বাংলার বুকে একটুকরো ভুটানের গল্প

প্রাচীন দুকপা-সংস্কৃতি আজো বেঁচে আলিপুরদুয়ারের চুনাভাটিতে

সীমানা, মানচিত্র মাঝেমাঝে গুলিয়ে দেয় পাহাড়। এই দেশের পাহাড়ের পাশের ভাঁজটাই হয়তো নেপালের বা ভুটানের ভাগে। সীমানার বহু আগে থেকে এইসব পাহাড় এভাবেই আছে। শুধু কি পাহাড়! এপার-ওপারের মানুষরাও ঘর বাঁধে সীমানা পেরিয়ে। এই যেমন চুনাভাটির মানুষরা। উত্তরবঙ্গের মাটিতেই তাঁরা গড়ে নিয়েছেন নিজেদের দেশ। একখণ্ড ভুটান। 

আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা পর্যটকদের কাছে বেশ পরিচিত একটা নাম। তবে, এই বক্সার অন্দরেই এমন কিছু ছোটো ছোটো পাহাড়ি গ্রাম আছে যা সাধারণ ট্যুরিস্টদের নাগালের বাইরে। তাশিগাঁও থেকে মাত্র তিন কিমি দূরত্বে অবস্থিত চুনাভাটি এমনই একটি গ্রাম। এ গ্রামে যেতে হবে পায়ে হেঁটে। রায়মাটাং থেকে আদমা হয়ে যেমন পৌঁছানো যায়, তেমনি লেপচাখা থেকে তাশিগাঁও হয়ে ঘন্টাখানেক হালকা চড়াই উতরাই হেঁটেও চুনাভাটি পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। আর, এই গ্রামে যে ট্রেকার একবার পা রাখেন, তিনিই প্রেমে পড়ে যান।

চুনাভাটি এমনিতে খুবই শান্ত একটা গ্রাম। গ্রামে ঢোকার আগেই কানে আসছিল মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ। আমরা পৌঁছাতেই থেমে গেল। প্রথমেই এলাম একটা চোরতেন অর্থাৎ বৌদ্ধস্তূপের সামনে। তারপর, একে একে চোখে পড়ল গ্রামের বাড়িগুলো। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই ঠিক যেন এক টুকরো ভুটান। আমি আর আমার বন্ধু বিশ্বজিৎ– দুজনেই এই ছোট্ট গ্রামের সৌন্দর্যে আত্মহারা হয়ে গেলাম। ট্রেকের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নেওয়া সৌন্দর্য যেন। 

বেশ কিছুক্ষণ একা ঘোরাঘুরি করে গুম্ফায় এসে বসেছি তখন। সূর্য নির্ধারিত সময়ের আগেই ডুবে গেল মেঘেদের রাজ্যে। ক্ষীণ আলোয় একা বসে অদ্ভুত সুন্দর এক নিস্তব্ধতা গায়ে মেখে নিচ্ছিলাম। নীরবতা ভেঙে বিশ্বকে ডাকতেও ইচ্ছা করছিল না। অনেকক্ষণ পর একজন লোক একটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আরেকটা বাড়িতে ঢুকল। একটা ছোটো মেয়ে আরেকটা বাচ্চাকে দু হাতের ভরে পিঠে করে নিয়ে ঢুকল ওই বাড়িতেই। কিছুক্ষণ পর আবার একই পথে ফিরে গেল। যেন আবহমান কাল ধরে চলছে এমনটাই। পৃথিবীর আহ্নিক গতি কমেনি, কিন্তু চারপাশের স্নিগ্ধতা সময়কে যেন মন্থর করে দিয়েছে এখানে। 

মিনিট পাঁচেক পর বিশ্বর ডাক শুনলাম। সাড়া দিতে ও গুম্ফায় উঠে এসে আমাকে ডাক দিল। সামনেই একটা বড়ো বৌদ্ধ মন্দির। তার ভিতরে সারিবদ্ধভাবে কয়েকটা গুম্ফা। ওখানেই পূজো হচ্ছিল এতক্ষণ। এদিকে, তখন বাজে চারটে পঞ্চাশ। সন্ধে হয়ে আসছে। আমাদের ফিরতেও হবে সেদিনই। বিশ্ব বলল, ওখানে গিয়ে ও ভাব জমিয়ে ফেলেছে এই গ্রামের মানুষের সঙ্গে। তাঁরা পুজোর প্রসাদ না খাইয়ে ছাড়বেনই না। অগত্যা আমাকেও যেতেই হল ওর সঙ্গে। এক প্রকার দৌড়েই। 

বৌদ্ধ মন্দিরের প্রবেশদ্বার পেরোতেই দেখি একদল নারী-পুরুষ লাইন দিয়ে বসে গল্প করছে।একদিকে বয়স্কদের জমায়েত, আরেকদিকে বাচ্চারা ছোঁয়াছুয়ি খেলছে। প্রত্যেকের মুখের মধ্যে দারুণ মিল। এঁরাই হল ভুটানের বহু প্রাচীন দুকপা সম্প্রদায়। অতীতে এই গ্রামটি ভুটানের রাজার অধীনে ছিল। তাই, এখানকার মানুষজন ভারতীয় নাগরিক হলেও মনে প্রাণে ভুটানি। ভুটানের বর্তমান রাজাকে এঁরা এখনো প্রভু বলে মানেন। এঁরা কথাও বলেন জংঘা (ভুটান ও তিব্বতী বৌদ্ধদের ভাষা) ভাষায়। চারপাশে আর কোথাও এই ভাষা শুনিনি। চুনাভাটির ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্যও পড়তে যায় ভুটানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই। নিজেদের সংস্কৃতি ও শিকড় বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা অফুরান এই মানুষদের মধ্যে। বিবাহ হয় নিজ-নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যেই। মানুষগুলো অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এবং ভদ্র। এঁদের মিশুকে, নম্র, অতিথিপরায়ণ স্বভাব সম্পর্কে বইতে পড়েছিলাম। সেই আতিথেয়তা গ্রহণের সুযোগ পাব– তা স্বপ্নাতীত ছিল।   

আমরা দুজন গিয়ে বসলাম মন্দিরের উঠোনে ওদের সংগে একই লাইনে। একজন বয়স্কা মহিলা আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, আমরা আর কজন এসেছি। আমাদের আপাতত দুদিনের এই ভ্রমণ-কাহিনি শুনতে চাইল অনেকেই। ইতিমধ্যেই আমাদের পুজোর প্রসাদ বিতরণ করা হয়েছে। এক থালা বিস্কুট আর সঙ্গে দুধ চা। বেশ অদ্ভুত স্বাদ চায়ের। চিনি খুব কম আর চায়ের পরিমাণও এত কম যে রং ধরেনি। একজন যুবক নানারকম গল্প বলতে শুরু করল, যার একটিও সত্যি নয়। উদ্দেশ্য, আমাদের আনন্দ দেওয়া। পাশে বসে থাকা বয়স্কা মহিলারা ইশারা করে বললেন, ওর কথা বিশ্বাস না করতে, মজা করছে।

সময় কেটে গেল কেমন একটা ঘোরের মধ্যে। আমরা উঠব উঠব করছি কিন্তু যুবকটি বলল, ‘আমরা আমাদের অতিথিদের চা খাইয়ে ছেড়ে দিইনা। তোমরা আজ এখানে থেকে যাও। রাত বারোটা অবধি নাচগান হবে, আনন্দ করো। তারপর ঘুমিয়ে পড়বে এইখানেই, সব ব্যবস্থা করে দেব।’ এদিকে আমাদের তো তাশিগাঁও ফিরতেই হবে। ওরা শুনতে নারাজ। বলল, ‘দেখো, আমরা ব্যবসার খাতিরে থাকা-খাওয়ার জন্য ট্রেকারদের থেকে পয়সা নিই। কিন্তু আজ পুজোর দিন। তাই থাকা ফ্রি, খাওয়া অফুরন্ত। তোমরা এখন এক গ্লাস করে হাঁড়িয়া খেয়ে নাও।’ এই হাঁড়িয়া ওরা ভাত পচিয়ে বানায় না, যব থেকে বানায়। বিশ্বজিৎ মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে না পেরে এক গ্লাস নিয়ে ফেলল। সুস্থ শরীরে দুজনে যাতে ফিরতে পারি তার জন্য আমি এই প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। যদিও এক-দুই চুমুক খাওয়ার পর বিস্বাদে বিশ্বও আর হাঁড়িয়ার বাকি অংশটা ছোঁয়নি। 

এরপর, হঠাৎ এল এক থালা ভাত, তাতে দুটো পকোড়া আর শুয়োরের মাংস। এটাও নাকি প্রসাদ! আহা! এমন প্রসাদ খেতে পেটে খিদে লাগে না, একটা পেটুক মন লাগে। তিনটের সময় গলা অবধি ডিমভাত খেয়ে আবার সাড়ে পাঁচটায় পর্ক-ভাত। পাশে তখনো ঐ যুবকটি বকেই চলেছে। তাঁর নানা প্রাপ্তবয়স্ক রসিকতা শুনতে শুনতে রীতিমতো লজ্জাবোধ করছি আমরা। আর ওরা তখন নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে, নিজেদের ভাষায় বিনিময় হচ্ছে গাঢ় রসিকতা। আমাদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যম অবশ্য হিন্দি। দু-একজন বাংলার কয়েকটা শব্দ জানে, কিছুটা বোঝে, কিন্তু বলতে পারে না। 

হাত-মুখ ধুয়ে এসে বিশ্বকে তাগাদা দিলাম। ও পাখির মতো খাবার থালা থেকে খুঁটে খুঁটে ভাত খাচ্ছিল। আমরা উঠছি দেখে আবারও অনুরোধ এল রাত অবধি থেকে ওদের উৎসবে সামিল হবার জন্য। এও বলল, রাতে আমাদের তাশিগাঁও ছেড়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু, আমরা বুঝতে পারছিলাম আজ যা পরিশ্রম হয়েছে তাতে বিশ্রামের প্রয়োজন। অতএব, এই নিবিড় আন্তরিকতার উত্তাপ সঙ্গে করেই চুনাভাটি থেকে ফেরার পথ ধরলাম। পিছনে তখন দু’দণ্ডের অতিথিদের বিদায় দিতে জড়ো হয়েছেন দুকপা জনগোষ্ঠীর অনেকে। 

কেন জানি না মনে হল, হতে পারে এঁরা মনে-প্রাণে ভুটানি। তাও, এই সংস্কৃতি, আত্মীয়তা যেন আমাদের খুব চেনা। যেন একই শিকড়ের। শিকড়েরও কি কোনো সীমানা হয়? 

কীভাবে যাবেন?
চুনাভাটি ট্রেক-রুট। রায়মাটাং থেকে আদমা হয়ে যেমন পৌঁছানো যায়, তেমনি লেপচাখা থেকে তাশিগাঁও হয়ে ঘন্টাখানেক হালকা চড়াই উতরাই হেঁটেও চুনাভাটি পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। 

কোথায় থাকবেন?
চুনাভাটিতেই ট্রেকার্স হাট রয়েছে। গ্রামের মানুষরাই থাকার জায়গা দেন নিজেদের বাড়িতে। নাহলে থাকতে পারেন তাশিগাঁওতেও।

কখন যাবেন?
বর্ষা বাদে যে কোনো সময়ে।

কী কী করবেন না?
চুনাভাটি প্রাচীন দুকপা জনগোষ্ঠীর গ্রাম। এমন কিছু করবেন না, যাতে এই মানুষগুলোর ভাবাবেগে আঘাত লাগে। গ্রামের শান্ত পরিবেশ নষ্ট করে বেশি হৈ-হল্লা না করাই শ্রেয়। আর, পাহাড়ি রাস্তায় আবর্জনা, পলিথিন ফেলবেন না। 

 

Developed by DXDasia