এবারে আক্রান্ত বিবেকানন্দর মূর্তি—এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার!

মূর্তি ভাঙার রাজনীতিতে সব পক্ষই এক মেরুতে?

এ’দেশে মূর্তিই হল এখন যত নষ্টের গোড়া। ঠাকুর-দেবতার মূর্তির না। বিশেষ বিশেষ মনীষী বা বিখ্যাত মানুষদের মূর্তি। যেমন ধরুন, বিদ্যাসাগর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র, আম্বেদকর, লেনিন, সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এমনিতে এঁদের সবাইকে এক গোত্রে ফেলা কঠিন। রাজনৈতিক বিশ্বাসে এঁরা কেউ-কেউ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। এবং, সাম্প্রতিক অতীতে এঁদের সবার মূর্তিই আক্রান্ত হয়েছে। যে বা যারা আক্রমণ করেছে, তাদেরও রাজনৈতিক মতপার্থক্য বিপুল। কিন্তু মূর্তি আক্রমণের রাজনীতিতে কারো কোনো পার্থক্য নেই।

স্বামী বিবেকানন্দর মূর্তি এই তালিকায় নবতম সংযোজন। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ)-এর প্রশাসনিক ভবনের সামনে কিছুদিন আগেই বসানো হয়েছিল বিবেকানন্দর নতুন মূর্তি। এখনো উন্মোচন হয়নি বলে মূর্তি আপাদমস্তক গেরুয়া কাপড়ে ঢাকা। বৃহস্পতিবার দেখা যায়, সেই মূর্তির নিচের বেদিতে লাল কালিতে বেশ আপত্তিজনক নানা শব্দ লেখা রয়েছে। মূর্তি যে কাপড়ে ঢাকা ছিল, সেটিরও একটি অংশ ছেঁড়া হয়েছে। মূর্তির নিচে লেখা শব্দগুলির লক্ষ্য গেরুয়া শিবির। এবং কোনও এক জটিল রসায়নে, বিজেপি এবং বিবেকানন্দ সমার্থক হয়ে গেছেন এই কাণ্ড ঘটানো ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে।

হঠাৎ, স্বামী বিবেকানন্দ আক্রান্ত হলেন কেন? জেএনইউ-তে ছাত্র-আন্দোলন শুরু হয়েছিল হস্টেলের ‘অস্বাভাবিক’ ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে। কর্তৃপক্ষের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একলাফে ৩০ গুণ বেড়ে গিয়েছিল হস্টেলের ঘড় ভাড়া। প্রায় একই হারে বেড়েছিল, হোস্টেলের অন্যান্য খরচও। কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, গত ১৯ বছর ধরে হোস্টেলের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাড়েনি। কিন্তু পাল্লা দিয়ে জিনিসপত্র ও অন্যান্য পরিষেবার দাম বেড়েছে। ফলে, ভর্তুকির পরিমাণও বেড়েছে। তাই এই সিদ্ধান্ত। উল্টোদিকে, জেএনইউ-র ছাত্র-ছাত্রীরা তীব্র বিরোধিতা করে এই সিদ্ধান্তের। ফি বৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে বুধবার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফি ৩০ গুণ থেকে কমিয়ে ১০ গুণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার পরেও পড়ুয়ারা আন্দোলন থেকে পিছু হটেনি। তাদের দাবি, এই ফি বৃদ্ধির গোটাটাই প্রত্যাহার করতে হবে। এবং এই আন্দোলনের আবহেই হঠাৎ করে আক্রান্ত হয় বিবেকানন্দের মূর্তি। বিবেকানন্দর সঙ্গে কর্তৃপক্ষ বা শাসকপক্ষের যে কী সম্পর্ক, কে জানে!

স্বাভাবিকভাবেই, এই ঘটনার পর পারস্পরিক দোষারোপ ও জলঘোলা শুরু হয়েছে। কারা এই কাজ করেছে, তাই নিয়ে এবিভিপি এবং বাম ছাত্র সংগঠনের মধ্যে তরজা এখন তুঙ্গে। এবিভিপির বক্তব্য, বিবেকানন্দ মূর্তির বেদিতে লেখা শব্দগুলো সরাসরি বিজেপিকে আক্রমণ করে লেখা। অতএব, এই কাজ আন্দোলনকারী বাম ছাত্র-ছাত্রীদেরই। উল্টোদিকে, এই ঘটনায় কোনও বামপন্থী ছাত্র-ছাত্রী জড়িত নয় বলে দাবি করছেন বাম ছাত্র-নেতারা। তাঁদের মতে, মূল ঘটনা থেকে নজর ঘোরাতেই এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। ইতিমধ্যে, মূর্তির বেদি থেকে সেই লেখা মুছেও দেওয়া হয়েছে। তবু, বিতর্ক আর থামছে কই!

যদি, সত্যিই জেএনইউ-র আন্দোলনরত বাম ছাত্র-ছাত্রীদের কেউ এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, তারা বিজেপি আর বিবেকানন্দের আদর্শকে এক করে ফেলেছে। স্বামী বিবেকানন্দও এখন তাদের কাছে কেবলই হিন্দুত্বের আইকন। বিবেকানন্দর এই পরিণতি ইতিহাস-বিকৃতির সামিল। বিবেকানন্দ বারবার কথা বলেছেন, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। শিকাগোর ওই বিখ্যাত বক্তৃতায় তিনি স্পষ্টভাষায় জানিয়েছিলেন, ধর্মোন্মত্তাই পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করেছে। গো-রক্ষকদের সঙ্গে তাঁর সংলাপ তো বহুশ্রুত। বামপন্থী ছাত্রছাত্রীরা একদিকে ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতির গেরুয়াকরণ নিয়ে প্রতিবাদ করবে, অন্যদিকে নিজেরাই আশ্চর্যজনকভাবে বিজেপি-সংঘ পরিবার আর বিবেকানন্দর আদর্শকে এক গোত্রে ফেলবে—এই বিরোধাভাস খুবই বিপজ্জনক।

মাঝেমাঝে মনে হয়, স্বামী বিবেকানন্দর যথাযথ মূল্যায়ন করতেই পারিনি আমরা। তাই তাঁকে  নিছক ‘হিন্দুত্বের আইকন’ হয়ে উঠতে হয় বারবার, তাঁকে ব্যবহার করার চেষ্টা চালায় গেরুয়া শিবিরও। অথচ, এর বাইরে সহিষ্ণুতা, মানবতার যে বড়ো পৃথিবীটার হদিশ দিতে চাইতেন বিবেকানন্দ, সেইটা আড়ালেই থেকে গেল। জেএনইউ-তে বিবেকানন্দর মূর্তি যে-পক্ষই ভেঙে থাকুক না কেন, তার আড়ালে এই ভুল বোঝাটা বা ভুল বোঝানোই ক্রিয়াশীল। 

বিবেকানন্দ আর অতি দক্ষিণপন্থাকে এক করে ফেলার চাইতেও বিপজ্জনক মূর্তি ভাঙার এই প্রবণতা। এক্ষেত্রে, অতি বাম থেকে অতি দক্ষিণ সব পক্ষই সমান। কয়েক মাস আগেই, কলকাতার বুকে দুর্বৃত্তদের হাতে ভাঙা পড়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি। সেই স্মৃতির ক্ষত এখনো শুকোয়নি। তার মধ্যেই, বাংলার আরেক মনীষীর মূর্তিও আক্রান্ত হল। এর আগে ত্রিপুরায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মূর্তি ভাঙা হয়েছে, ভাঙা পড়েছে লেনিনের মূর্তিও। দেশের অন্যত্র আক্রান্ত হয়েছে পেরিয়ার, আম্বেদকর, বীরসা মুন্ডা এমনকি নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মূর্তি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগের তির উঠেছে বিজেপির সমর্থকদের দিকে। আবার, কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি আক্রান্ত হয়েছে অতি বাম সমর্থকদের হাতে। নকশাল আমলে কলেজ স্কোয়ারের বিদ্যাসাগর মূর্তি ভাঙার ঘটনাও মনে আছে নিশ্চয়ই। একই মানুষের মূর্তি অতি বাম ও অতি দক্ষিণ, দুই পক্ষের হাতেই ভাঙা পড়ল— এর চাইতে করুণ আর আশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে!

মূর্তির দোষ, তারা কথা কইতে পারে না, প্রতিবাদ করতে পারে না, বাধা দেওয়া তো দূর অস্ত। ফলে, সহজেই তাদের ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, মুখে কালি লেপে দেওয়া যায়, মুন্ডু কেটে ফেলে দেওয়া যায়। মূর্তি যেহেতু জ্যান্ত মানুষ নয়, তাই তাকে আক্রমণ করে ধরা পড়লেও সাজা কম। আবার মূর্তি যেহেতু কোনও এক সময়ের জ্যান্ত মানুষেরই, তাই তাকে আঘাত করা মানে অতীতের সেই মানুষটাকেও আঘাত করা। তাঁকে হাতের কাছে না পেয়ে, তাঁর মূর্তিটাকেই ভাঙা। সেই মানুষ তথা মূর্তিটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস আর আদর্শকে আঘাত করা। এ বেশ মজার এক খেলা শুরু হয়েছে আজকাল। এই খেলায় ডান-বাম সব পক্ষেরই খেলোয়াড় রয়েছে। মূর্তি ভাঙার রাজনীতিতে কোনও ভেদাভেদ নেই।

আসলে, এই ক্রম অধঃপতিত রাজনীতি-দুনিয়ার সামনে বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দর মতো মনীষীরা এক-একটি বিরাট বাধা। তাঁদের আদর্শ এই সামাজিক ক্ষয়ের সামনে প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে। সেই উচ্চতাকে উপেক্ষা করা যায় না, তাই আক্রমণই করতে হয়। তাঁদের মূর্তিকে আঘাত করে তাঁদের আদর্শকেও ধূলিস্যাৎ করে দেওয়ার চেষ্টা চলে। আর আমরা, সাধারণ মানুষ, পড়ে থাকি মাঝখানে। আমাদের রাগ-ক্ষোভ-প্রতিবাদও কেমন ভূগর্ভস্থ জলের মতোই শুকিয়ে আসছে। আমরা যেন ভুলে যাচ্ছি, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দর ওপর আঘাত মানে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, গৌরবের ওপরও আঘাত। রাজনীতির নামে ইতিহাসকে যে আক্রমণ করা যায় না, সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় কি আসেনি এখনো?   
 

Developed by DXDasia