জীবন বদলে দেওয়া থিয়েটার

প্রদীপ ভট্টাচার্যের থিয়েটার থেরাপি

বিশু পাগলের মধ্যে রঞ্জনকে খুঁজে পেল নন্দিনী। প্রদীপ ভট্টাচার্যের ‘রক্তকরবী’-তে ঠিক এরকমই ঘটেছে। বুদ্ধদেব এবং রুনা – বহরমপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দুই বন্দি। আগে কখনও ভাবতে পারেননি, থিয়েটার থেরাপিতে অংশ নিয়ে গিয়ে তাঁরা দাম্পত্যে বাঁধা পড়বেন।

“তাদের প্রেম কাহিনিতে আমি অনুঘটক। এই কাহিনিও কম নাটকীয় নয়। অপরাধ এবং শাস্তির আবিলতাকে ভালোবাসা এবং আত্মীয়তা দিয়ে অতিক্রম করার গল্প”, ফোনে উচ্ছ্বসিত হয়ে জানালেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব প্রদীপ ভট্টাচার্য। গল্পের শুরু প্রায় দশ বছর আগে। যদিও বাধা-বিপত্তি আজও কাটেনি। বিয়ের পর রুনা এখন অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে থাকার অনুমতি পাননি। বুদ্ধদেব থাকেন লালগোলা মুক্ত কারাগারে। প্রদীপবাবু সর্বশক্তি দিয়ে তাদের মিলন ঘটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। “মেয়েটি যদি মুক্ত হয়, তবেই সুখী দাম্পত্য জীবনের স্বাদ পাবে। ওদের সন্তান জন্মাবে স্বাধীন পরিবেশে, বন্দিশালার চার দেওয়ালের মধ্যে নয়”, বলেন তিনি। 

 

“তাদের প্রেম কাহিনিতে আমি অনুঘটক। এই কাহিনিও কম নাটকীয় নয়। অপরাধ এবং শাস্তির আবিলতাকে ভালোবাসা এবং আত্মীয়তা দিয়ে অতিক্রম করার গল্প”।

২০০৬ সালে প্রদীপ ভট্টাচার্যকে বহরমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিদের নিয়ে কাজ করতে আহ্বান জানানো হয়। এখন তা কারাগার নয়, সংশোধনাগার হিসেবেই পরিচিত। প্রদীপবাবু সেখানে বন্দিদের পুর্নবাসনের জন্য থিয়েটার থেরাপি শুরু করেন। বন্দিরা, বিশেষ করে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ নাটকের সঙ্গে কীভাবে নিজেদের সংযুক্ত করতে পারে, তা নিয়ে প্রদীপবাবুর আগ্রহ ছিল। “তাদের মুখের অভিব্যক্তি আমি দেখতে চেয়েছিলাম। অভিনয়ের জন্য আমার ছেলে এবং মেয়ে – দু’য়েরই প্রয়োজন ছিল। যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয় কর্তৃপক্ষকে রাজি করাতে। জেলখানায় ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে থাকতে বা কাজ করতে দেওয়া হয় না”, বলেন প্রদীপবাবু। অনেক সাধ্যসাধনার পর বরফ গলে। বুদ্ধদেব আর রুনাকে একসঙ্গে অভিনয় করার অনুমতি দেওয়া হয়। টিমের সবাই হয়ে উঠেছিলেন প্রদীপবাবুর পরিবার। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, “আর কোনো খারাপ কাজ করবে না। মঞ্চে যে স্বাধীনতা পাচ্ছ, তা আর নইলে দেওয়া হবে না।” কিন্তু প্রেম কোনো নিয়ম মানে না। প্রদীপবাবু লক্ষ করেন, দু’জোড়া ছেলেমেয়ে ক্রমশ নিজেদের মধ্যে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠছেন। যখন তখন হাসাহাসি করছেন, ফিসফিসিয়ে কথা বলছেন একে অপরের সঙ্গে। 

রুনার পরিবার ধর্মে মুসলমান এবং বেশ রক্ষণশীল। আর বুদ্ধদেব হিন্দু। তিনি ‘বাবা’কে জানান, রুনা ছাড়া বাঁচতে পারবেন না। বিয়ের জন্যও তিনি প্রস্তুত। রুনার পরিবারকে রাজি করাতে দিল্লি পর্যন্ত ছোটেন প্রদীপবাবু। অবশেষে তাঁদের গ্রামে গিয়ে রুনার বড়ো দাদার সম্মতি আদায় করেন। জেল কর্তৃপক্ষকেও রাজি করাতে বেগ পেতে হয়েছিল। অফিসারদের অনেকেই ছিলেন দুই-ধর্মে বিয়ের বিপক্ষে।

তাঁদের সদ্য গড়ে ওঠা সম্পর্ক বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল প্রদীপবাবুর কাছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক দিশা পেলে খুনের আসামির মনেও গভীর পরিবর্তন আসতে পারে। ২০০৭-এ কলকাতার রবীন্দ্রসদনে ‘তাসের দেশ’ মঞ্চস্থ হয়। সেটা ছিল এক বিরাট সাফল্য। সারা দেশে সম্ভবত প্রথমবার স্বাধীনভাবে মঞ্চে অভিনয় করলেন কারাবন্দিরা। দিল্লির ন্যাশানাল স্কুল অফ ড্রামা প্রদীপবাবুকে বন্দিদের নিয়ে নাটক পরিবেশনের অনুমতি দেয়। প্রদীপবাবুর মতে, “আমার কাছে তা ছিল এ সুবর্ণ সুযোগ। আমি প্রাণপণে অপেক্ষায় ছিলাম। তবে বন্দিদের নিয়ে দিল্লি যাওয়ার অনুমোদন নিতে হত। তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং কেউ পালাবে না, তা নিশ্চিত করা ছিল গুরুতর দায়িত্ব। তখনকার আইজি (কারা) বিডি শর্মা এবং মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমাকে প্রচুর সাহায্য করেন। তাঁরা থিয়েটার থেরাপিতে দারুণ উৎসাহী।”

ট্রেনযাত্রার সুযোগে বুদ্ধদেব-রুনা আরও বেশি করে একে অপরের সান্নিধ্যে আসেন। আরেক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার ক্ষেত্রেও ঘটে একই ঘটনা। টিমের সবাই প্রদীপবাবুকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। তাঁরা সবাই ফিরে আসে নিরাপদে। তারপর জেলে একদিন হুলুস্থুলু বেঁধে যায় বন্দিদের তল্লাশি নেওয়ার সময়ে। রক্ত দিয়ে লেখা একটি চিঠি পাওয়া গিয়েছিল তখন। প্রদীপবাবুরও ডাক পড়ে। তবে বিডি শর্মা সেইবারও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে এটি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কৌতুক করে প্রদীপবাবুকে বলেছিলেন, “আপনি রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ করবেন, অথচ চাইবেন না কেউ প্রেমে পড়ুক – তা কীভাবে হয়? 

এর পরেও সমস্যা থেকে গেল। রুনার পরিবার ধর্মে মুসলমান এবং বেশ রক্ষণশীল। আর বুদ্ধদেব হিন্দু। তিনি ‘বাবা’কে জানান, রুনা ছাড়া বাঁচতে পারবেন না। বিয়ের জন্যও তিনি প্রস্তুত। রুনার পরিবারকে রাজি করাতে দিল্লি পর্যন্ত ছোটেন প্রদীপবাবু। অবশেষে তাঁদের গ্রামে গিয়ে রুনার বড়ো দাদার সম্মতি আদায় করেন। জেল কর্তৃপক্ষকেও রাজি করাতে বেগ পেতে হয়েছিল। অফিসারদের অনেকেই ছিলেন দুই-ধর্মে বিয়ের বিপক্ষে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য প্যারোলের অনুমতি পাওয়া যায়। ২৭ মার্চ ২০১৯, বিশ্ব থিয়েটার দিবসে নিজের অফিসে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিয়ের আয়োজন করেন প্রদীপবাবু। খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত হয়। রেজিস্টার হাজির হন যথা সময়ে। উপস্থিত ছিলেন অতিথিরাও। “এদিকে জেলখানার কিছু মুসলমান অফিসার ইচ্ছে করে একজনকে কেবল প্যারোলে ছাড়ে। আরেকজনকে নয়। দু’জনকে একসঙ্গে না পেলে বিয়ে দেব কীভাবে?” বিরক্তি ঝরে পড়ে প্রদীপবাবুর কথায়। তিনি অবশ্য চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। জেল সুপারিনটেনডেন্টকে বোঝানোর চেষ্টা করেন মানবিকতার যুক্তি দিয়ে।

২০০৬ সালে প্রদীপ ভট্টাচার্যকে বহরমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিদের নিয়ে কাজ করতে আহ্বান জানানো হয়। প্রদীপবাবু সেখানে বন্দিদের পুর্নবাসনের জন্য থিয়েটার থেরাপি শুরু করেন।

কিন্তু প্যারোল আবার পিছিয়ে যায়। মে মাসে শেষ পর্যন্ত বুদ্ধদেব আর রুনা আবন্ধ হন বিবাহ বন্ধনে। তারপর ভালো ব্যবহারের কারণে বুদ্ধদেবকে নিয়ে যাওয়া হয় লালগোলা মুক্ত কারাগারে। বন্দিরা সেখানে কাজ করে উপার্জন করতে পারে। পরিবার নিয়ে থাকার জন্য তাদের কোয়ার্টারও দেওয়া হয়। বিয়ে করা সত্ত্বেও রুনা তাঁর সঙ্গে থাকার অনুমতি পাননি। ২০২০-র ফেব্রুয়ারিতে এনএসডি-র আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসবে আবার তাঁদের ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ হল। কোভিড সংক্রমণ শুরু হওয়ায় বেশ কয়েকটি কারাগারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বন্দিদের কয়েক মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু বুদ্ধদেব আর রুনাকে আবার জেলে ফিরে আসতে হয়। অন্তঃসত্ত্বা রুনা অপেক্ষা করছেন, কবে স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারবেন! সবই আটকে রয়েছে লাল ফিতের বাঁধনে। প্রদীপবাবু সর্বতোভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, বুদ্ধদেব-রুনা একসঙ্গে থেকে তাঁদের সন্তানকে যাতে মুক্ত পরিবেশে জন্ম দিতে পারেন। আমরা চাই, খুব শিগগিরই তা যেন ঘটে। বাংলার মাটিতে গড়ে উঠুক নতুন ইতিহাস। 

 
 

Developed by DXDasia