
অঞ্জন দত্তের ঘোষিত শেষ নাট্য প্রযোজনা ‘আরো একটা Lear’ – রিভিউ
শেক্সপিয়ার প্রসঙ্গে পিটার ব্রুক বলেছিলেন, ‘Shakespeare doesn't belong to the past. If his material is valid, it is valid now. It's like coal. The only meaningfulness of a piece of coal starts and finishes with its combustion, giving us light and heat.’
এই কয়লা নিয়ে নিরন্তর কারবার চলেছে পৃথিবী তথা বাংলার শিল্প জগতে। সমানভাবে সিনেমা এবং থিয়েটারের ক্ষেত্রে। বাংলা থিয়েটারে শেক্সপিয়ার প্রাসঙ্গিক গিরিশ ঘোষের আমল থেকেই, সেই ধারা রবীন্দ্রনাথ থেকে উৎপল দত্ত হয়ে একবিংশ শতকের থিয়েটারে এসে ধরা দিয়েছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাজা লিয়ার’, ব্রাত্য বসুর ‘হেমলাট’ বা ‘মুম্বাই নাইটস’, কৌশিক সেনের ‘ম্যাকবেথ’ এবং ‘হ্যামলেট’, গৌতম হালদারের ‘ওথেলো’, অবন্তী চক্রবর্তীর ‘রোমিও এবং জুলিয়েট’, শান্তনু দাসের ‘ম্যাকবেথ মিরর’, অর্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘অথৈ’ প্রভৃতি আরও বহু শেক্সপিয়ার রচিত নাটকের অভিনয় হয়েছে এই শতকের গত আড়াই দশকে। আরও একটি প্রযোজনার কথা বলতেই হয়, সেটি অবশ্যই সুমন মুখোপাধ্যায় নির্দেশিত এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘রাজা লিয়ার’। এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী এই নাটক। তবে আজ হঠাৎ এই প্রসঙ্গগুলি টানছি কেন? কারণ শহরে আবার ফিরে এসেছেন আরও একজন লিয়ার। তিনি অঞ্জন দত্ত। মূলত গায়ক এবং চলচ্চিত্র অভিনেতা-পরিচালক হিসাবে পরিচিত হলেও অঞ্জনের শিল্পসৃষ্টির সূচনা কিন্তু থিয়েটার থেকেই। বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার সঙ্গে থিয়েটার নির্মাণে কাজ করেছেন অঞ্জন, শিখেছেন বাদল সরকারের কাছে, থিয়েটার করার জন্য দীর্ঘদিন থেকেছেন বিদেশেও। সেই অঞ্জন দত্তের ঘোষিত শেষ নাট্য প্রযোজনা: আরো একটা Lear (Aro Ekta Lear by Anjan Dutt)। এখনও পর্যন্ত এই নাট্যের তিনটি অভিনয় হয়েছে শহরে। কেমন হল এই নাটক?
অঞ্জন দত্ত ছাড়াও লোকনাথ দে, সুদীপা বসু বা সুপ্রভাতের মতো শক্তিশালী অভিনেতা থাকা সত্ত্বেও নাটকের কোনও চরিত্রই চরিত্র হয়ে উঠতে পারেননি।
অঞ্জন একজন সুঅভিনেতা, দক্ষ পরিচালক। তবে সবার সব কাজ সবসময় ভালো হবে, এমন নাও হতে পারে। ডন ব্র্যাডম্যানও তাঁর শেষ টেস্টে শূন্য রানে আউট হতে পারেন। ইতিহাস এবং শিল্প দুই-ই সম্ভাবনার খেলা। সেই খেলায় কখনও বল বাউন্ডারি টপকে যায়, আবার কখনও সেটি ব্যাটের কানা ছুঁয়ে চলে যায় কিপারের হাতে। ‘আরো একটা Lear’-এর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি অনেকটা তাই ঘটেছে। বেশ কিছু ভালো অভিনেতা, ভালো সংগীত পরিচালক, সর্বোপারি ভালো নাটক থাকার পরেও কোথাও গিয়ে দর্শকদের পূর্ণতার বোধ দিতে পারে না ‘আরো একটা Lear’। কেন? একে একে বলা যাক।

যেকোনো মহান শিল্পী বা অভিনেতা জীবনের একটি বিশেষ বয়সে এসে ফিরে দেখতে চান লিয়ারকে, নিঃসন্দেহে অঞ্জন একজন মহান শিল্পী তথা অভিনেতা। তিনিও ফিরে তাকিয়েছেন লিয়ারের দিকে।
প্রথমত, কিছু নাটকের শুরু থেকেই অভিনেতার দর্শকদের হাতে সংযোগের সুতোটা ধরিয়ে দিতে পারেন, তবে এই নাট্যর ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। অভিনেতারা বারবার চেষ্টা করেও নাটক গঠনের জন্য সেই সুতোটি দর্শকদের হাত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারেননি। অঞ্জন ছাড়াও লোকনাথ দে, সুদীপা বসু বা সুপ্রভাতের মতো শক্তিশালী অভিনেতা থাকা সত্ত্বেও নাটকের কোনও চরিত্রই চরিত্র হয়ে উঠতে পারেননি। এর জন্য সম্ভবত দায়ী মূল নাটকের অনিয়ন্ত্রিত সম্পাদনা, একটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টার নাটককে দুই ঘণ্টার কাছাকাছি সময়ে টেনে আনা একটি দুরূহ কাজ, সেটি সম্ভবত আরও ভালোভাবে করা যেত। নাটকটিতে বেশ কিছু গুরুচণ্ডালী দোষ আছে, বিষয়ের ক্ষেত্রেও, ভাষার ক্ষেত্রেও। অনেক ঘটনা বা সংলাপ বা ‘ইমেজ’ নাটকে ঘটে বা দেখতে পাওয়া যায়, তবে সেগুলো কেন ঘটছে বা কেন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তার কোনও যুক্তিপূর্ণ উত্তর পাওয়া যায় না। এর মধ্যেও কোথাও গিয়ে কিছুটা সফল মনে হয় এডমন্ডের চরিত্রে শুভ্র সৌরভ দাসকে।
দ্বিতীয়ত, আলোর পরিকল্পনা খুবই অস্বস্তিকর। এটা হতে পারে ফর্মকে পরিবর্তন করার কোনও সচেতন প্রয়াস, তবে সেটি দর্শক হিসাবে আমার চেতনা পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি। মঞ্চে প্রায় সারাক্ষণ ছ’টি রঙের জ্বলতে থাকা আলো কোনও শিশুর কাঁচা হাতে প্যাস্টেলে রং করা ছবির মতো দেখতে লাগে। আলোর রঙে গেরুয়া (হলুদ অ্যাম্বার)-কে খুঁজে পেয়ে তার কোনও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা করতে গিয়েও সফল হতে পারিনি খুব একটা। তিনটি নীল আলো ফুট লাইটের জায়গা থেকে সাইক্লোরামার দিকে থাকার কারণে চরিত্রদের ছায়ার এক খেলা তৈরি হয় যা সাময়িকভাবে দেখতে ভালোলাগে, তবে এই বিষয়টিও সমগ্র নাটক জুড়ে চলায় দেখতে একঘেয়ে লাগে।
তৃতীয়ত, মঞ্চ মিনিমালিস্টিক। ভালো কথা। তবে এতটা মিনিমালিস্টিক যাতে সেটি কোনও ডায়মেনশন না পায়, এটা যুক্তিপূর্ণ কি না ভেবে দেখা যেতে পারে। মঞ্চে একটি চেয়ার ছাড়া আর কিছু নেই। দুঃখিত, আরও একটি জিনিস আছে, স্ট্যান্ড, যেখানে বিভিন্ন দৃশ্যের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে নানারকম কোটেশন। যে কোটেশনের লেখক রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে হিটলার বা ব্রেখট। তবে এটিতেও একটি অদূরদর্শিতা দেখা গেছে। ব্যালকনিতে বসা দর্শক কোটেশনের প্রায় কিছুই দেখতে পাননি। এছাড়াও সব আলো নিভিয়ে অন্ধকার করে দৃশ্য পরিবর্তন ও সেই সময় আবহ সংগীতের ব্যবহার বেশ সেকেলে ঘরানার কাজ বলে মনে হয়।
লিয়ার সর্বকালের সব শাসকের ইতিহাস। শাসক নিজের ক্ষমতার দম্ভে কী ভুল করতে পারে এবং সেই ভুল করলে রাষ্ট্র তাকে কীভাবে শিক্ষা দেয়, সেই ক্ষয়ের ইতিহাস হল কিং লিয়ার। প্রথমেই বলেছি শেক্সপিয়ার কয়লার মতো। বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন শিল্পী চরম রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণেই ফিরে গেছেন লিয়ারের কাছে। তাদের সমসময়কে চিহ্নিত করেছেন লিয়ারের মাধ্যমে, তিনি গ্রিগরি মুখাইলোভিচ কোজিনসেভ হোন কিংবা আকিরা কুরোসাওয়া অথবা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যেকোনো মহান শিল্পী বা অভিনেতা জীবনের একটি বিশেষ বয়সে এসে ফিরে দেখতে চান লিয়ারকে, নিঃসন্দেহে অঞ্জন একজন মহান শিল্পী তথা অভিনেতা। তিনিও ফিরে তাকিয়েছেন লিয়ারের দিকে। তবে তিনি বিলক্ষন জানেন ‘তাকিয়ে থাকা মানে দেখতে পাওয়া নয়’।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
