বাংলার উঁচু পাহাড়চুড়োয় নেপালি নববর্ষ আর ‘ইয়াক উৎসব’

৩৫০০ মিটার উপরে মিলে-মিশে যাচ্ছে নেপাল-ভুটান-সিকিমের সংস্কৃতি

ছোট্ট তমলুক শহরে আমার বড়ো হয়ে ওঠা। শহরটি এখন আর ছোট্ট নেই, কিন্তু যখন বড়ো হয়ে উঠি তখন ছোটোই ছিল। তখন ১২ মাসে ১০০টা মেলা বসত না। সংক্রান্তির মেলা, দোলের মেলা, চড়কের মেলা, এমন তিন-চারটি মেলাই হত। মেলা দেখতে যাওয়া মানে ছিল বাবার সঙ্গে সাইকেলে চেপে বা মায়ের হাত ধরে ঘুরতে বেরোনো। চড়কের মেলার সঙ্গে কালবৈশাখীর কীরকম অদ্ভুত একটা সম্পর্ক ছিল।

এবারে যখন নববর্ষের ছুটি তিনদিনে রূপান্তরিত হল, স্যাক গুছিয়ে ফের বেরোলাম মেলা দেখতে। মেলা দেখতে যাওয়ার জন্য স্যাক গুছোনো কেন? আসলে মেলাটা তো তমলুক বা কলকাতায় নয়। তাছাড়া, এবারের স্যাকে সব কিছুই ছিল। মানে টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ, জলের বোতল, বিউটেন-বার্নার, খাওয়ার-ওষুধ, সবই। আসলে প্রতিবারে ট্রেকরুটগুলো দৌড়োতে দৌড়োতে উঠি, আবার নেমে যাই। টেন্টে থাকা যেন ভুলেই গেছিলাম। তাই এবারে ঠিক করলাম, সান্দাকফু থেকে ৬ কিমি এগিয়ে নেপালি নববর্ষ উপলক্ষে যে ‘ইয়াক ফেস্ট’ হয়, ওখানে থাকব। আর থাঁকব তাঁবুতে।

ট্রেন থেকে নেমে মানেভঞ্জন পৌঁছোতেই তিনটে বেজে গেল। সবকিছু কেনা-কাটা সেরে, গুছিয়ে ট্রেক স্টার্ট করলাম সাড়ে তিনটের দিকে। একটু এগোতে না এগোতেই প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তারমধ্যেই টুমলিং পৌঁছোলাম সাড়ে ছ’টার আগেই। ওখানে কেশরি ম্যাডামের লজে আড্ডা-গান সেরে ভোরে উঠে রওনা দিলাম সান্দাকফুর উদ্দেশে। সারারাতের ঝড় বৃষ্টি তখন সবে থেমেছে, তবু কাঞ্চনজঙ্ঘা মেঘে ঢাকা। অনেকদিন বাদে ভারী স্যাক নিয়ে সান্দাকফু ওঠার মজা টের পাচ্ছি। টুমলিং থেকে যে সান্দাকফু উঠতে ঘণ্টা-চারেক লাগে, সেই রাস্তাই যেন হঠাৎ অনেক লম্বা হয়ে গেল। গৈরিবাস থেকে কায়াকাটার রাস্তার সৌন্দর্য আমায় প্রায়ই থমকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। দু’দিকে লাল-সাদা ফুলে ভরে আছে রডোডেনড্রন গাছ। তার সঙ্গে হলুদ, সবুজ, রুপোলি ও আরো নানান রং মিশে মনে হচ্ছে যেন রঙের ফুলঝুরি জ্বলছে। দলে দলে নেপালি ছেলেমেয়ে, বাচ্চা-বুড়ো একসঙ্গে চলেছে নেপালি নববর্ষের মেলা দেখতে। কেউ বা ফিরছে, কেউ চলেছে গাড়িতে, কেউ আবার হেঁটে। দেখা হলেই জানিয়ে যাচ্ছে হ্যাপি নিউ ইয়ার।

ঘণ্টা চারেকের রাস্তা উঠতেই ছ’ঘন্টা লাগিয়ে দিলাম। উপরে জল পাওয়া যায় নাকি নিশ্চিত ছিলাম না, তাই সান্দাকফু ওঠার আগেই রাত কাটানোর জন্য চার লিটার জল ভরে নিলাম। এরপর আরো এগিয়ে গেলাম ফালুটের পথে। ঠিক কত দূরে মেলাটি হচ্ছিল জানা ছিল না, যখনই কাউকে জিজ্ঞেস করছি, ‘আর কতদূর?’ সকলেরই উত্তর, “এই আর ৪-৫ কিমি”। শেষে দূরত্বর প্রসঙ্গ ছেড়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, মেলা থেকে তারা কতক্ষণ আগে বেরিয়েছে। তাতে একটা ধারণা মিলিল। সেই মতো দ্রুত পায়ে হেঁটে তিনটের দিকে মেলাপ্রাঙ্গনে পৌঁছোলাম।

বিস্তৃত সবুজ ঘাসের গালিচা, কিন্তু একহাত দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছে না। চারদিক পুরো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। প্রচণ্ড জোরে হাওয়া চলছে। যখন তখন বৃষ্টি চলে আসতে পারে। একটু উঁচুতে খুব দ্রুত টেন্ট খাটানোর জায়গা খুঁজে টেন্ট খাটিয়ে নিলাম। আশা ছিল, সকালে টেন্টের চেন খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝকমক করে উঠবে।

গায়ে মোটা জ্যাকেট চাপিয়ে মেলা ঘুরতে বেরোলাম। হঠাৎ মনে হল, এই ঘন মেঘের মধ্যে টেন্ট হারিয়ে ফেলতে পারি। তাই জিপিএস অন করে বেরোলাম। তখন প্রায় মেলা শেষের মুখে, সব গোছানো চলছে। একদিকে সারি সারি টেন্ট পড়েছে, রাতে থাকার জন্য, অন্যদিকে পড়ে রয়েছে শুধু খাবারের দোকান। এখানে সিকিম, নেপাল, ভুটানের স্থানীয় নানা গানবাজনা, নাচও হয়। তবে, সেসব মিস করেছি। তাই খাওয়াতেই মনোযোগ দিলাম।

মুড়ির দোকানে ঝালমুড়ির দাম বললো ২৫ টাকা। আমি দিলাম ১০০ টাকা, উলটে আমায় ফেরত দিল ১৩৫ টাকা। বুঝলাম, পুরো মেলাটি চলছে নেপালি কারেন্সিতে! ৩৫০০ মিটার উপরে ঝালমুড়ি, মাছভাজা, চিকেন পকোড়া পাব, ভাবিনি কখনো! পেটভরে সাঁটিয়ে গেলাম। দেখলাম, এক জায়গায় ভারতীয় ও নেপালি আর্মি জড়ো হয়ে আড্ডা মারছে। বছরের বাকি সময় তো একাকীই কাটে এদের, দেখলে বোঝা যায় কাঁটাতার আসলে কতটা মেকি ব্যপার।

এবার ফিরে এলাম টেন্টে, প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি-সহ বাজ পড়তে শুরু করল। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল টেন্ট উড়ে যাবে, চোখ বন্ধ রাখতে পারছি না তখন। সকালেও সেই ঝড় থামল না। তারই মধ্যে টেন্ট গুছিয়ে নামতে শুরু করলাম সোজা মানেভঞ্জনে। রাতেই যে ট্রেন ছিল! কাঞ্চনজঙ্ঘা এই যাত্রায় দেখা দিলেন না।

আবার বেরোবো পাহাড়ে দৌড়াতে। এবারে ইয়কসাম থেকে জোংরি-গোচালা হয়ে ইয়কসাম ফেরার টার্গেট নিয়েছি মাত্র ১৬ ঘণ্টায়। তার আগে এক্লামাইটেজেশনও সেরে রাখলাম।

Developed by DXDasia