
হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরের টেরাকোটা আজও শিল্পরসিকদের মুগ্ধ করে
রাজা বিক্রমাদিত্যকে নিয়ে নানান মজাদার গল্প কখনও বই আকারে, কখনও অ্যানিমেশনে কচিকাঁচাদের জন্য পাওয়া যায়। বিক্রম-বেতাল আর বত্রিশ সিংহাসনের গল্প এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। বিক্রম বেতালের মূল সংস্কৃত বইটার নাম ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, আর বত্রিশ সিংহাসনের আদি নাম ‘সিংহাসন দ্বাত্রিংশিকা’ বা ‘দ্বাত্রিংশৎ পুত্তলিকা’। এই গল্পগুলোর বেশ কয়েকটাতে আছে শালিবাহন নামের এক ব্যক্তির কথা। ইতিহাসে শালিবাহন নামের কোনো রাজা বা বীর যোদ্ধা ছিলেন, এরকম কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, শালিবাহন আসলে ‘সাতবাহন’ শব্দের পরিবর্তিত রূপ। গুপ্ত শাসনের আগে যে শালিবাহন শাসকরা রাজত্ব করতেন, তাঁদের নামের অপভ্রংশ মিশে আছে বিভিন্ন প্রাচীন লোককথায়। বিক্রমাদিত্যের রোমাঞ্চকর গল্পগুলোর উৎসও এই জনশ্রুতিগুলো। বাংলার লোককথাতেও শালিবাহনের নাম রয়েছে। আজকে এমন একটা প্রাচীন মন্দিরের গল্প শোনাব, জনশ্রুতি অনুযায়ী যেটা তৈরি করেছিলেন রাজা শালিবাহন। বর্ধমান জেলার এই প্রায় ভেঙে পড়া মন্দিরটি স্থানীয় মানুষদের কাছে সাতদেউল নামে পরিচিত।

সাতদেউলে যদি কেউ সড়ক পথে যেতে চান, তাহলে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে কলকাতা থেকে বর্ধমানের দিকে চলতে চলতে থামতে হবে পালসিটে। পাশেই বাঁ দিকে মশাগ্রাম রেল স্টেশন, আর ডান দিকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা গম্বুজের মতো যে স্থাপত্য চোখে পড়বে, সেটাই সাতদেউল। আর ট্রেনে যেতে হলে নামতে হবে মশাগ্রাম অথবা মেমারি স্টেশনে। মেমারি স্টেশন থেকে চকদীঘি রোড মশাগ্রাম স্টেশনের ধার ঘেঁষে পশ্চিমে চলে গিয়েছে তারকেশ্বরের দিকে। চকদীঘি রোড দিয়ে যেতে যেতে কেন্নাঘোষপাড়া থেকে উত্তরে ঘুরলে রাস্তা গিয়ে আঝাপুরের সাতদেউলে পড়েছে। স্থাপত্যটি রাজা শালিবাহনের তৈরি করা বলে স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেন ঠিকই, তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুমান, এটি তৈরি হয়েছে খ্রিস্টীয় দশম শতকে। বাংলায় তখন পাল রাজাদের শাসন ছিল।
যে গ্রামে এই মন্দিরটি রয়েছে, তার নাম দেউলিয়া। নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ বইয়ে জায়গাটির নাম উল্লেখ আছে ‘সাত দেউলিয়া আঝাপুর’। ডেভিড ম্যাকাচ্চন তাঁর ‘Late Medieval Temples of Bengal’ বইতে এই মন্দিরের উল্লেখ করেছেন ‘সাতদেউলিয়া’ নামে। নামেই বোঝা যাচ্ছে এই মন্দিরটি দেউল রীতির স্থাপত্য। প্রাচীন ভারতের মন্দির শিল্পে বাংলার অবদান এই দেউল রীতি। দেউল শব্দটা এসেছে ‘দেবালয়’ থেকে। খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যে বাংলায় দেউল স্থাপত্যরীতির উন্মেষ ঘটেছিল। তারপর তুর্ক-আফগান যুগে এই রীতির আরও সমৃদ্ধ প্রকাশ দেখা যেতে থাকে। দেউল রীতির আবার চার রকমের শৈলী আছে – রেখা বা শিখর দেউল, ভদ্র বা পীড় দেউল, স্তূপযুক্ত পীড় বা ভদ্র দেউল আর শিখরযুক্ত পীড় বা ভদ্র দেউল। রেখা বা শিখর রীতির একটি ধ্রুপদী নিদর্শন এই সাতদেউল মন্দিরটি। দেউল রীতির মন্দিরগুলির মধ্যে এই পোড়া মাটির তৈরি এই মন্দির সবচেয়ে উঁচু, এর উচ্চতা ২৩ মিটারের সামান্য বেশি।

লোককথা অনুযায়ী, রাজা শালিবাহন এখানে সাতটি মন্দির তৈরি করিয়েছিলেন। তারপর হাজার বছরের অযত্নে ছ’টি মন্দির গিয়েছে হারিয়ে। কীভাবে যে সেগুলো লুপ্ত হয়ে গেছে তা কেউ জানে না। এখন ভাঙা অবস্থায় মাত্র একটা মন্দিরই টিকে আছে। মন্দিরটার ভিত পঞ্চরত্ন আলেখ্যে তৈরি। চারদিকে রয়েছে বাঁকানো টাওয়ার আর সামনের দরজাতে ধনুকের মতো ক্রমশ বেড়ে যাওয়া খিলান রয়েছে। বাইরে রয়েছে চৈত্য-জানলা। মন্দিরের গায়ে ইটে খোদাই করা ভাস্কর্য পাওয়া গেলেও ভেতরে কোনো মূর্তি পাওয়া যায়নি। এর ফলে মন্দিরে যে কার উপাসনা করা হত, তা একেবারেই স্পষ্ট নয়। কারো মতে এটি ছিল জৈন মন্দির, আবার এটি বৌদ্ধ মন্দির ছিল বলেও লোকমুখে শোনা যায়। এখন গোটা স্থাপত্যটিরই তত্ত্বাবধান করে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI)। কোনো এক ছুটির দিনে এই প্রাচীন মন্দিরে ঘুরেই আসতে পারেন একবার।
ছবি সূত্র – কুণালকান্তি সিংহরায়
