান্য মূর্তির মধ্যে একটি প্যানেলে দেখা যায় সপরিবারে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনীকে। খিলানগুলির উপর প্রতীক শিব-মন্দির ও তার মধ্যে শিবলিঙ্গ। গর্ভগৃহে মূল দ্বার একটি। মন্দিরের পূর্ব দিকে আছে ত্রিখলান সজ্জা। অলিন্দ নেই। দুটি জানলা। পশ্চিম দিকে ত্রিখিলান সজ্জা বিশিষ্ট ভোগ কক্ষ। দুটি জানলা ও একটি দরজা। কিন্তু কোনও অলিন্দ নেই। পিছনে ত্রিখিলান ভরাট করা। কোন দরজা বা জানলা নেই। উত্তর দিকের ভিতরে রয়েছে সিঁড়ি। ঐ সিঁড়ি উঠে গেছে ৩য় তলে।

মন্দিরের সামনে দেওয়ালে স্তম্ভের গায়ে, চাল-মণ্ডপটির সর্বত্র রয়েছে অজস্র টেরাকোটা মূর্তি ও ফুলকারি নকশা। মূল মন্দিরের সামনের দেওয়ালে কার্নিসের নিচ পর্যন্ত খোপে খোপে অসংখ্য মূর্তিফলক বসানো। ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে ‘কল্পলতা’ বা ‘মৃত্যলতা’ কে দেওয়ালের কোণে বা গায়ে খাড়া করে লাগানোই প্রচলিত রীতি। এখানেও কোণের দুপাশে তা সমতলভাবে নিবদ্ধ এবং তা একতলার কার্নিস পর্যন্ত উঠে গেছে। (কল্পলতা হল উপর থেকে নিচে লতার মত কোণাচ। হাতি, সিংহ, লতা-পাতা অরণ্যের প্রতীক। এইভাবে মন্দির হয় অভীষ্ট ফলপ্রদ ‘কল্পতরু’। আবার সমস্ত মায়ার মৃত্যু ঘটায় বলে একে ‘মৃত্যুলতা’ও বলা হয়।) শুধুমাত্র টেরাকোটা প্রাচুর্য নয়, বিষয়বস্তুর বৈচিত্র, সুন্দর সুন্দর টেরাকোটা মূর্তি ও ফুলের নকশা যা এই মন্দিরে রয়েছে তা উচ্চমানের বলা যায়। ধর্মীয় ও সামাজিক দৃশ্যের ফলকগুলির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য অশ্বমেধ যজ্ঞ, বকাসুর বধ, নৌকাবিলাস, যুদ্ধচিত্র, বন্দুকধারী ফিরিঙ্গি সৈন্য, শিকার দৃশ্য, ভয়ংকর সিংহের উপর কোন দেব দেবীর দণ্ডায়মান অবস্থায় যুদ্ধ প্রভৃতি। তবে টেরাকোটাগুলির বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে বা হতে চলেছে। পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর দিকের দেওয়ালের গায়ে রয়েছে ফুলকারি নকশা, এগুলিতে কোন মূর্তিসজ্জা নেই।

মন্দিরের বিগ্রহ নিত্য পূজিত। মন্দিরে সকালে ভোগ দেওয়া হয় মাখন ও মিছরি দিয়ে। মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ।

Developed by DXDasia