
অতিরিক্ত হরিণদের বেঙ্গল সাফারি থেকে বক্সা টাইগার রিজার্ভে স্থানান্তরিত করার সিধান্ত নেয় রাজ্য বনবিভাগ
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র জঙ্গল। আর সেই জঙ্গল জুড়ে রয়েছে বন্যপ্রাণীদের বিচরণ। রাজ্য সরকারের বনবিভাগের সহায়তায় সেইসব জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণীদের সংরক্ষণ নিয়ে চলছে নানা উদ্যোগ। সেরকমই একটি উদ্যোগ হল নর্থ বেঙ্গল ওয়াইল্ড অ্যানিম্যালস পার্ক।
২০১৪ সালে, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৯৭ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটির উদ্বোধন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনও করা হয় সেই সময়েই। শিলিগুড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার, নিউ জলপাইগুড়ি জংশন থেকে ১২ কিলোমিটার এবং বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, এই পার্কটি সময়ের সঙ্গে একটি প্রধান পর্যটক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পর্যটনের পাশাপাশি এটি পশু সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে রাজ্য সরকার উত্তরবঙ্গের জীববৈচিত্র্য প্রদর্শনের পাশাপাশি তরাই-ডুয়ার্সের সংরক্ষিত অঞ্চলে জৈব চাপ কমানোর দিকেও নজর দিচ্ছে। এছাড়াও বিপন্ন প্রজাতির সংরক্ষণ ও প্রজনন এবং সচেতনতামূলক শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিচ্ছে রাজ্য বনবিভাগ।
পার্কের বাসিন্দার মধ্যে সবথেকে বেশি সংখ্যায় রয়েছে হরিণ। প্রায় ৯০ হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে হরিণদের রাজত্ব। আদপে হরিণ খুবই ভদ্র এবং ভীরু প্রজাতির। নিয়মিত এদের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন সরকারী কর্মীরা। হরিণদের জন্য এখানে আলাদা আলাদা ছয়টি খাওয়ানোর জায়গা রাখা হয়েছে। এছাড়াও সমগ্র পার্ক জুড়ে রয়েছে প্রায় ষাটটি পানীয় জলের জায়গাও। এমনকি হরিণদের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে নিয়ম করে এই খাবার এবং পানীয়-এর জায়গা পরিষ্কারও করা হয়।
হরিণদের মধ্যে প্রধান হল চিতল এবং সাম্বার প্রজাতি। বর্তমানে নির্বিচারে হরিণ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় তাদের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। সংখ্যাটা ক্রমে এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে খাদ্যের জোগান সাম্লাতে না পেরে বেশ কয়েকটি উদ্ভিদ প্রজাতি একেবারে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। তাই সমস্যা সমাধানের জন্য হরিণগুলিকে সম্প্রতি বেঙ্গল সাফারি থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে বক্সা টাইগার রিজার্ভে স্থানান্তরিত করা হয়।

১

২
এই স্থান বদলের জন্য অবশ্য নানারকমভাবে ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয় সরকারের তরফে। যাতে হরিণদের কোনোরকম অসুবিধা না সেদিকেও যথাসাধ্য নজর দেয় কর্তৃপক্ষ। হরিণদের নিয়ে যাওয়ার জন্য জাল দিয়ে বোনা আধুনিক ঘের তৈরি করা হয়। এই ঘেরটির পরিধি ৫০ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ১২ ফুট। একসঙ্গে ২৫ থেকে ৩০টি হরিণ ধারনের ক্ষমতা রয়েছে এই কাঠামোটির। ঘেরের একদিকে রাখা হয় একটি ফাঁদ, ফলে ভিতরে রাখা খাবারের লোভ দেখিয়ে সহজেই হরিণদের জালবদ্ধ করা যায়। যদিও এই ফাঁদের ভিতরে যাতে হরিণদের বায়ু চলাচলের কোনো অসুবিধা না হয়, সেই জন্য ছোটো ছিদ্র রাখা হয়। পাশাপাশি ফাঁদের মধ্যে হরিণদের জন্য খাবার এবং জলও মজুত করে রাখা হয়। যাতায়াতের ঝাঁকুনি থেকে পশুদের রক্ষা করতে খড়ের আস্তরণ বিছানো ছিল।এমনকি যাত্রাপথে যাতে পশুদের ডিহাইড্রেশন জনিত সমস্যা এড়ানো যায় তাই, হরিণগুলিকে একটি বিশেষ খাদ্য সরবরাহ করে বনবিভাগ। শুধু তাই নয়, হরিণদের স্বাস্থ্যের দেখাশোনার জন্য এ সফরে ছিলেন একজন তাদের সঙ্গে একজন পশুচিকিত্সকও।
রাজ্য সরকারের বনবিভাগের উদ্যোগে এ ধরণের অভিনব পদক্ষেপ যে শুধুই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণীদের সংরক্ষণ করছে তাই নয়, পাশাপাশি জীব বৈচিত্র্য সংক্রান্ত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও কার্যকরী পদক্ষেপ রাখছে।
তথ্যসূত্র – বনবিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
