কীভাবে বাংলা থিয়েটারে বেঁচে আছেন ব্রেখট, সাক্ষাৎকারে বলছেন সুমন মুখোপাধ্যায়

বের্টোল্ট ব্রেখটের ১২৫তম জন্মদিনে কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি, চেতনা আর তৃতীয় সূত্রের যৌথ উপস্থাপনায় মঞ্চস্থ হয়েছে বেচারা বি.বি.। পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়-র সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললেন এ প্রযোজনার গবেষক দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়।
_________________

ব্রেখটকে নিয়ে একটা বিচিত্র টেক্সটকে ঘিরে আপনার সাম্প্রতিক প্রযোজনা বেচারা বি.বি.। ‘বিচিত্র’ বললাম কারণ জর্জ টাবোরির এই ব্রেখটের সংকলনে কোনও এক রৈখিক গল্প নেই। বদলে রয়েছে তাঁর কবিতা-গান-নাটক-সাক্ষাৎকারের টুকরো টুকরো উল্লেখ। যদিও আপনি বারেবারেই আপনার আগের থিয়েটার বা সিনেমার আখ্যানেও বহুস্তরীয় ন্যারেটিভ নিয়ে কাজ করেছেন। তা সে তিস্তাপারের হোক বা হারবার্ট বা সময় অসময়ের বৃত্তান্ত। এখানেও ব্রেখটের জীবনের নানা দিক নিয়ে বহুস্তরীয় গঠনের এ কাজটাও আপনি একই মুন্সিয়ানায় করলেন। এ জায়গাটা থেকেই যদি আলোচনাটা শুরু করা যায়…

সুমন মুখোপাধ্যায়: ব্রেখটের থেকে কিন্তু আমরা অনেকটা দূরে চলে গেছিলাম অনেকদিন ধরেই। একটা সময়ে বাংলা তথা কলকাতা দাপিয়েই ব্রেখট হয়েছে। অনেক ভারতীয় নাট্যকারের থেকে ব্রেখট অনেক বেশি পরিচিতি হয়েছেন এখানে এবং জনপ্রিয়ও হয়েছে। তো, আমার কাছে যখন ব্রেখটকে নিয়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করার একটা অবকাশ এলোই, আমার মনে হল সুযোগটা জরুরি। কারণ এ সুযোগটা চট করে পাওয়া যায় না। যখন উদ্যোক্তারা জানালেন তাঁদের প্রস্তাব, তখন ব্রেখটকে পারফরমেন্সে নতুন ভাষায় নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ধরার একটা বাসনা আমায় পেড়ে ফেলল। ব্রেখটকে বুঝতে গেলে প্রথমেই তাঁর রাজনীতিকে বুঝতে হবে। যে তাঁর রাজনীতিকে ধরতে পারবে, তাঁর কাছে খুলে যাবে ব্রেখটের ফর্ম। এটাই মজা! থিওরির চেয়েও ব্রেখটের নাট্যভাষে রাজনীতির স্ফূরণ বা বীজ বোনা আছে, তাঁর নিজের মতো করে যে মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বাস ছিল ব্রেখটের, সেটাকে ধরতে চেয়েছিলাম। বলে রাখা ভালো, দলীয় মার্কসবাদের কথা বলছি না। কারণ, দল তাঁকে কখনও খুব উদার বা ভালো চোখে দেখেননি। …পাশাপাশি, ওঁর এপিক থিয়েটারের যে জায়গাটা সেটাও তো একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে ধরেই বলা- যে মানুষকে ভাবতে হবে, আরও ইন্টেলেকচুয়ালি নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। ব্রেখটের অভিনয়ের প্রসঙ্গে যে ডেমোনস্ট্রেটিভ অভিনয়ের কথা বলা হয় তাও তো কোনও নতুন কথা না, আমাদের ফোক ফর্মেও কিন্তু এটা বলা আছে। শুধু লোকশিল্প না, ধ্রুপদী শিল্পেও এ ধারণা আছে, যখন আমরা ভারতনাট্টম বা কথাকলি দেখছি তখন গোটাটাই খুব demonstrative বা উপস্থাপনামূলক। তাই ব্রেখটের ফর্মের মতোই রাজনীতিটা বহুমাত্রিক, যেভাবে উনি নাটকের বিষয়টাকে ধরছেন, সেখানে বারবার নানা অন্তর্ঘাত ঘটাচ্ছেন ও নিজেকে নিয়ে মশকরা করে যাচ্ছেন, আমাদের প্রযোজনায় যে ওঁর ‘বই পোড়ানোর উৎসব’ কবিতাটার ব্যবহার করা হয়েছে যেখানে বইয়ের বদলে কবি বলছেন, ‘আমাকে পোড়াও…’, গোটা ব্যপারটাকেই উল্টোদিক থেকে দেখছেন। এই রাজনৈতিক বয়ানটাকেই আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি গভীরভাবে। এই বয়ানটাকে বুঝলেই কিন্তু ফর্মটা তৈরি হয়ে যাবে। এ প্রযোজনার সময়ে আমি আবার ব্রেখটের বইগুলো পড়লাম, সে ওঁকে নিয়ে ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের লেখাই হোক বা জন উইলেটের “ব্রেখট অন থিয়েটার”-এর কয়েকটা খুব জরুরি প্রবন্ধ, পাশাপাশি ওঁর রূপকধর্মী বই “মে-তি”। নাটকের যে অংশগুলো ব্যবহার করেছি সেগুলোও আবার পড়লাম, সেখানে যেমন ‘নির্বাসিতের সংলাপ’ পড়লাম, তেমনি পড়লাম ‘জুইশ ওয়াইফ’ বা ‘মাদার কারেজ’ বা ‘শোওয়াইক’… এসব পাঠে ওঁর রাজনীতিটাকে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, ওঁর এলিয়েনেশান ইত্যাদি তত্ত্বগুলো পেরিয়ে। সেদিক থেকে ব্রেখটের রাজনীতির ধরনটাই আমার আঙ্গকিটাকে তৈরি করে দিয়েছে। 

ব্রেখটকে বুঝতে গেলে প্রথমেই তাঁর রাজনীতিকে বুঝতে হবে। যে তাঁর রাজনীতিকে ধরতে পারবে তাঁর কাছে খুলে যাবে ব্রেখটের ফর্ম। এটাই মজা! থিওরির চেয়েও ব্রেখটের নাট্যভাষে রাজনীতির স্ফূরণ বা বীজ বোনা আছে, তাঁর নিজের মতো করে যে মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বাস ছিল ব্রেখটের, সেটাকে ধরতে চেয়েছিলাম। বলে রাখা ভালো, দলীয় মার্কসবাদের কথা বলছি না।

একমাস ধরে এ প্রযোজনা গড়ে উঠেছে। এরা অনেকেই আপনার তিস্তাপার বা হারবার্টের সময় ছোটো ছিলেন বা জন্মানওনি। নতুন এক ঝাঁক এই ছেলেমেয়েকে আপনি রীতিমত প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে তৈরি করেছেন একমাস ধরে। আমার মনে পড়ছে, কেরিয়ারের শুরুতে যখন আপনি তিস্তাপার ইত্যাদি করছেন তখনও  কিন্তু এভাবেই বহু অভিনেতাকে নিয়ে আপনি পরিচালনার কাজ করেছেন। সে দিক থেকে নিজেকেই কি এভাবে আবার ফিরে দেখলেন এ প্রযোজনায়?

সুমন মুখোপাধ্যায়: হ্যাঁ, অনেক ছেলেমেয়ে নিয়ে কাজ করার অভ্যাসটা প্রায় চলে যাচ্ছিল। আসলে তখন, তিস্তাপারের সময় ১৯৯৯ – ২০০০ সালে, অনেক নতুন ছেলেমেয়েদের পেয়েছিলাম। এখনকার পরিস্থিতি খুব বদলে গেছে। এবার যখন তরুণ-সজীব ছেলেমেয়েদের পেলাম যারা ডেডিকেটেডভাবে কাজ করতে চায়, তখন ব্রেখটের ‘কোরিওলেনাস’ (১৯৯২) করার স্মৃতিই হোক বা “ডাইন” (১৯৮৯) বা “সময় অসময়ের বৃত্তান্ত” (২০০২) এর স্মৃতিই হোক, এবারেও আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। মেফিস্টো প্রযোজনাতেও কিন্তু আমি অনেককে নিয়ে কাজ করেছি, গুজরাত দাঙ্গার প্রতিবাদে তৈরি হয়েছিল ঐ নাটক। এই অনসম্বল কাস্টকে নিয়ে কাজ করার কতগুলো সুবিধে থাকে, কিন্তু কিছু অসুবিধেও থাকে। বিশেষত এখন – সবাই নানা কাজে ব্যস্ত। যদিও আমার শেষ প্রযোজনাগুলোতেও অনেক লোক নিয়েই কাজ করেছি। কিন্তু সেখানে অনেক সিনিয়ার অভিনেতেরা ছিলেন। এখানে তেমন কেউ নেই, তাই কোনও সেলিব্রিটির আলো কেড়ে নেবার ব্যপারও নেই।

আপনি ধারাবাহিক কাজের মধ্যে নিয়ে নিজেকে কাউন্টার কালচারের ধারাতেই রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত কারণে ‘বড়ো’ অভিনেতা বা ‘বড়ো’ প্রযোজনায় কাজ করতে করতে অনেকদিন পর যখন  আবার অনামা তরুণদের নিয়ে এরকম একটা কাউন্টার কালচার কাজ করলেন, কোথাও কি মনে হল, এদ্দিন যে আদত আপনার সত্তা, তার কাছে ফেরা গেল? যখন  আপনি পদাতিকে ‘কাঙাল মালসাট’ করতেন? বা দেবেশ-নবারুণকে ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপনা  করে যেতেন?

সুমন মুখোপাধ্যায়: যে কাজগুলো করছি সেগুলোও আমার কাছে জরুরি কিন্তু এ কাজটা প্রসঙ্গে বলতে চাই, সারা দুনিয়ায় ব্রেখট এতটা সেলিব্রেটেড আজও, কারণ তাঁর রাজনীতি বা দর্শনকে তিনি নিজের নাট্যভাষে শৈল্পিকভাবে বুনতে পেরেছিলেন। তাঁর নাটকের অন্তর্নিহিত রাজনীতিকে মর্যাদা দিয়ে, বুঝে কাজ করতে গেলে তার ডায়েলেক্টিকস প্রকাশ হবেই নিজে থেকে। যখন নবারুণ নিয়ে কাজ করছি, তাঁর রাজনীতিকে সম্মান করে, বিশ্বাস করে কাজ করছি – তখন তাঁর লেখার ভেতরের সাবর্ভাসিভ চরিত্রগুলো তো প্রকাশিত হবেই। যেমন হাবিব তনভির বললেই শুধু তাঁর মধ্যপ্রদেশের লোক আঙ্গিক ইত্যাদি বললে হবে না, তাঁর রাজনীতিটাও বুঝতে হবে।  

বেচারা বি.বি.-র দৃশ্য

বাঙালির ব্রেখট চর্চার একটা ধারা আছে, যেটা শুরুতেই আপনি বলছিলেন। প্রায় দু’দশক ধরে বাঙালি নাট্যকারেরা তাঁকে নিয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছেন ধারাবাহিক বঙ্গভূমি তথা বিশ্ব। সে খ্যাতনামাদের অনেকেই যেমন রুদ্রপ্রসাদবাবু বা বিভাসবাবুরা বেচারা বি.বি.-র প্রথম প্রযোজনাতেও উপস্থিত ছিলেন গিরিশ মঞ্চে। আপনার কি মনে হয়, ব্রেখট প্রযোজনার এই সুদীর্ঘ ইতিহাসে আপনি নতুন এক ধারা সংযোজন করলেন? আমার মনে পড়ছে, এ প্রযোজনার শেষে আজকের চরমপন্থী রাজনীতির কথা বলা হচ্ছে সরাসরি, হিটলারের ধারাবাহিকতায়…

সুমন মুখোপাধ্যায়: নতুন সংযোজন ঘটছে কারণ টেক্সটটা এখানে আলাদা ও নতুন। সে টেক্সটাই নাট্যভাষটাকে একটা অন্য গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই আমার পুরোনো কাজগুলিতে যে পলেটিক্যাল ফরম্যাটটা তা সে নবারুণ বা দেবেশ যার লেখাতেই হোক, সেটাকেই নতুন ভাবে আবার আনতে পারলাম এখানে। তিস্তাপারের বাঘারু তো আসলে একটা ছেদচিহ্ন, এই চিহ্ন থেকেই একটা ফর্ম আমি পেয়েছিলাম যেটাকে আমি বলছি ‘পলেটিক্যাল ফর্ম অফ থিয়েটার’। দেবেশবাবু বলেছিলেন, ‘মঞ্চের ইতিহাস পাঠ’ …সেই পাঠ ব্রেখট নিয়ে কাজ করলে আলাদা হতে বাধ্য। সেটাকে তাই আমি উন্মুক্তভাবে এক্সপ্লোর করেছি। 

বেচারা বি.বি.-র দৃশ্য

আপনি এ প্রযোজনায় অরুণ মুখোপাধ্যায়র ‘ধোঁয়ার গান’ বা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়র ‘হাঙরের গান’র মত বহু পুরোনো ব্রেখটের গানের অনুবাদও ফিরিয়ে এনেছেন। এ প্রজন্মের অনেকেই এগুলি শোনেনি। 

সুমন মুখোপাধ্যায়: হ্যাঁ, প্রথম প্রযোজনার দিন আমার আলাপ হল প্রেসিডেন্সির একদল তরুণীদের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, তাঁদের এ কাজটি বিশেষ ভালো লেগেছে। ততটা ব্রেখটের সব না বুঝলেও, ভিশুয়ালি এনগেজ করতে পেরেছেন তাঁরা। এভাবেই হয়ত ব্রেখটের পরিবেশে আগামীদিনে বড়ো হবে। তারপর অন্যদের হয়ত তা জানিয়ে দেবে অন্ধকারে। সেভাবেই ব্রেখটের কথা অনুযায়ী, অন্ধকারে অন্ধকারের গান গাওয়া হবে…

Written by