May 31, 2019 | 12:00 PM

মনুষ্যত্বও একটি ধর্মের নাম, পথ দেখাল বেথুন কলেজ

দেশে সদ্য শেষ হয়েছে লোকসভা নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের অন্যতম হাতিয়ার ছিল ধর্ম। ধর্ম অর্থে আমরা যা ধারণ করি। আমাদের নিজেদের বিশ্বাস, আচার-আচরণ, অভ্যাস সবকিছুই ধর্মের অন্তর্গত হতে পারে। কথায় আছে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, ধর্মের ঢাক আপনি বাজে- দুষ্কর্ম কখনও গোপন থাকে না। আর এই কতকিছুর পরেও ধর্ম আমরা কতটা গ্রহণ করতে পেরেছি কতটা পারিনি সেই বিতর্ক না উস্কে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক। যে ঘটনায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে তামাম বঙ্গবাসী। 

কলকাতার নামজাদা বেথুন কলেজ। চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজ্য সরকারের নিয়ম অনুযায়ী স্নাতকস্তরের ভর্তি প্রক্রিয়ার পুরোটাই হচ্ছে অনলাইন পদ্ধতিতে। সেখানে বেথুন কলেজে ফর্ম ফিল-আপ করার সময় প্রথমে ছাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হচ্ছে। কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন ছাত্রী? এই তথ্য দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট স্থানে ক্লিক করলে দেখা যাবে অপশনে রয়েছে হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন এবং অন্যান্যর সঙ্গে সবার উপরে হিউম্যানিজম অর্থাৎ মনুষ্যত্ব। ছেলেবেলায় স্কুলের গণ্ডিতে কিংবা বাড়ির মায়েদের মুখে সন্তানকে শেখানো হয় মানবধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা ক’জনই বা সেই ধর্মের উপর আস্থা রাখতে পারি! কথায় কথায় চলে আসে তুমি হিন্দু, তুমি মুসলিম। আর তাকে নিয়ে শুরু হয় ঘৃণা ছড়ানোর রাজনীতি। বেথুন কলেজ কর্তৃপক্ষের এহেন সিদ্ধান্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্যালুট জানাচ্ছেন তরুণ-তরুণী থেকে প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া প্রত্যেকেই। 

ভারতীয় সংস্কৃতি যুগে যুগে এই শিক্ষাই তো দিয়ে এসেছে শিক্ষার্থীদের। ঠিক এই কারণেই ভারতীয়রা নিজেদের গর্বিত বলে মনে করেন। টানাপোড়েনে আর গা না ভাসিয়ে স্রোতের মূলে ভেসে ওঠেন। মনুষ্যত্ব বা মানবধর্ম একটি আদর্শ। প্রত্যেকের উচিত এই আদর্শে আস্থা রেখে মানুষে মানুষে ভালোবাসা ছড়ানো। সেই ভালোবাসার বীজ বপন করা থাকে শিক্ষার্থীদের মধ্যেই। বেথুন কলেজের কর্তৃপক্ষ মনে করেন, কোনো ছাত্রী জন্মসূত্রে যে ধর্মেরই হোক না কেন, অনেকেই মানবতাবাদেই বিশ্বাস করে, তাঁদের চিন্তাভাবনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই এহেন উদ্যোগ। সেই কারণেই সমস্ত ধর্মের পাশাপাশি বিকল্প হিসাবে হিউম্যানিজম রাখা হয়েছে। কারোর উপর কিছু না চাপিয়ে দিয়ে, বরং প্রত্যেকের আদর্শকে সম্মান জানিয়ে স্বাধীন মত প্রকাশ করার একটা জায়গা তৈরি করে বেথুনের নজিরবিহীন পদক্ষেপের জয়গান গাইছেন কলকাতা-সহ বাংলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখন এই পথে কত সংখ্যক ছাত্রী হাঁটেন, তা সময় বলবে। তবে একথা বলতেই হয়, ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির এই চাপান-উতরে বেথুন কলেজের এমন সিদ্ধান্ত তীব্র একটি প্রতিবাদস্বরূপ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন কণ্ঠ আরও সোচ্চার হোক, আরও জোরালো হোক।