
কথা বলছেন সোহিনী সেনগুপ্ত
শীতকালে বাঙালির জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা। এ যেন নাটকের এক বার্ষিক উৎসব। গত চল্লিশ বছর ধরে নান্দীকার এই জাতীয় নাট্যমেলার আয়োজন করে আসছে, এবছর তা একচল্লিশ তম বর্ষে পদার্পণ করতে চলেছে। একসময় দশদিনের নাট্যমেলা আয়োজন করেছে নান্দীকার, আবার কোভিডের সময় তা হয়েছে দুইদিন ব্যাপী, কিন্তু জাতীয় নাট্যমেলা থেমে যায়নি। ২০২৪-এ জাতীয় নাট্যমেলা চলবে ছয় দিন, ২০ থেকে ২৫ ডিসেম্বর। এবারের নাট্যমেলা ঠিক কী কী কারণে বিশেষ? নান্দীকারের অন্যতম সেনাপতি সোহিনী সেনগুপ্তের সঙ্গে এ-বিষয়ে কথা বললো বঙ্গদর্শন.কম।

এ-বছর নাট্যমেলার মূলে আছে রেপার্টরি থিয়েটার এবং নান্দীকার। নান্দীকার ছাড়া সম্ভবত সমগ্র ভারতবর্ষে এমন কোনও নাট্যদল নেই যাদের দশ থেকে বারোটি অভিনীত হতে থাকা বা ‘রানিং’ প্রোডাকশন আছে। বাচ্চাদের নাটক ধরলে সেই সংখ্যাটি আরও বেড়ে যায়।
সোহিনী জানান, এ-বছর নাট্যমেলার মূলে আছে রেপার্টরি থিয়েটার এবং নান্দীকার। নান্দীকার ছাড়া সম্ভবত সমগ্র ভারতবর্ষে এমন কোনও নাট্যদল নেই যাদের দশ থেকে বারোটি অভিনীত হতে থাকা বা ‘রানিং’ প্রোডাকশন আছে। বাচ্চাদের নাটক ধরলে সেই সংখ্যাটি আরও বেড়ে যায়। সোহিনীর মনে হয় এই বিষয়টিকে কোথাও একটা তুলে ধরা দরকার, সেখান থেকেই বলা যায় এ-বছরের জাতীয় নাট্যমেলা নান্দীকারময়।
এ-বছর নাট্যমেলা থেকে সম্মাননা জানানো হচ্ছে প্রকাশ ভট্টাচার্যকে। প্রকাশবাবু একসময় নান্দীকারের সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত ছিলেন, পরবর্তীকালে নন্দীপট নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন। নানান দলকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে এসেছেন প্রকাশবাবু। নান্দীকার তাঁকে একজন বিশেষ থিয়েটার-বন্ধু হিসাবে এবছর সম্মাননা জানাচ্ছে। এবছর নাট্যমেলার উদ্বোধক তথা প্রথম দিনের প্রথম নাটকের নির্দেশক ও মুখ্য অভিনেতা অঞ্জন দত্ত। জীবনের প্রথমদিকে একসময় কলকাতায় থিয়েটার চর্চা করার সময় নান্দীকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয় অঞ্জন দত্তের। সোহিনী সেনগুপ্ত বলেন, “অঞ্জন দত্ত আমাদের সবারই খুব কাছের মানুষ, প্ৰিয় মানুষ। বাবা-মায়েরও খুব প্রিয় ছিলেন অঞ্জন দত্ত।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অঞ্জন দত্ত ঘোষণা করেছেন এই প্রযোজনা অর্থাৎ ‘আরও একটি লিয়ার’-ই নাকি তাঁর জীবনের শেষ থিয়েটার প্রোডাকশন। এটি যাতে শেষতম প্রোডাকশন না হয়, সে বিষয়েও নান্দীকার সচেষ্ট। প্রথম দিনের প্রথম নাটক হিসাবে হয়তো আরও প্রাসঙ্গিক অঞ্জন দত্তের ‘লিয়ার’।
আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি মানে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের বয়স হবে ৯০। এই বয়সে তিনি আবারও ফিরছেন মঞ্চে। নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলায় আবারও অভিনীত হতে চলেছে ‘মাধবী’। ঘটনাচক্রে এই নাটকের নির্দেশক প্রয়াত স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। সোহিনী-সহ গোটা নান্দীকার পরিবার চায় রুদ্রবাবু যতদিন শারীরিকভাবে পারছেন তিনি যেন অভিনয়টা করেন, বলা বাহুল্য এটা রুদ্রবাবুরও ব্যক্তিগত ইচ্ছা। বছরের শেষে কলকাতা শহর আবার সাক্ষী থাকতে চলেছে প্রবাদপ্রতিম রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের অভিনয়ের।

২০২৫ সালের জানুয়ারি মানে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের বয়স হবে ৯০। এই বয়সে তিনি আবারও ফিরছেন মঞ্চে। নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলায় আবারও অভিনীত হতে চলেছে ‘মাধবী’।
নান্দীকার বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার আরও একটি প্রধানতম কারণ নান্দীকার বাঙালির সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে বিশ্ব থিয়েটারের। সফোক্লেস, তলস্তয়, ব্রেখট থেকে শুরু করে পিরানদেল্লো বা হ্যারল্ড পিন্টার, সকলের সঙ্গেই বাঙালির পরিচয় সেই নান্দীকারের হাত ধরেই। ট্রাডিশন সমানে চলছে। নাট্যমেলায় নান্দীকার প্রযোজিত যে নাটকগুলি অভিনীত হবে, সেগুলির নাটককারদের মধ্যেও এইরকম বিভিন্নতা রয়েছে। সেখানে যেমন আছে ভীষ্ম সাহানির নাটক, আবার আছে বিজন ভট্টাচার্যের নাটক, তেমনই আছে রেজিনাল্ড রোজের নাটক’ও। ঠিক কী কী নাটক থাকছে নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা ২০২৪-এ?
• ২০ তারিখ অর্থাৎ প্রথম দিন সন্ধ্যা ৬টায় থাকছে অঞ্জন দত্ত নির্দেশিত আরও একটি লিয়ার
• ২১ ডিসেম্বর দুপুর ২-৩০, সোহিনী সেনগুপ্ত পরিচালিত নান্দীকার প্রযোজিত নাটক মানুষ; ওইদিন সন্ধ্যা ৬-৩০-য় থাকছে স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত নির্দেশিত নাটক মাধবী
• ২২ তারিখ থাকছে নান্দীকারের আরও দুটি নাটক, দুপুর ৩টেয় এক থেকে বারো, নির্দেশনা সপ্তর্ষি মৌলিক; সন্ধ্যা ৬-৩০-য় নাটক পাঞ্চজন্য, পরিচালনা সোহিনী সেনগুপ্ত
• ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬-৩০-য় থাকছে দুটি নাটক। প্রথমটি UNSEWN, পরিবেশনায় বারখা এবং ফ্রেডরিক; এছাড়াও থাকছে নান্দীকার প্রযোজিত এবং অর্ঘ্য দে সরকার নির্দেশিত নাটক যত্নে রেখো
• ২৪ তারিখ থাকছে সোহিনী সেনগুপ্ত নির্দেশিত নান্দীকার প্রযোজিত নাটক রানি কাদম্বিনী, সন্ধ্যা ৬-৩০-য়
• উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর থাকছে অনেকগুলি নাটক। সকাল ১০টায় নান্দীকারের কচিকাঁচার দলের নাটক, দেবব্রত মাইতি নির্দেশিত পাখি; রাকেশ দাস নির্দেশিত নাটক লুল্লু; এবং অনিন্দিতা চক্রবর্তী নির্দেশিত নাটক পারফেক্ট প্রিফেক্ট। দুপুর ২-৩০-য় নান্দীকারের নবনাট্য নবান্ন, নির্দেশনায় সোহিনী সেনগুপ্ত এবং অর্ঘ্য দে সরকার। উৎসবের সমাপ্তি হিসাবে আবারও মঞ্চস্থ হবে পাঞ্চজন্য।
• সবকটি নাটকই অভিনীত হবে একাডেমিতে।
গত চল্লিশ বছর ধরে নান্দীকার জাতীয় নাট্যমেলা যে ঐতিহ্য বহন করে আসছে, এই ৪১তম বর্ষেও তা অটুট থাকবে, এ বিশ্বাস রাখেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত।