‘দ্য লাস্ট সাপার’ – অস্থিরতার সফল থিয়েটার প্রযোজনা

সুমিত কুমার রায় এবং প্রসেনজিৎ বর্ধন নির্দেশিত নাটক ‘দ্য লাস্ট সাপার’

ভয়ংকরের মধ্যে সুন্দর। শুনতে অবাক লাগলেও সমস্ত ভয়ংকর আসলে ভয়ের বাতাবরণ ছাড়িয়ে সৌন্দর্যকে মেলে ধরে। যার মধ্যে থাকতে পারে যাবতীয় অস্থিরতা আর চাপা উল্লাস। ‘দ্য লাস্ট সাপার’ নাটকে তিন পুলিশ অফিসার তাই ডিনার টেবিলে বসে ‘চিয়ার্স’ বলতে পারেন না। কারণ তাঁদের সামনে একটা লাশ। যে শুয়ে আছে প্রায় কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু এই লাশের পরিচয় কী? তিনি আসলে চাকুরীজীবী। কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছেন। বলা ভালো, তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু হত্যাকারী কে? ঘটনা পরম্পরায় নাটক এগোয়, রহস্য ক্রমে উন্মোচিত হয়। আর দর্শকদের মধ্যে কাজ করে একপ্রকার টেনশন।

ওয়েলসীয় সাহিত্যিক রুয়াল দালের লেখা একটি ছোটোগল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে সুমিত কুমার রায় এবং প্রসেনজিৎ বর্ধনের নির্দেশনায় নাটক ‘দ্য লাস্ট সাপার’। প্রযোজনার সময় মাত্র ৩৫ মিনিট। গত ২৯ নভেম্বর কলকাতার ন্যাশনাল মাইম আকাদেমিতে ছিল এই প্রযোজনার দুটি অভিনয়। ইন্টিমেট স্পেস ব্যবহার করে অত্যন্ত কম সময়ে দীর্ঘ আর গভীর কথা বলা রয়েছে এই নাটকে। মূল গল্প বলার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ কাহিনি বা ন্যারেটিভের থেকেও এই নাটক তার শিল্পগুণে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। যেমন ঘটনা ন্যারেট করার সময় টাইম ও স্পেসকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতি ব্যবহার করে কিছু সময় পিছিয়ে যায় ন্যারেটিভ। সেখানে অভিনেতাদের দক্ষতায় তা ঘটমান বর্তমানের সঙ্গে ঘটমান অতীত মিলেমিশে গেছে। নিশ্চিতভাবেই বাংলা থিয়েটারে এই ডিজাইন খানিক নতুন এবং আকর্ষণীয়।

মনে করুন একটি অসতর্ক সন্ধে। এক গর্ভবতী গৃহিণী ঘড়ি দেখছেন আর অপেক্ষা করছেন কখন তাঁর স্বামী প্যাট্রিক ম্যালোনি বাড়ি আসবেন। স্বামী ফেরে। কিন্তু পরিস্থিতি আর আগের মতো নয়। কারণ স্বামী প্রেমে পড়েছেন অন্য কারোর। তাই গর্ভবতী স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে চান। স্ত্রী মেরি ম্যালোনি। এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবী ভেঙে পড়েছিল তাঁর শরীরে। এই নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ভেড়ার দীর্ঘ পা। দর্শক যা একেবারেই বুঝতে পারবেন না শুরু থেকে। ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে এই ভেড়ার পা কীভাবে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে পৌঁছে যাচ্ছে, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে তা ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। 

প্যাট্রিকের চরিত্রে সুমিত কুমার রায় অত্যন্ত নিপুণ, মাপা এবং সংযত। তাঁর শরীরী অভিনয় উচ্চমানের। মেরির চরিত্রে হুসনে শবনম দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রত্যেকটি থিয়েট্রিক্যাল গ্রাফ ধরা পড়েছে তাঁর অভিব্যক্তিতে, শরীরে। তিনি হেসেছেন, কেঁদেছেন, চিৎকার করেছেন, ভালোবাসতে চেয়েছেন। এই সবই জীবন্ত করে দর্শকদের সামনে মেলে ধরেছেন তিনি। অন্যান্য চরিত্রে ভাস্কর মুখার্জি, দীপ্তজিৎ রায়চৌধুরী এবং পল্লব মিশ্র যথেষ্ট ভালো অভিনয় করেছেন চরিত্র অনুযায়ী। ভালো লেগেছে মধুরিমা গোস্বামীর পোশাক ভাবনা, দীপ্তজিৎ রায়চৌধুরীর আবহ। 

তবে যার কথা বলতেই হবে, তিনি না থেকেও আসলে থেকেছেন। কোথাও। নাটকের মধ্যে। চরিত্রের মধ্যে। দর্শকদের হাততালিতে। তিনি এই প্রযোজনার অন্যতম নির্দেশক প্রসেনজিৎ বর্ধন। কয়েকদিন আগে হঠাৎই তিনি প্রয়াত হয়েছেন। এটিই তাঁর নির্দেশনায় শেষ কাজ। তবে শেষ বলে তো কিছু নেই। প্রসেনজিৎ এইভাবে থেকে যাবেন কোথাও অদৃশ্যভাবে। বন্ধু এবং সহকর্মীদের থিয়েটার যাপনের মধ্যে।

‘দ্য লাস্ট সাপার’ বর্তমান অস্থিরতার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযোজনা। দর্শকদের পাশে তো থাকতেই হবে।
 

Developed by DXDasia