‘হংসরাজ’ ছবির ৫০ বছর
চল্ আপন মনে এই পরাণের সুর নিয়ে গান গাই/ যা দেখি তাই নিয়ে আমি গান শুনিয়ে যাই
ছেলেটি খমক বাজিয়ে গান গেয়ে বেড়ায়। মাধুকরী সংগ্রহ করে সে। গ্রামের পথে পথে যে ঘুরে যায় তার সঙ্গী হয় ছোট্ট মেয়ে টিয়া। ছেলেটির বাবা নেই। কাকার সংসারে থাকে বিধবা মাকে নিয়ে। ছেলের বাবা ছিল বাউল। কাকাও তাই। হংসরাজ দাস নামের এই বালক যেন গোবরে পদ্মফুল। রোগা গড়ন, ঢলঢলে মুখটায় খড়িমাটি দিয়ে করা তিলক ঝলমল করে। ওর গলায় আছে জাদু। আকাশ, বাতাস, আলপথ, জোড়-লাগা সাপ, গাছ, ফুল, পুকুর, ক্রিকেট খেলা- সব কিছু নিয়ে সে অবলীলায় গান বাঁধতে পারে। বিধুমুখীর সঙ্গে গানের লড়াইতে জিতেও যায়। এ-হেন ছেলেকে প্রত্যেকে হিংসে করবে, তা তো নতুন কথা নয়। জগাই তাই তাকে জলে ডুবিয়ে মারতে চায়। অবশ্য মোড়লের কাছে বিচার হয়ে অপরাধীর শাস্তি হয়। যাই হোক, গ্রামের ছেলের জীবন এমনই চলছিল। হঠাৎ শহর থেকে স্কুল বাসে চড়ে আসা কিছু তরুণ হংসরাজকে, তার গানের অপার প্রতিভাকে উচ্চাশার পথ দেখায়। হংসরাজ জানত তার গানের গলা আছে কিন্তু রেডিওতে গান গাওয়ার যোগ্যতা তার আছে এবং তাতে একবার সুযোগ পেলে সে আরও বহু জায়গা থেকে ডাক পাবে, ভালো খাবার পাবে, টাকা হবে আর পরিবারে স্বচ্ছলতা আসবে- এতসব টনি, সামু, বসন্তরা না বললে সে জানতে পারত না। তাদের টানেই সে সব ছেড়ে কলকাতা ছুটে যায়। কিন্তু শহর- রুক্ষ, অহংকারী শহর- কি গ্রামের সরল হংসরাজকে আপন করতে পারে? টনি কথা দিয়েছিল রেডিওতে সুযোগ করিয়ে দেবে। তার কোন্ মামা সেখানকার অফিসার। আসল সময় সে হংসকে প্রত্যাখ্যান শুধু করে না, চোর বদনাম দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেয়। টনির অত্যন্ত ধনী পরিবারের এক কোণায় হংসরাজের জায়গা হয় না। সে আশ্রয় পায় সামুর বাড়িতে, যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তবু সামুর প্রায় অন্ধ হয়ে যাওয়া পিতা ও ইস্কুলের দিদিমণি মা হংসরাজকে আপন করে নেন। তাদের পরিবারে গভীর অনটন। কিন্তু তাতে হংসরাজের সঙ্গে আন্তরিকতায় কোনও অভাব থাকে না। (হংসরাজ সিনেমা)

১৯৭৬ সালে বহু বানিজ্যিক ছবির পাশাপাশি বাংলায় মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়-এর ‘জনঅরণ্য’ এবং তপন সিংহ-এর ‘হারমোনিয়াম’। কিন্তু হংসরাজ ছবির আবেদন আজও অনন্য। এ-ছবির স্বকীয়তা ছবির বিভিন্ন চরিত্রায়ণে।
বাংলা সিনেমা প্রথম থেকে একটি উঁচু তারে বাঁধা। বাংলায় ভারতের প্রথম সর্ববৃহৎ স্টুডিও সিস্টেম চালু হয়। বাংলা সিনেমার চিত্রনাট্য, অত্যন্ত প্রতিভাবান সব ফিল্ম-পরিচালকদের মুন্সিয়ানা, দেশ-বিদেশের স্বীকৃতি, অভিনয়ের উৎকৃষ্টতা, টেকনিক্যাল পালিশ- একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিল বাংলা ছায়াছবির। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, অজিত গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত ‘হংসরাজ’ (Hangsharaj) ছবিটি সেই ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ৫০ বছর পরেও এই ছবির আবেদন একই রকম আকর্ষণীয়। কিন্তু একটি গ্রামের বাউল পরিবারের ছেলের আকাশবাণীতে সুযোগ পাওয়ার সহজ কাহিনির টান এত অমোঘ কেন? কারণ, ছবি নির্মাণের সরলতা। ‘মিউজিক্যাল’ যে বাংলাতেও সম্ভব তার প্রমাণ হংসরাজ। মুহূর্তে মুহূর্তে গান অথচ এতটুকু একঘেয়ে লাগে না। ১৯৭৬ সালে বহু বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি বাংলায় মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়-এর ‘জনঅরণ্য’ এবং তপন সিংহ-এর ‘হারমোনিয়াম’। কিন্তু হংসরাজ ছবির আবেদন আজও অনন্য। এ-ছবির স্বকীয়তা ছবির বিভিন্ন চরিত্রায়ণে। (হংসরাজ সিনেমা)
হংসরাজ কেবল গ্রামের ছেলে নয়, সে বাউল। অরিন্দম গাঙ্গুলি অভিনীত চরিত্রটির সঙ্গে কলকাতার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও যুগ যুগ ধরে একাত্ম হয়েছে। ‘টিয়া টিয়া টিয়া অজ পাড়াগাঁয়ে থাকে’ গানটিতে তখনকার দিনে অ্যানিমেশনের ব্যবহার আমাদের যথেষ্ট অবাক করে। গোটা ছবিটা যেন মনে হয় আমার-আপনার ঘরের কাহিনি। এখানে শহর কলকাতা নিজেও একটি চরিত্র। ‘চিৎকার চেঁচামেচি মাথাব্যথা/ হুল্লোড় হইচই ব্যস্ততা/এই নিয়ে আমাদের কলকাতা’ গানের দৃশ্যায়ণ সত্তর দশকের কলকাতাকে ভীষণ সুন্দর ফুটিয়ে তোলে। সন্ধ্যারানী, কালী ব্যানার্জি, জহর রায় সহ বাংলার বরিষ্ঠ অভিনেতারা কী অপূর্ব সব অভিনয় করেছেন এ-ছবিতে! (হংসরাজ সিনেমা)

তবে ‘হংসরাজ’ ছবির একমাত্র সম্পদ কিন্তু হংসরাজ দাস নয়, বসন্ত দত্ত। এত অসাধারণ একটা চরিত্র ফিল্মের ইতিহাসে খুব কম দেখা গেছে। এবং হংসরাজের প্রতি বসন্তের অপ্রতিরোধ্য টান যেন একটা কুয়্যার অ্যাঙ্গেলের জন্ম দেয়। বসন্ত হংসকে যেভাবে রক্ষা করে, হংসরাজের স্বীকৃতির জন্য যেভাবে নিজের পড়াশোনা-স্কুল-বাড়ি-পরিবার-বন্ধুবান্ধব বাজি রাখে তা এক কথায় অনবদ্য। হংস ব্যর্থ হবে, হংসের রেডিওতে চান্স হবে না- এটা কিছুতেই বসন্ত মানবে না। সে রেগে ওঠে, চিৎকার করে, মারপিটে জড়ায়, পুলিশের কাছে ধরা খায়, গুণ্ডাদের সঙ্গে লড়ে, বাবার কাছে মার খেয়ে তার মাথা ফাটে তবু হংসকে সে ছাড়ে না। রেডিও আধিকারিক অঞ্জনা রায়ের বাড়ির ল্যাম্পপোস্টে উঠে তাঁকে রাজি করাতে চায় বসন্ত, হংসকে সুযোগ দেবার জন্য! এতসব বসন্ত করে কেন? সে যখন বলে গরিব বলে হংস সুযোগ পাচ্ছে না, তাকে সুযোগ করিয়ে দিতে হবে, তখন মার্কসীয় লেন্সে মনে হতে পারে সাবজেক্ট সাম্যের অধিকার চাইছে কিন্তু কুয়্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অন্য বহু কিছু স্পষ্ট হয়। বসন্ত আর হংসরাজের সম্পর্কের মাঝে নূপুর আর টিয়াও কোথাও গৌণ হয়ে যায়। বসন্তের পাগলামিতে হংস এক সময় মেয়েও সাজে! ছবির কাহিনি সম্পূর্ণ গতি পায় একমাত্র বসন্ত চরিত্রের জন্যই। হংসরাজের মত অনেক চরিত্র তৈরি হতে পারে কিন্তু বসন্ত একটি বিরল চরিত্র। বাস্তবিক জীবনেও প্রতিটি হংসের যদি একজন বসন্ত থাকে তবে জীবনের সমস্ত যুদ্ধ সহজ হয়ে আসে। (হংসরাজ সিনেমা)
অরিন্দম গাঙ্গুলি অভিনীত চরিত্রটির সঙ্গে কলকাতার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও যুগ যুগ ধরে একাত্ম হয়েছে। ‘টিয়া টিয়া টিয়া অজ পাড়াগাঁয়ে থাকে’ গানটিতে তখনকার দিনে অ্যানিমেশনের ব্যবহার আমাদের যথেষ্ট অবাক করে। গোটা ছবিটা যেন মনে হয় আমার-আপনার ঘরের কাহিনি। এখানে শহর কলকাতা নিজেও একটি চরিত্র।

‘হংসরাজ’ ছবির আবেদন আকর্ষণীয় কিন্তু তা যে খুব নিখুঁত ছবি, এমন নয়। অনেক সময় অভিনয় বেসুরো ঠেকে, বহু স্টক ইমেজ ব্যবহার করা হয়েছে, অনেক সময়ই গানের সময় অভিনেতাদের ঠোঁট মেলে না কিন্তু ছবির সব দোষ ঢেকে যায় কেবল এই নির্মাণের চাপা আবেগের জন্য। হংসরাজ যখন সত্যিই রেডিওতে সুযোগ পায়, তার সেই গান ব্রডকাস্টের দিন কেবল তার গ্রামের লোক, বসন্ত, অঞ্জনা রায়, টনি আর নূপুরই শোনে না, আমরা দর্শকরাও বিভোর হয়ে হংসের সঙ্গে বহুক্ষণ থাকি আর ওর গান শুনি! হংসরাজ গেয়ে ওঠে ‘বড়ো কষ্টে/আমি পেলাম খুঁজে যা/চেয়েছি তা/বড়ো কষ্টে’ আর মাঝখানে যে পঞ্চাশটা বছর পেরিয়ে গেছে তা আমরা টের পাই না। মনে হয় ‘হংসরাজ’ ছায়ছবি আরও পঞ্চাশটি বছর রয়ে যাক, বেঁচে থাক। কীভাবে জীবনে হেরে না যেতে হয়, এই ছবি বার বার আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যাক।