কলকাতার মঞ্চে ‘ডাইনি’ ম্যাকবেথ

কল্যাণী কলামণ্ডলমের ‘ম্যাকবেথ মিরর’ নাটকে তিন প্রেতিনী ম্যাকবেথেরই ধ্বংসের প্রতিরূপক

“বেতালস্য পিশাচস্য রাক্ষসস্য সরীসৃপা”- প্রেতিনীরা পাঠ করছেন। ওম থেকে বেরিয়ে আসছে লাল দাগ, কখনও পূজার্চনার মধ্যে তাদের ব্রতপালন। প্রেতিনীদের মধ্যে ওরাই ইরা পিঙ্গলা সুষুম্না। অথবা তারাই বেতাল পিশাচ এবং রাক্ষস, সাপের মতো এঁকে বেঁকে চলাই তাদের ধর্ম। কালের গর্ভ থেকে তারা কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে। শাঁখা, সিঁদুর, আলতা, লাল পেড়ে শাড়ি থেকে ক্রমশ বেরিয়ে আসছে শুচিতা। তারা ম্যাকবেথকে আহ্বান জানাচ্ছে। অথবা তারাই ম্যাকবেথ। এরকম নানান সম্ভাবনার সম্মুখীন হলাম কল্যাণী কলামণ্ডলমের ‘ম্যাকবেথ মিরর’ দেখে। মঞ্চে তিন নারী স্বপ্ন দেখছে যুদ্ধজয়ের। কাল থেকে কালের গর্ভে যাওয়ার পথ ক্রমশ চওড়া করছে। ঠিক যেন নাটকের মতো– তুমি আকণ্ঠ পান করে আমায় ধারণ করলে সখী। তোমার মদমত্ততার সমস্ত আলো ঠিকরে পড়ল ঘর-দুয়ারে। শাঁখা-পলা-সিঁদুর-আলতার সংসারে কী নিষ্পলক চাহনি! অথচ এই আছো, এই নেই। ক্রমশ অন্ধকারে চলে যাও, অন্ধকারে আলো ঢালো, পূজার্চনা করো। তোমার ঋতুমতী শরীরে বিষ ঢুকলে বুঝতে পারো এই বুঝি শুচিতা গ্রাস করবে। ভালোবাসাবাসি হবে খুব। তোমায় অশুদ্ধ বলব না সখী, আলতা পরলে নিশ্চিন্তে আয়না ধরে রাখব। পায়ে পায়ে লাল দাগ এঁকে পার করব বিরহজন্ম। কত কাল! কত অপেক্ষা! আহা মিছে রাগ! কতকাল উপস্থিত হলে আমরা অসময় ভাঙন ধরাতে পারব! তোমার ট্রাজেডি থেকে নিষ্পাপ চাঁদ দেখা যায়। পূর্ণিমার আলো গায়ে এসে টোকা দেয়। তুমিই জাহ্নবী কমলা। তুমিই রাজা। যুদ্ধে যাও বারবার। বারবার ঘরে ফেরার টানে একপ্রস্ত হাওয়া তোমার অস্ত্রে এসে লাগে। সাড়া দাও সখী। ধ্বংস করে দাও তোমার অবস্থান। প্রেতলোকে ফেরো। ফিরে যাও মায়া ঘেরা জাদু সভ্যতায়। বুনো কালো রং তোমায় ঘিরে ধরুক। আলোর আর কী দোষ! এসো, ম্যাকবেথ তোমায় ধারণ করব আজ। তোমার মধ্যেই মিশে আছি আমি, এই একরত্তি নারী। প্রত্যয়ে এসো, দৃঢ়তায় এসো। আলগা বাঁধন রেখো না প্রভু, রাণী হয়ে ঘোমটা টানব খুব। তবু মুক্ত হব। কালের উড়ান হবে আজ। আজ আর ভোর নেই। শুধু কালো রাত। এই রাতেই যুদ্ধবেশে আমাদের প্রেম। ইতিহাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে তোমায় ছিনিয়ে এনেছি। ঘোলাটে পাতা থেকে উঠে আসা চরিত্র আমি, আমিই ম্যাকবেথ। আয়না ধরো, তোমার আয়নায় মুখ দেখব, শরীর দেখব, বন্ধুদের দেখব। তুমি আয়না, আমি কাল। তুমি অতীত, আমি ভবিতব্য। মিলেমিশে এক হব, গান ধরব। আজ কোনো বিষাদ নয়। তার চেয়ে চলো ধ্বংস করি প্রস্তুতি।

 

ঠিক এইভাবে 'ম্যাকমেথ মিরর' কথা বলায় আমাদের। কাল থেকে প্রেতলোকে ফিরে যায়, আবার প্রেত থেকে কালে ফিরে আসে চরিত্র। দুইকালের মিলনে থাকেন ম্যাকবেথ। যেখানে তারই প্রতিচ্ছবি বারবার ভেসে ওঠে। কালো পোশাক ঢেকে যায় লাল সাদা শাড়িতে। মহিলা কণ্ঠস্বর থেকে শোনা যায় পিশাচলোকের বর্ণনা "বেতালস্য পিশাচস্য রাক্ষসস্য সরীসৃপা"। এই তিন নারী, তিন প্রেতিনী। সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে আসা ম্যাকবেথ, লেডি ম্যাকবেথ এবং ব্যাংকো চরিত্রকে ব্যবহার করে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী তিন ডাইনির মনোদর্পণে প্রতিফলিত হয়। সময়ের আদি এবং কালের গর্ভ থেকে পরাবাস্তবের গভীরে, চেতন-অচেতনের সীমা পার করে তিন শিশুর জন্ম হল– থ্রি উইচেস অফ ম্যাকবেথ। শেক্সপীয়রের মূল আখ্যান অনুযায়ী রাজা ম্যাকবেথের নিয়তি বা ডেস্টিনি। এই তিন ডাইনি রাজার ভবিতব্য বলে দিয়েছিল। তাদের অনুসন্ধিৎসু মন বলে দিয়েছিল কীভাবে ম্যাকবেথ হত্যা করবে রাজা ডানকানকে এবং কীভাবে ম্যাকবেথ মৃত্যুমুখে পতিত হবে। আমার আলোচ্য এই নাটকের কেন্দ্রে তিন নারী। শুরু এবং শেষে তারা কালো বসন পরিহিতা এবং নাটকের মধ্যিখানে তারা শুদ্ধতার প্রতীক। তিন নারীর যোনি থেকে বেরিয়ে আসে রক্তমাখা ‘প্যাড’। ঋতুমতী নারীরা সমাজের বিধিনিষেধ পার করে পুজো করে, ধুপ দেখায়, সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রপস হিসাবে ব্যবহৃত দড়ি রূপী নাড়ির টান ছিন্ন করে কালের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা এই তিন প্রেতিনী আসলে অতীত নয়, বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ-ও নয়; বরং শরীর সাধনায় মত্ত ত্রিসত্বা ধীরে ধীরে ম্যাকবেথের পথপ্রদর্শক থেকে ম্যাকবেথেরই ধ্বংসের প্রতিরূপক হয়ে ওঠে। সময়ের আদি থেকে উৎসারিত এই থ্রি শেক্সপিরিয়ান উইচেস, যাদের কোনো কোনো আলোচনায় ম্যাকবেথের তিন শিশু কন্যা হিসাবে প্রতীকায়িত করা হয়েছে। এই নাটক জুড়ে দেখানো হয়েছে লিঙ্গসত্তায় এরা নারী এবং যৌনচেতনায় ম্যাকবেথ। প্রত্যেকের গর্ভে থাকা হুংকার ও আক্রোশে বেরিয়ে আসতে থাকে ঘৃণা। নাটকের একদম শেষে এই ধ্বংসলীলার মধ্যে দেখতে পাব ম্যাকবেথের ভাষা হয়ে যায় প্রেতিনীর ভাষা। তিন নারী কালের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আবার প্রেতযোনিতে প্রত্যাবর্তন করে এবং সৃষ্টির বৃত্তকে সম্পূর্ণ করে তোলে। 

নাটকীয় ভাষা বা থিয়েট্রিকাল ল্যাঙ্গুয়েজ না মেনে ‘ম্যাকবেথ মিরর’ ছড়িয়ে রাখে স্পেস। যেখানে দর্শক অনায়াসে প্রবেশ করতে পারেন। আর এই নাটকীয় আঙ্গিক না মেনে আলো, সঙ্গীত, শারীরিক অভিনয় এমনকি প্লটকে ভেঙেচুরে দিয়েছেন নির্দেশক শান্তনু দাস। সমস্ত চরিত্র, আলো, আবহ সবটা জুড়ে কাজ করেছে শেক্সপিরিয়ান ডার্কনেস। নাটকের মঞ্চে ভৈরবী হয়ে উঠলেন মোনালিসা চ্যাটার্জি। যোগ্য সঙ্গত দিলেন জয়িতা দাস এবং অনন্যা দাস। মূল নাটক অনুবাদ করেছেন দত্তাত্রেয় দত্ত। রূপকল্প ও নির্দেশনায় শান্তনু দাস। তন্ত্র সাধনায় আশ্রিত লোকায়ত ভাবনায় আবহ নির্মাণ করেছেন শুভদীপ গুহ। প্রযোজনা কল্যাণী কলামণ্ডলম।

 

Developed by DXDasia