বাদশাহি শরিফাবাদের ইতিহাস ঘুমিয়ে শের আফগানের সমাধিতে

জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন বর্ধমানের জায়গিরদার শের আফগান…

বর্ধমানের কার্জন গেট সবাই চেনে। কার্জন গেট থেকে রাজবাটী পর্যন্ত গেছে বি.সি রোড। রাজবাটীর উত্তর ফটক যেদিকে, সেদিক দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলে আলমগঞ্জ এলাকা। এখানেই শের আফগানের সমাধি। কে শের আফগান? এক কথায় বলে দেওয়া যায় মুঘল আমলে বর্ধমানের জায়গিরদার। কিন্তু গল্প এটুকুই নয়…

শের আফগান, আলি কুলি খাঁয়ের জন্ম পারস্যদেশে। কমবয়সে তৎকালীন শাসক সফবীর বংশের ইসমাইল মির্জার সফর্চি (খাবার পরিবেশক) হিসেবে নিযুক্ত হন। ইসমাইল মির্জা মারা যেতে আলি কুলি সব ছেড়েছুড়ে পালান। মুলতানে চলে আসেন। শক্তসমর্থ, ভালো যোদ্ধা হওয়ায় মুঘল সেনায় কাজ পেয়ে যান। অল্প দিনেই দায়িত্বনিষ্ঠ আলি কুলি কিছু জমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও পেয়ে যান মুঘল উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের সুনজরে থাকার জন্য। পদোন্নতি হয়। এবার একেবারে লাহোরের বাদশাহি কোর্টে। এখানেই মুঘল সম্রাট আকবরের সংস্পর্শে আসেন আলি কুলি খাঁ। ক্রমেই সম্রাটের ঘনিষ্ঠ বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠেন। আকবরের ছেলে সেলিমের বন্ধুস্থানীয় ও বিশ্বস্ত অনুচরের মত ছিলেন আলি কুলি। সেলিমের সঙ্গেই একদিন শিকারে বেরিয়ে সেলিম বাঘের আক্রমণের মুখে পড়লে তার প্রাণ বাঁচান আলি কুলি। তার 'শের আফগান' উপাধি এই ঘটনার জন্যই। 

‘আফগান’-এর সঙ্গে আফগানিস্থানের কিন্তু কোনও সম্পর্ক নেই। পারসিক ভাষায় ‘আফগান’-এর অর্থ 'কব্জা করে যে'। শেরকে কব্জা করেছিলেন বলে তিনি ‘শের আফগান’। আলি কুলি খাঁ ১৫৯৪-তে বিয়ে করেন মেহরুন্নিসাকে। এই বিয়ের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন স্বয়ং আকবর। মেহেরুন্নিসাকে বিয়ের জন্য নাকি পাগল হয়ে উঠেছিলেন সেলিম। কিন্তু, বংশ-মর্যাদার কথা ভেবে আকবর চাননি মেহেরুন্নিসার সঙ্গে তাঁর ছেলের বিয়ে হোক। বরং তিনি মেহেরুন্নিসার সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলেন প্রিয়পাত্র আলির। বাদশাহের কথা ফেলার কোনও কারণই ছিল না আলির। অতএব, তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় মেহেরুন্নিসার।  

এরপর ১৬০৫-তে আকবরের বিরুদ্ধাচরণ করে সেলিম (জাহাঙ্গীর) সিংহাসনে বসেন। বিশ্বস্ত আলি কুলি কিন্তু আকবরের পক্ষ ত্যাগ করেননি। ফলে, জাহাঙ্গিরের সঙ্গে তাঁর বিবাদেরও সূত্রপাত এখান থেকেই। সিংহাসনে বসে জাহাঙ্গীর আলি কুলিকে লাহোর থেকে সুদূর বর্ধমানে পাঠান। জাহাঙ্গীরের সৎ ভাই সুবেদার কুতুবউদ্দিনের অধীনে বর্ধমানের জায়গিরদার হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। নতুন জায়গায় নিযুক্ত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আলি কুলি খাঁর বিরুদ্ধে কর ফাঁকি দেওয়া ও বৈদেশিক আফগানদের সাহায্য করার অভিযোগ ওঠে। সম্রাটের বিশ্বাসভঙ্গের দোষে সাব্যস্ত আলি কুলিকে বিচারালয়ে নিয়ে আসতে বলা হয় কুতুবউদ্দিনকে। আলি কুলি ধরা দিতে গররাজি হন। কুতুবউদ্দিন কৌশলে তাকে ধরতে এলে আলি কুলি কুতুবউদ্দিনকে আক্রমণ করেন। গুরুতর জখম হন কুতুবউদ্দিন। কুতুবউদ্দিনের অনুচরদের হাতে মারা যান আলি কুলি খাঁ ওরফে শের আফগান। গুরুতর জখম হয়ে কুতুবউদ্দিনও মারা যান। শের আফগানের মৃত্যুর পর মেহরুন্নিসাকে পাঠানো হয় দিল্লিতে সম্রাটের হারেমে। বছর চারেক পর জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তার বিয়ের পর তিনি হয়ে ওঠেন মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম ক্ষমতাবতী নারী- নূরজাহান। নূরজাহানের সঙ্গেও যে বর্ধমানের সম্পর্ক রয়েছে, সে কথা অনেকেই আজ বিস্মৃত। সেই গল্প অন্য একদিন। 

আর, আলমগঞ্জে শের আফগানের পাশেই শায়িত রয়েছেন কুতুবউদ্দিন। একে অপরের সঙ্গে লড়ে মারা যাওয়া দুই যোদ্ধা পাশাপাশি শায়িত, চিরকালের জন্য।

আশ্চর্য নৈঃশব্দ্যে এই সমাধি-চত্বরে লুটিয়ে আছে ইতিহাস। শের আফগানের সমাধির সামনেই 'পীর বাহারাম'এর সমাধি।অতিপ্রাচীন বুখারা শহরের চাগতাই ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ পীর বাহারামের প্রকৃত নাম শাহওয়ার্দি বায়াত। আকবরের সময়ই ভারতে আসেন। শাহওয়ার্দি বায়াত আগ্রায় পথচারীদের 'সাক্কা' (যিনি জল দিয়ে সেবা করেন) ছিলেন। বয়সকালে তিনি বাংলায় আসেন। বর্ধমানের এই এলাকাতেই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটিয়েছেন। আশেপাশে আরওকিছু বেনামা সমাধি রয়েছে। ছোট মসজিদ রয়েছে একটা। স্থানীয়রা নামাজ পড়েন সেখানে। আশেপাশের ব্যস্ততা, কোলাহল থেকে মুক্ত এই সমাধিক্ষেত্রে ইতিহাস যেন চেপে বসে আছে। রাজারাজড়া, নবাববাদশাদের নাটকীয় ইতিহাস আমাদের এই হুড়োহুড়ির মেট্রো জীবনে কি অদ্ভুত লাগে, না?

বর্ধমানের বাদশাহি নাম ছিল ‘শরিফাবাদ’। সেই বাদশাহি শরিফাবাদের ধুলো-জমা ইতিহাসের ওপরেই জমে উঠছে আজকের বর্ধমানের ঝাঁ-চকচকে কংক্রিটের স্তূপ। এসব সরিয়ে সরিয়ে মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে করে অতীতের বর্ধমানকে। যেখানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে কবরে চিরশায়িত আলি, তাঁর পাশেই শায়িত তাঁর হন্তারক। আর, আলির বেগম? তিনি কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে উঠবেন জাহাঙ্গীরের খাস বেগম। ইতিহাস নারীর মতো রহস্যময়ী, পুরুষের মতো নিষ্ঠুর। আমার কথা না। বলেছিলেন, আমীর খসরু।  

Developed by DXDasia