নকশালবাড়ি, আজকের ছাত্র-ছাত্রীরা এবং কোভিডের সময়ের বামপন্থা

বামমনস্ক কমবয়সীরা হিংসা বিরোধী আর দক্ষিণপন্থী কমবয়সীরা হিংসাকে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্ত্র মনে করছেন?

সব বড়ো সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলনই জন-মনে ছাপ রেখে যায়। কখনও তা স্পষ্ট, কখনও তা মিশে যায় সমাজজীবনের ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫৩ বছর হতে চলল। ভাবতে অদ্ভুত লাগে, এক সময় মহাত্মা গান্ধির ডাকে সাড়া দিয়ে সেরা ছাত্র-ছাত্রীরা লেখা-পড়া ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন দেশের সেবায়। স্বাধীনতার ২০ বছর পর, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির একশো শতাংশ বিপরীত মেরুর রাজনীতির মানুষ চারু মজুমদারের ডাকে প্রায় একইভাবে সেরা ছাত্র-ছাত্রীরা লেখা-পড়া ছেড়ে ‘বিপ্লব’-এর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেই বিপ্লব হয়নি। হয়তো হওয়া সম্ভবও ছিল না। তবে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল ৮০-৯০ দশকের গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে, সমাজ-গবেষণায়, সাংবাদিকতায়, এমনকি সরকারি পরিকল্পনাতেও। কিন্তু আজকের বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের উপর কি সেই নকশাল আন্দোলনের কোনও প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে? করোনাকালে সেই খোঁজ করতেই এই প্রতিবেদন। 

এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য কয়েক জন অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাঁরা আমাদের যা জানিয়েছেন তার থেকে বলা যায়, আজকের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কিছু করতে পারেন, কিন্তু ১৯৬৭ সালের মতো কারও ডাকে সাড়া দিয়ে আরেকটা নকশালবাড়ির টানে তাঁরা লেখা-পড়া, ঘর-বাড়ি ছেড়ে গ্রামে যাবেন না। তার অন্যতম কারণ, এই নতুন প্রজন্মের ‘ভায়োলেন্স’-এর উপর বিশ্বাস প্রায় নেই। যাঁরা একথা বলছেন, তাঁরা অনেকেই কিন্তু ‘বামপন্থী’। তবে তাঁদের মধ্যে অনেকে যেমন নিজেকে মার্কসবাদী বলে বা লেনিনবাদী বলে দাবি করেন। আবার, অনেকেই ওইরকম লেবেল আঁটা বামপন্থী নন, যদিও তাঁরা সাম্যে বিশ্বাস করেন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চান, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন, সমকামী, রূপান্তরকামী-সহ সব ধরনের মানুষের সমান অধিকারের পক্ষে। এই সংখ্যাটা কম নয়। প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের উপর তাঁদের আস্থা নেই। নিজেরাও তাঁরা সক্রিয় রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী নন। এই যে নানা ধরনের বাম-মনস্ক তরুণদের মধ্যে ‘ভায়োলেন্স’-এ অনাস্থা দেখা যাচ্ছে, এটা যেমন একটা দিক, তেমনই আরেকটা দিক হল, তারা সরাসরি কোনও বাম রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নয়, থাকতেও আগ্রহী নন। তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে, কিন্তু সমাজ পরিবর্তন নিয়ে খুব যে ভাবেন তা নয়। পরিবর্তিত সমাজের ছবিটা কেমন হতে পারে তা নিয়েও কোনও ধারণা নেই। এর কারণ সম্ভবত, একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক অধিকারহীন সমাজতান্ত্রিক দেশ সম্পর্কে অনাগ্রহ। উত্তর কোরিয়ার হাস্যকর কমিউনিস্ট নেতা বা চিনের একনায়কতান্ত্রিক তথাকথিত সমাজতন্ত্রকে দেখে কোনও আধুনিক মনস্ক ছাত্র-ছাত্রীর আগ্রহ বোধ করার কথাও হয়তো নয়। 

ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ থেকে শুরু করে বিটি রণদিভে হয়ে চারু মজুমদার পর্যন্ত, মানুষের ভালো চেয়ে, সমাজের উপকার চেয়ে, রাজনীতিতে হিংসার ব্যবহার আমরা দেখেছি। সেটা ভারতের এবং বাঙালি মধ্যবিত্তের ইতিহাসের অন্যতম অধ্যায়। একটা কথা আমরা অনেক সময় মনে রাখি না। অরবিন্দ যেমন হিংসায় বিশ্বাসী হয়ে দেশ স্বাধীন করার ব্রত নিয়ে জেলে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসে ঋষি অরবিন্দ হয়েছিলেন, এই ধরনের মন-পরিবর্তনের ঘটনা কিন্তু আরও শত শত ঘটেছে। তাঁরা হয়তো রাজনীতি ছেড়ে দেননি, কিন্তু হিংসা ছেড়ে দিয়েছেন। এমন ঘটনা যেমন বারীণ ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়দের জীবনে ঘটেছিল, তেমনই নকশালপন্থীদের মধ্যে যাঁরা গ্রেফতার হয়ে জেলে ছিলেন, তাঁদের অন্তত ৯০ শতাংশ (বেশিও হতে পারে) জেল থেকে বেরিয়ে বামপন্থী থেকেছেন, কিন্তু হিংসার রাজনীতি করেননি। চারু মজুমদার, সরোজ দত্তদের মৃত্যু হয়েছে পুলিশ হেফাজতে, কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, শৈবাল মিত্র, সন্তোষ রাণা থেকে শুরু করে অসংখ্য নকশালপন্থী নেতা এবং কর্মীর কথা বলা যায়, যাঁরা জেল-পরবর্তী জীবনে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি, কিন্তু হিংসায় আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

বামপন্থী কমবয়সীদের মধ্যে যখন ‘গান্ধির ভাবনা’-র প্রভাব বাড়ছে দেখা যাচ্ছে, তখনই কিন্তু দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে (এর ভিতরে ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশও পড়েন) দেখা যাচ্ছে ভায়োলেন্সকে প্রমোট করার চেষ্টা তীব্র হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা এসে পড়ে। গত ২ অক্টোবর, গান্ধির জন্মদিনে সারা দিন ট্যুইটারে শোনা গেল গান্ধি হত্যাকারীর সমর্থকদের উল্লাস। শোনা গেল নাথুরামগডসে জিন্দাবাদ। ঠিক যে উল্লাসের কথা, ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি, গান্ধি হত্যার পর, সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল নেহরুকে লেখা চিঠিতে বলেছিলেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম-বিরোধী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস গান্ধিহত্যার ঘটনায় মিষ্টি বিলিয়েছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, যে কথা তৎকালীন মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক অন্নদাশংকর রায় তাঁর ‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি’ বইয়ে লিখে গিয়েছেন, তেমনই উল্লাসের গর্জন শোনা গেল গান্ধি হত্যার ৭২ বছরে। গত ২ অক্টোবর সকাল থেকেই নাথুরামের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে ট্যুইটের বন্যা শুরু হয়। ভোর ৫টা থেকে নাথুরামগডসে জিন্দাবাদ হ্যাশট্যাগে ক্রমাগত ট্যুইট করা শুরু। দুপুরের মধ্যেই গডসে নিয়ে ট্যুইটের সংখ্যা আশি হাজার ছাড়িয়ে যায়। আগে থেকে পরিকল্পনা ছাড়া গডসেকে নিয়ে এমন হ্যাশট্যাগ তৈরি করা সম্ভব নয়। গডসের সমর্থনে ট্যুইট যাঁদের প্রোফাইল থেকে হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি ঘোষিত বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদের সমর্থককে দেখা গিয়েছে। গডসেকে সঙ্ঘ পরিবার ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা বরাবরই দেশপ্রেমীক মনে করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ না দেওয়ার কারণে এবং গান্ধি হত্যার পর দেশব্যাপী  কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল হিন্দুত্ববাদীরা। ভারতে এখন এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী শিবির যে ক্ষমতা ভোগ করছে তা আগে কখনও হয়নি। এতদিন গডসে জিন্দাবাদ বলতে ভয় পেত হিন্দুত্ববাদীরা। এখন লোকসভা ভোটে তাদের আসন বেড়েছে, ফলে সাহসও বেড়েছে। 

তাহলে কি বলা যায়, যে বামমনস্ক কমবয়সীরা এখন হিংসা বিরোধী আর দক্ষিণপন্থী কমবয়সীরা হিংসাকে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্ত্র মনে করছেন? এত সরাসরি হয়তো কথাটা বলা যায় না, কিন্তু যাঁরা গডসে জিন্দাবাদ বলছেন বা যাঁরা গুজরাটে ২০০২ সালে প্রায় একহাজার সংখ্যালঘুর মৃত্যুর জন্য লজ্জিত বোধ করেন না, তাঁরা যে প্রয়োজনে হিংসার সীমিত ব্যবহারে বিশ্বাসী তা স্পষ্ট। তাহলে কি ভারত দেশটাই বদলে যাচ্ছে? সেকথা বলার সময় এখনও আসেনি। ভারতে মোট ভোটার ৮৯ কোটি। যে দলের সমর্থকরা গডসেকে দেশপ্রেমিক মনে করেন, সেই দলটা গত লোকসভায় সব মিলিয়ে মোট ভোট পেয়েছে ২৩ কোটি। 

ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনীতি, দেশের রাজনীতি কোনোটাই আকাশ থেকে পড়ে না। বিশ্ব-রাজনীতির সঙ্গে তার একটা যোগসূত্র থাকেই। তাই আজ এই কোভিড আক্রান্ত পৃথিবীতে রাজনীতির গতি-প্রকৃতির অভিমুখ কোন দিকে সেটা একবার দেখে নেওয়া যাক। সাম্প্রতিক নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে দেখা গেল ৬৪ জন বাম-ঘেঁষা সাংসদকে নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেন লেবার দলের জেসিন্ডা আরডার্ন। এই সাংসদদের মধ্যে ১০ শতাংশ লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল এবং ট্র্যান্সজেন্ডার এবং উপজাতিদের প্রতিনিধি। আফ্রিকান, দক্ষিণ আফ্রিকান, শ্রীলঙ্কান এবং মেক্সিকান সাংসদও রয়েছেন এই ৬৪ জনের মধ্যে। এবং সাংসদদের অর্ধেকের বেশি মহিলা। যখন পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলিতে দূরে সরিয়ে দেওয়ার, বাদ দিয়ে দেওয়ার, বহিষ্কার করার, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার সংখ্যাগুরুবাদী, জনপ্রিয় রাজনীতির চর্চা চলছে, তখন নিউজিল্যান্ড নামের এই ছোটো দেশটার গলায় গ্রহণ করার, কাছে টেনে নেওয়ার ভিন্ন স্বর শোনা গেল।

আরও একটা বিষয় চোখে পড়ল পৃথিবী জুড়ে। যখন ভিয়েতনাম, লাওস, কিউবার মতো ছোটো ছোটো বামপন্থী দেশগুলি করোনা মোকাবিলায় নজিরবিহীন সাফল্য দেখাল আর উল্টো দিকে তখন দেখা গেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন,  ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর মতো জনপ্রিয়তাবাদী নেতারা তাঁদের নিজেদের দেশে করোনা সামলাতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। এরকম একটা বিশ্ব-পরিস্থিতিতে, নতুন করে বামপন্থার দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করার, নতুন করে বামপন্থার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবার সম্ভাবনা কি দেখা দিতে পারে? এমন একটা পরিবর্তনের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। এমন যদি ঘটে, তার পিছনে অবশ্যই বড়ো ভূমিকা থাকবে বামমনস্ক, দক্ষিণপন্থা-বিরোধী কমবয়সীদের। যদিও, বর্তমান সময় আর এই সম্ভাবনার বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্ব অসেতুসম্ভব না হলেও, এখনও অনেকটাই।
 

Developed by DXDasia