
পথ ভুল হয় বারবার, তবু পাহাড়ি বিস্ময়ের নেশা কাটে না
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে–উঠল বাই তো কটক যাই। আমারও বাই উঠল, কিন্তু কটক না গিয়ে ট্রেন ধরলাম উত্তরবঙ্গের। ট্রেন আলিপুরদুয়ারে রাইট টাইম রাত তিনটে আটাশ। ঘুমিয়ে পড়তে পারি সেই ভয়ে আধ ঘণ্টা অন্তর ঘড়ি দেখে দেখে ভোর হল। এদিকে ট্রেন সাড়ে তিন ঘণ্টা লেট। রাজাভাতখাওয়া স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতেই নেমে পড়লাম। ভোর সাড়ে ছটা। জানুয়ারি মাস, কিন্তু পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কল্যাণে ঠান্ডা নেই। আলিপুরদুয়ার থেকে বক্সা-জয়ন্তীগামী বাস আটটা নাগাদ রাজাভাতখাওয়া এল। আমার এইবারের অভিযানের সঙ্গী জলপাইগুড়ির বিশ্বজিৎ এই বাসে এল। বাসে বসেই শুরু হল প্ল্যানিং। আমরা ঠিক করেছি পায়ে হেঁটেই পাহাড়ে উঠব। শুধু হেঁটে নয়, দরকারে দৌড়েও।

আমাদের ট্রেক শুরু হল সকাল ন’টা নাগাদ। প্রায় সমতল সান্তালাবাড়ি থেকে পাহাড়ের পাকদন্ডী বেয়ে সমানে উঠে চলা। প্রায় প্রতিটি বাঁকে একবার করে ডিমা আর কালজানি নদী-সহ ডুয়ার্সের দর্শন মন ভালো করে দেয়। মাত্র সাড়ে তিন কিমি দূরত্ব নিমেষে অতিক্রম করে বক্সা ফোর্ট পৌঁছে গেলাম। ঐতিহাসিক এই ফোর্ট এবং নবনির্মিত ওয়ার মেমোরিয়াল দর্শন করে পুনরায় যাত্রা শুরু।
গন্তব্য তাশিগাঁও। সাড়ে চার কিমি চড়াই ভেঙে এগারোটার একটু আগে উঠে এলাম ৩১২৪ ফুট উচ্চতার এই গ্রামে। এমন একজনের বাড়ি গিয়ে উঠলাম, যে কাকু ভুটানি হলেও পরিষ্কার বাংলা বলেন। আমাদের পরিকল্পনা শুনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ফুবা কাকু। রাতে তাঁবু খাটাবার অনুমতি পেয়ে গেলাম ওঁর বাড়িতেই।
তাশিগাঁও এসে বুঝলাম পাহাড়ের শান্তি এখানে বিঘ্নিত হয়নি। আপাতত কাকুর সাথে আলাপ চলছে আর কিছুক্ষণের বিরতি। আমাদের ভারী স্যাকদুটো রেখে আমার ন্যাপস্যাক বের করে তাতে শুকনো খাবার, জলের বোতল ভরে নিলাম। ওয়েস্ট পাউচে হেডটর্চ, লজেন্স, মেডিসিন নিয়ে নিলাম। ফুবা কাকুর বাড়ির লাগোয়া চোর্তেনের গা দিয়ে রাস্তা একেবারে উপরের দিকে উঠে গেছে। বিশ্রাম নিয়ে উঠতে উঠতে এক ঘণ্টায় রোভার্স পয়েন্ট চলে এলাম প্রায়। শেষ বাঁকের মুখে চারজনের সঙ্গে দেখা। ওরা নামছে রোভার্স পয়েন্ট থেকে।
বারোটার সময় রোভার্স পয়েন্ট পৌঁছে পাঁচ মিনিট বিরতি নিয়ে এগিয়ে চলেছি আবার। এইবার রাস্তা রিজ অর্থাৎ শৈলশিরার উপর দিয়ে। কিছুটা যেতে বুঝলাম রোভার্স টপের দিকে না গিয়ে রাস্তাটা ওর গা দিয়ে নেমে গিয়ে আবার পাশের পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। সামান্য খাওয়ার বিরতি নিয়েই প্রায় দৌড় শুরু করলাম। সন্ধ্যার আগে ফিরব এই লক্ষ্য নিয়ে দৌড়ে চলেছি। চড়াই উতরাই আর পরোয়া করছি না। সিঞ্চুলা আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। আমরা ক্রমশ ভুটান বর্ডারের দিকে এগোচ্ছি। এখানে কোথাও কোনো লিখিত পথনির্দেশ নেই, কোনো নামও লেখা নেই।

অদূরেই দেখলাম, একটা পাইপের জয়েন্ট থেকে জল চুঁয়ে পড়ছে। এটাই সম্ভবত শেষ পানীয় জলের উৎস। দুটো বোতল কানায় কানায় ভরে আবার যাত্রা শুরু। প্রায় দু’ঘণ্টা টানা চড়াই উঠলাম। রোভার্স টপ এখন নিচু লাগছে দূর থেকে। সিঞ্চুলার মাথায় চলে এসেছি মনে হচ্ছে। এমন সময় এক স্থানীয় মানুষের দেখা পেলাম। উনি ভুটান থেকে ফিরছেন লেপচাখায় নিজের বাড়িতে। পিঠে ব্যাগ ভর্তি কমলালেবু।
রূপম ভ্যালি কতদূর জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘তোমরা ভুল পথে এসেছ। অমচুপানি থেকে জঙ্গলে ঢুকবার শর্টকাট ছিল।’ আমরা হতাশ হলাম শুনে। উনি বললেন, আরেকটু এগিয়ে ভুটান বর্ডারটা দেখে ফিরে আসতে। ওদিক দিয়ে ঘুরে ভ্যালি যাওয়া গেলেও তা অনেক দূর হবে। ওঁর কথামতোই মনখারাপ নিয়েই বর্ডার পৌঁছে গেলাম দশ মিনিট পর। ঘড়িতে তখন দেড়টা।
ভুটান বর্ডারে এসে ম্যাপ দেখলাম। কিন্তু মুশকিল হল, রূপম ভ্যালির কথা গুগল ম্যাপে উল্লেখ করা নেই। তাই কোনদিকে কতটা যেতে হবে বোঝার উপায় নেই। বর্ডার পেরিয়ে খাড়া পাহাড়ের উতরাই ধরে নেমে এলাম একদম ভুটানের ন্যাশনাল হাইওয়েতে। ফাঁকা রাস্তা, দোকানপাটও নেই। একদিকে খাড়া সবুজ পাহাড় অন্যদিকে উপত্যকা। চলতে শুরু করলাম, তবে ঘড়িও থেমে নেই। দুটো বেজে গেল। রূপম ভ্যালির কথা জিজ্ঞেস করার মতো একটা লোকও দেখতে পাচ্ছি না। দুটো পনেরো নাগাদ একজন কাঠুরিয়াকে রাস্তার ধারে বসে থাকতে দেখে বিশ্ব রাস্তা জিজ্ঞেস করল। উত্তরে জানলাম, যেদিকে হাঁটছি সেদিকেই, কিন্তু ঠিক জায়গাটা তিনিও জানেন না। অতএব এগোতে থাকলাম, কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আড়াইটে আমাদের ডেডলাইন। তাতে পৌঁছে গেলে ভালো নাহলে ফিরতি পথ ধরব।

অদৃষ্টের এমনই লীলা, ঠিক দুটো উনত্রিশ মিনিটে কল্পনাতীত সুন্দর রূপম উপত্যকার দেখা মিলল একটা পাহাড়ের বাঁক ঘুরতেই। হাইওয়েতে একটা দোকানের পাশ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম ভ্যালিতে। দেখলাম, দুদিকে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে দক্ষিণমুখী ওয়াং চু চলেছে চপলা অষ্টাদশী যুবতীর মতো। পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে মধ্যগতিতে যার নাম হয়েছে রায়ডাক। উপত্যকার মানুষের জীবিকা মূলত চাষবাস। পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে ঝুমচাষ দেখতে পেলাম। গ্রামের মানুষজন ভীষণ ভালো আর মিশুকে। দু’মিনিটেই আমাদের বড্ড আপন করে নিলেন তারা। এখনই তাশিগাঁও ফিরে যাব শুনে অবাকও হলেন। আমরা মাত্র মিনিট পনেরো সময় কাটিয়েই ফিরতে লাগলাম একই পথে।

ভুটানে ঢোকার পর থেকেই খুব ঠান্ডা লাগছিল। আসলে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য; একদমই রোদ না পড়ায় হাওয়া ভীষণ ঠান্ডা। ফেরার সময়, আমরা কোথা দিয়ে নেমেছিলাম রাস্তায় সেটা খুব সহজে খুঁজে পেতাম না। কারণ, সব জায়গাই একরকম দেখতে। আগাম ভেবেই আমাদের হাতের লাঠিদুটো রাস্তার ধারে রেখে গিয়েছিলাম। তিনটে পনেরো নাগাদ আবার পৌঁছে গেলাম বর্ডারে। এবার শুরু হল প্রাণপণ দৌড়। হাতে দুঘণ্টারও কম সময় আর পেরোতে হবে তেরো কিমি পথ।

বিশ্বজিৎ আমার আগে আগে চলেছে। প্রথম কয়েক মিনিট রাস্তা হাল্কা চড়াই আর উতরাই মেশানো ছিল। তারপর এল প্রচণ্ড এক উতরাই। একদিকে সুগভীর খাদ, অন্যদিকে খাড়া দেওয়াল। পাকদন্ডী বেয়ে দৌড়ে নেমে আসা খুব সহজ ছিল না। তখনও রোভার্স পয়েন্ট বেশ দূর। পনেরো মিনিট রুদ্ধশ্বাস দৌড়ের পর চারটে চল্লিশ নাগাদ রোভার্স পয়েন্ট পৌঁছে গেলাম। বিশ্ব একটু আগে পৌঁছে বিশাল খাদের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ঠিক করলাম, সূর্যাস্তটা দেখেই না হয় গোধূলির পড়ন্ত আলোয় বাকিটা ফিরব। অ্যাকশন ক্যামটা টাইমল্যাপ্সে বসিয়ে দিয়ে আমরা একটু এদিক ওদিক জঙ্গলে উঁকি দিয়ে এলাম। তারপর শেষবার দৌড় দিলাম। হুড়মুড়িয়ে কুড়ি পঁচিশ মিনিটে নেমে এলাম তাশিগাঁও। পাহাড়ের বুকে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে।
ট্রেক করতে চাইলে:
কখন যাবেন?
রূপম ভ্যালি ট্রেক করুন বর্ষাকাল বাদে বছরের যে কোনো সময়। শীতকাল সবচেয়ে উপযুক্ত।
কীভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ থেকে পদাতিক এক্সপ্রেস বা হাওড়া থেকে সরাইঘাট এক্সপ্রেস। তারপরে বাস বা গাড়িতে সান্তালাবাড়ি। সেখান থেকে হাঁটা
থাকবেন কোথায়?
তাশিগাঁওতে ফুবা-জির বাড়ি থাকতে পারেন। বড়ো দল থাকলে লেপচাখায় গিয়ে থাকুন।
কী কী করা বারণ?
পাহাড়ের রাস্তায় চেঁচামেচি, হুল্লোড়। যত্রতত্র প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ফেলবেন না, সন্ধ্যার সময় জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকবেন না।
ছবি: লেখক
