কুলডিহা এবং বিচিত্রপুর
করোনা-অতিমারির জন্য জীবন গেছে থমকে। রোজই বিশেষজ্ঞদের নানা মতে আমাদের মতো সাধারণ লোকেরা পড়েছি অকূল পাথারে। এইটুকু সার বুঝেছি, এই অতিমারির নিষ্ক্রমণ খুব সহজে হবে না, এর সাথেই বাস করতে হবে বেশ কিছুদিন। থমকে থাকলে হবে না, এই ‘নতুন স্বাভাবিক জীবনে’র সাথে মানিয়ে নিয়ে চলতে হবে।
বন্দিজীবনের থেকে মুক্তি পেতে আকুল আমরা – হাতছানি দিয়ে ডাকছে পাহাড়, সমুদ্র, কিন্তু বাধা বিস্তর। এই বাধা কাটিয়ে কীভাবে বেড়ানোর ডাকে সাড়া দেওয়া যায়, তারই হদিশ দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
জঙ্গলের হাতছানি
এখন দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য গণ-পরিবহন মাধ্যম যথাসাধ্য এড়িয়ে চলাই ভালো। তাই খোঁজ দিচ্ছি এমন জায়গার, যেখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়া চলে। এমন জায়গা অনেক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমাদের রাজ্যে। তবে আমি হদিশ দিচ্ছি প্রতিবেশী রাজ্যের দু-একটি জায়গার।
উড়িষ্যার কুলডিহা জঙ্গলে বনদপ্তর গড়ে তুলেছে রিসিয়া জঙ্গল ক্যাম্প। বালাসোর, ময়ূরভঞ্জ এবং কেওনঝড় জেলার সীমান্তে ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চল – নদী, ঝর্না, পাহাড়ি টিলা সাজিয়ে দিয়েছে এই বনাঞ্চলকে। রিসিয়া বাঁধের কাছে ন’টি দ্বিশয্যাবিশিষ্ট তাঁবুতে অতিথিদের বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন উড়িষ্যা বনবিভাগ। নানা গাছে ভরা সুসজ্জিত চত্বরে প্রকৃতির রং-এ রং মেলানো এই তাঁবুগুলি যেন এক ছবি। সৌরবিদ্যুতের আয়োজন আছে প্রতি তাঁবুতে। সকাল থেকে নাম না জানা পাখির ডাকে ভরে ওঠে চারপাশ, ‘giant squirrel’ এর দেখা পাওয়া যায় হামেশাই। শীতকালে নদীবাঁধে আসে নানা পরিযায়ী পাখি। আর যদি বসন্তে যান – ফুলে ভরা শাল, পলাশ স্বাগত জানাবে, মহুল তার গন্ধে ভরিয়ে দেবে। জঙ্গল থেকে হাতির আবির্ভাব এখানে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, তবে তাঁবুচত্বরে হাতি ঠেকানোর ব্যাবস্থা করা আছে।
তাঁবুতে বসবাসের ব্যবস্থা
বনদপ্তরের পথপ্রদর্শক নিয়ে গাড়িতে ঢোকা যায় জোড়াচুয়া, চেমচাটার জঙ্গলে। ওয়াচ-টাওয়ারে বসে দেখা মিলতেই পারে হরিণ, ময়ূর, হাতি বা বাইসনের। দিনের আলোয় নেচার-ক্যাম্পের পাশ দিয়ে শাল-পলাশ-মহুল বনে হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। তবে সাবধান, সূর্য পশ্চিমে ঢলার আগেই ফিরতে হবে অবশ্যই, কারণ হাতির মর্জি বোঝা যায় না কখনোই।
আশেপাশের গ্রামের লোকেরাই বনদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই ক্যাম্প সামলান। অনলস পরিশ্রমে, আতিথেয়তায় এদের জুড়ি নেই। অতিথিদের সব আবদার মেটায় হাসিমুখে, বনের পথে একা ছাড়ে না কখনো, আন্তরিকতা ভরা ডাক দেয় এদের বাড়িতে। এই সুন্দর প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে গেছে সরল অতিদরিদ্র লোকগুলির নিষ্পাপ হাসি।
অরণ্যের আড্ডা
আর যদি মনে করেন-এই দূরত্বও বেশি, তবে সন্ধান দিই আরো হাতের কাছের এক জায়গার। নাম তার বিচিত্রপুর – এখানেও উড়িষ্যা বনদপ্তরের আতিথ্যে বাস করতে হবে। দিঘা থেকে মাত্র ১৮/২০ কিলোমিটার দূরত্বে সুবর্ণরেখা নদীর মোহনার কাছে বালাসোর জেলার এই বিচিত্রপুরের স্বাদ একেবারে অন্যরকম। ঝাউবনে ঘেরা বনদপ্তরের চারটি সুন্দর দ্বিশয্যাবিশিষ্ট কটেজ। জনাকীর্ণ দিঘার এত কাছে এমন এক নির্জন জায়গা যে আছে, তা সত্যি বিশ্বাস হয় না। কটেজ থেকে পায়ে হেঁটে চার/পাঁচ মিনিট গেলেই পৌঁছে যাবেন সুবর্ণরেখার ধারে। বনদপ্তরের লঞ্চ পর্যটকদের নিয়ে যায় ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সুবর্ণরেখা আর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এক দ্বীপে। আপনার মনে হবে পৌঁছে গেছেন সুন্দরবনের কোনো অঞ্চলে। ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের আঠালো সমুদ্রতট, দেখা মিলবে নানা পাখির, বিশেষত শীতকালে। তবে মাছরাঙ্গা, পানকৌড়ি আর বকের দল আপনাকে কখনোই হতাশ করবে না। দেখা মিলবে সদাব্যস্ত লাল কাঁকড়ার। আর শুনলাম এখানে নাকি ডিম পাড়ে বিপন্ন প্রজাতির জলপাই রঙা সামুদ্রিক কচ্ছপ (Olive ridely turtle)। ভাগ্য ভালো থাকলে তাদের সাথেও দেখা হয়ে যেতে পারে। আমাদের অবশ্য সেই সৌভাগ্য হয়নি।
এই জলযাত্রা সব সময়ে করা যায় না, নির্ভর করে জোয়ারের সময়ের উপর। আমরা গেছিলাম সকালে। ঘণ্টা পাঁচেক দ্বীপে কাটিয়ে ফিরে আসতে হল জোয়ার বাড়ার সাথে সাথে। বনদপ্তর দেখাশোনা করে এই বিশাল ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের। ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে ঘেরা সমুদ্র, নদী, দূরে দেখা যাচ্ছে ঝাউবনের সারি – এ দৃশ্য সত্যি ভোলার নয়। তবে একটু ছন্দপতন ঘটে, যখন দিঘা থেকে পর্যটকের দল ভিড় করেন সশব্দে, তটে যত্রতত্র ফেলেন প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের খালি প্যাকেট। এখনই এর উপর বিধিনিষেধ আরোপ না করলে এই অরণ্য বাঁচানো মুশকিল।
জঙ্গলের মধ্যেই ছুটি কাটাতে পারেন
কটেজের সামনের পথ ধরে সুবর্ণরেখার পাশ দিয়ে গ্রামের রাস্তায় হাঁটলেও মন ভরে যায়। চলে যেতে পারেন ভোগারাই গ্রামে শিব মন্দিরে ১২ ফুট উঁচু, ১৪ ফুট চওড়া শিবলিঙ্গের জন্য বিখ্যাত মন্দির। না গেলেও ক্ষতি নেই, পথে পথেই হাঁটুন না সুবর্ণরেখার তীর ধরে।
এবার আসি সাবধানতার কথায়। এসব জায়গায় এসে পৌঁছালে যদিও মনে হয় পৌঁছে গেছি এক দূরতম প্রান্তে, কিন্তু শহর থেকে এদের দূরত্ব বেশি নয়। কুলডিহা থেকে আপতকালীন প্রয়োজনে ভদ্রক শহরে পৌঁছে যাওয়া যায় এক/দেড় ঘন্টায়। কলকাতা পৌঁছাতেও পাঁচ ঘন্টার বেশি সময় লাগে না। আর, বিচিত্রপুর তো আমাদের চেনা দিঘার হাতের নাগালে।
ওই ডাকে সমুদ্র
তাঁবুগুলি বা কটেজগুলি বেশ দূরে দূরে, সুতরাং দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখতে কোন অসুবিধা নেই। এমনকি খাবারও খাবার ঘরে না খেয়ে খেতে পারেন কটেজে বা কুলডিহার তাঁবুর সামনে বাঁধানো চত্বরে ছাতার তলায় সজ্জিত টেবিল চেয়ারে।
বিচিত্রপুর সৈকত
আর সঙ্গী তো থাকবেই হাত ধোয়ার সাবান, স্যানিটাইসার, মুখোশ ইত্যাদি। স্যানিটাইসার স্প্রে নিতেও ভুলবেন না। নিজের হাতেই সবকিছু বিশুদ্ধ করে নিন।
তবে আর কি? খোঁজ নিন কবে উড়িষ্যা বনদপ্তর অতিথিদের জন্য দরজা খুলছে, বেরিয়ে পড়ুন নির্ভয়ে, কিন্তু সাবধানে।