বাংলার ইতিহাসে বারবার ফুটে উঠেছে সাংস্কৃতিক মিলনের ঐতিহ্য

এটিই বাঙালি সমাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

আমরা বাঙালিরা এমন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছি, যেখানে সব সময়েই জোর দেওয়া হয়েছে গ্রহণ করার ওপর। আমরা যাদের সঙ্গেই মিশি, তাদের ঐতিহ্যকে খুব সহজেই আপন করে নিই। বাঙালিয়ানা তাই হয়ে উঠেছে নানা রঙের মোজাইক। ‘তারা’ আর ‘আমরা’ ভেদ গেছে মুছে। পাল-সেন যুগের হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রীতির আবহে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিল। বাংলার সম্রাটরা তখন সারা ভারত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তা সত্ত্বেও বাঙালির প্রথম সাহিত্য ‘চর্যাপদ’-এ কোনো রাজা-রাজরার গল্প নেই, বরং সেখানে আধ্যাত্মিক সাধনার রূপক হিসেবে উঠে এসেছে সমাজের নিচুতলার খেটে খাওয়া মানুষদের সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার টুকরো টুকরো সব ছবি। মাটির সঙ্গে বাংলা ভাষার যোগ তাই প্রথম থেকেই। তারপর যখন ইসলামের প্রবেশ ঘটল বাংলায়, সুফি সন্তরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষিজীবী বাঙালির মন জয় করে নিলেন। 

বাংলার জল-হাওয়ার গুণ এমনই, যখনই নতুন কোনো সংস্কৃতি এসে বাংলায় মেশে, বাঙালি তাকে নিজের মতো করে গড়ে নেয়। বাঙালির হাতে পড়ে বৌদ্ধধর্ম থেকে জন্ম নিয়েছিল নতুন শাখা – বজ্রযান, কালচক্রযান আর সহজযান। পরে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে চিন-তিব্বতের মতো নানা দেশে। হিন্দু ঐতিহ্য মাতৃসাধনার স্বাদ পেল বাংলার মাটিতে, উত্তর ভারতের থেকে যা অনেকটাই আলাদা। একইভাবে বাংলার মুসলমানদের যাপন মধ্যপ্রাচ্যের আসাবিয়া পরম্পরার থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব বাঙালি পরিচয় তৈরি করে নিল। হিন্দুর দেবতা সত্যনারায়ণের সঙ্গে মুসলমানের পিরকে একাত্ম করে বাংলার গ্রামীন মানুষরা শুরু করেছিল সত্যপিরের উপাসনা। শুধু তাই নয়, পরে যখন খ্রিস্টান যাজকরা নতুন ধর্ম প্রচার করতে এলেন, বৈষ্ণব গানের সুরে গাওয়া হতে লাগল যিশুর বন্দনা। খ্রিস্টীয় কীর্তন হয়ে উঠল বাংলা গানের নিজস্ব সম্পদ। এমন ধর্মীয় সমন্বয়ের উদাহরণ সারা পৃথিবীতেই বিরল

ভারতীয় উপমহাদেশের নানা অঞ্চলের সংস্কৃতি যেমন বাংলায় এসে লীন হয়েছে, তেমনি সুদূর পশ্চিম এশিয়ার শিল্প-সাহিত্যকেও আমরা গ্রহণ করেছি বহু যুগ আগেই। তারই সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে বাঙালির দেশীয় ঘরানা, যেমন স্থাপত্য-ভাস্কর্যে টেরাকোটার সূক্ষ্ম কাজ, সংগীতে মরমিয়া বাউল গান, হস্তশিল্পে বিশেষ ধরনের ছোটো ছোটো মাটির পুতুল এবং আরও অনেক কিছু। সমস্ত উপমহাদেশে বাঙালিরাই প্রথম পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ বলে পরিচিত রাজা রামমোহন রায় এই বাংলারই সন্তান। যখনই সামাজিক ভাঙন এসেছে, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণ, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ এই বাংলার পরম্পরাকে সঠিক দিশা দেখিয়েছেন। 

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি যে অবদান রেখেছে, তা অতুলনীয় হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির প্রধান চারটি ধারা – জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লিগ, জনসংঘ এবং কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি – সবেরই আরম্ভ হয়েছিল বাঙালির হাত ধরে। বাংলার ভূমিসংস্কার আন্দোলন সারা দেশকে পথ দেখিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কুপ্রভাব বাঙালিদের মধ্যেও পড়েছিল, তাই দেশভাগের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছিলাম আমরা। তারপর বাঙালিরাই নতুন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ তৈরি করে প্রমাণ দিয়েছিল যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা কতটা ভ্রান্ত। 

বাঙালিয়ানার সেই সমৃদ্ধ পরম্পরা আমরা বহন করে চলেছি এখনও। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, জ্ঞানচর্যা – নানা ক্ষেত্রেই সারা বিশ্বে বাঙালি এখনও অপরাজেয়। বাংলার সাংস্কৃতিক মিলনের ঐতিহ্য থেকে যখন কিছু মানুষ সরে গিয়ে নিজেরদের ছোটো ছোটো স্বার্থে বিদ্বেষ ছড়াতে চেয়েছে, তখনই রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক হিংসার কবলে পড়েছে বাঙালিরা। হিংসার অতর্কিত হামলা আম-জনতাকে হয়তো অল্প সময়ের জন্য ধন্দে ফেলে দেয়, কেউ কেউ ঘৃণাকেই মুক্তির রাস্তা মনে করে বসে, কিন্তু বাংলার সাধারণ মানুষের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য তা নয়। বাংলা চিরকালই অসাম্প্রদায়িক এবং প্রেমের মাধ্যমেই বিশ্বকে আপন করে নেওয়ার শিক্ষা তার চিরকালীন। এই ব্যাপারে আমরা যত বেশি সচেতন হব, রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক হানাহানি থেকে তত সহজেই মুক্ত হতে পারব আমরা।

Developed by DXDasia