যে ধর্মে ধর্মগ্রন্থ নেই

কিছু কলেজ হিউম্যানিজমের সঙ্গে জুড়েছেন ‘নান’ অপশনটিকেও

ইউনিভার্সিটির পাঁচ বছর কাটিয়ে এসেছি আমরা যাঁরা, ফর্ম ফিলাপের ওই একদিন বাদে কখনওই কোনও অফিশিয়াল কাজে আসেনি নিজেদের ধর্মের কথা। কেউ কোনও প্রেফারেন্সও পাননি ধর্মের দরুণ, ক্লাস ক্লাসের মতোই চলেছে। একই গুরুত্বে পড়িয়েছেন প্রফেসররা আমাদের। তাঁদের অনেককেও আমরা কেবল নামের সংক্ষিপ্ত আকারেই চিনেছি ওইকটা বছর। তাই মেধা ছাড়া আর কিছুই প্রাধান্য পায় না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এটুকু বিশ্বাস করতে খুব একটা কষ্ট হয়নি এতবছর।

গত কয়েকবছরে সে পরিস্থিতি অনেকাংশে বদলেছে। ভালো থেকে খারাপের দিকে হেঁটে গেছে অনেক কিছুই। ‘ধর্ম’, এই এক সামান্য শব্দ নিয়ে ছোটো-বড়ো খেলা শুরু হয়েছে বেশ গত কয়েক বছরে। ধর্ম এক চিরাচরিত ট্যাগ, জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাই। জ্ঞান ধরার পর জানতে পারি এই আমাদের ধর্ম, এভাবে উপাসনা হয় আমার ধর্মে, মন্দির দেখলে প্রণাম করতে হয় অথবা মসজিদে যেতে হয় প্রতি সন্ধ্যাবেলা। এটুকু বিশ্বাসই। এর বাইরে আমাদের লেখা-পড়া অথবা দৈনন্দিন বেড়ে ওঠায় খুব কিছু হস্তক্ষেপ থাকে না ধর্মের। কিছু অভ্যাস, কিছু বিশ্বাস আর কিছু গোঁড়ামি সামলে বড়ো হয়ে ওঠে এক শিশু। পরিণত বয়সে এসে কিছু জিজ্ঞাসা জেগে ওঠে এরপর। আমরা জানতে শিখি, পড়তে শুরু করি। আমাদের ধর্ম, কী, কেন, জন্মসূত্রে যা ধারণ করছি তা আমায় ঋদ্ধ করে কি না, মানুষ হতে শেখায় কি না। 

ধর্ম কোনও গণ্ডি নয়। অধিকাংশ ধর্মই খাঁচার বাইরে বেরোতে শেখায়, মানুষকে মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখায়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায় অথচ মানবতার এই উদাহরণ ছেড়ে আমরা এক অলীক দ্বন্দ্বের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠছি দিনকে দিন। কী রক্ষা করছি আর কার হাত থেকে তার কিছুরই জবাব স্পষ্ট নয় নিজেদের কাছে। 

সম্প্রতি কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও খ্যাতনামা কলেজ বেথুনের এক সাহসী পদক্ষেপে কেঁপে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া, ঝড় উঠেছে মানুষের চিন্তাভাবনায়। গ্র্যাজুয়েশনের ফর্ম ফিল-আপে, ধর্মের কলামে সমস্ত ধর্মের সঙ্গে ড্রপডাউনে এক নম্বরে জায়গা পেয়েছে মানবতা। সেখানে অপশন হিসাবে দেখা যাচ্ছে হিউম্যানিজম। এই টালমাটাল সামাজিক পরিস্থিতিতে যেন দমকা এক হাওয়া পেয়েছেন বহু মানুষ। নাগাড়ে ভেসে এসেছে সাধুবাদ, কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনাও। কর্তৃপক্ষের মত অনুযায়ী অনেক ছাত্রীই তাঁর পোশাকি ধর্ম স্বীকার করেন না। বদলে তাঁরা বিশ্বাস রাখেন মানবতায়, মনুষ্যত্বে। কিন্তু বিতর্ক কোনখানে? এই পদক্ষেপ দেখে আমাদেরও কি কিছু মনে হয়নি? সে কথা পরে। প্রথমত ধর্ম নিয়ে ব্যবসার এই সময়ে নির্দ্বিধায় এমন উদ্যোগ একটি নতুন ভাবনার সৃষ্টি করেছে বলে ধরা যেতে পারে। 

এবার আসা যাক বিষয়ে। মানবতা মানুষের বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অংশ। সাধারণ ধর্মের সঙ্গে যার কোনও যোগ নেই। মানবতার কোনও সংজ্ঞা হয় না। সীমাহীন তা। কোনও ধর্মগ্রন্থও নেই সেখানে। মানুষ তাঁর বেঁচে থাকার তাগিদে রপ্ত করে এই ধর্ম। তবে অন্য সকল ধর্মের সঙ্গে একে রাখার উদ্দেশ্য কী? তার বদলে কি নাস্তিকতা রাখা যেত না? সাধারণ মানুষের মধ্যে যাঁরা অস্বীকার করেন নিজের উত্তরাধিকারে পাওয়া এই ধর্ম, তাঁরা নাস্তিকতায় অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন বলেই ধারণা করা যেতে পারে। কিছু কলেজের ক্ষেত্রে দেখা গেছে এই উদাহরণও। তাঁরা হিউম্যানিজমের সঙ্গে জুড়েছেন ‘নান’ অপশনটিকেও। এক্ষেত্রে বিষয়টিতে অনেক বেশি স্বচ্ছতা এসেছে বলাই যায়। আমি আমার ধর্ম স্বীকার করি অথবা করি না, এর বাইরে গিয়ে অন্যকিছুকে ধর্ম বলে দাগিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক প্রচ্ছন্ন এড়িয়ে যাওয়া কাজ করে থাকে। 

এমন অনেক প্রশ্নই উঠেছে এই বিষয়ে। কর্তৃপক্ষ কেনই বা পুরো কলামটিকে সরিয়ে দিলেন না? সেক্ষেত্রে কী সাধারণ মানুষের দৃষ্টি টানত এতটা? অথবা স্পষ্ট জানা যেত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি? এ-ও আলোচনার বিষয় অবশ্যই। কোনওটিই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। পোশাকি ধর্মের সম্বন্ধে কলেজের জ্ঞাত হওয়া যদি একান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে হিউম্যানিজম কীভাবে আসে সেই অপশনে? পুরো বিষয়টিই সেক্ষেত্রে অর্থহীন। তাই ব্যক্তিগত মতামত থেকে বলা যেতে পারে, এ এক সার্ভে মাত্র। বিষয়টিকে পাবলিসিটি স্টান্ট না ভেবে ছক ভাঙা এক সার্ভে ভাবলে জটিলতা কমে আসে অনেকাংশে। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের সম্পূর্ণ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিয়েছেন এই পদক্ষেপ। নিশ্চয় জরুরি মনে করেছেন। খাতায় কলমে যুক্তি লিখে কাটাকুটি খেললে বহু যুক্তিতেই খুব স্বচ্ছ লাগবে না এই পদক্ষেপ। তবু কোথাও গিয়ে এক পা বাড়ানো হয়েছে বলে মনে করছি। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা যুবতীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে নিজেদের ইচ্ছা বেছে নেওয়ার, নিজেদের মতো ভাবতে শেখার। বাকি যা, তা সময় বলুক…

Developed by DXDasia